শুধু পথের দুই পাশে নয়, প্রত্যেকটা বাড়ির ছাদে এত নারী পুরুষ জমে গেছে, দেখলে বিস্ময় জাগে। শুধু মানুষ আর মানুষ কান্দাই শহরে এত মানুষ আছে, আজ যেন সবাই তা বুঝতে পারে।
গাছের শাখায় শাখায়, প্রাচীরের উপরে যে কোনো উচ্চ স্থানে যেখানে থেকে বনহুরকে দেখা। যাবে সব জায়গায় ভীড় আর ভীড়।
কান্দাই পথ আজ জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে।
লক্ষ লক্ষ লোকের দৃষ্টি আজ পথের দিকে। পা ব্যথা হয়ে গেছে তবু কারও নড়বার নামটি নেই। কারণ, একটু সরে পড়লেই তার স্থানে যদি অন্য কেউ এসে দাঁড়িয়ে পড়ে!
স্থানচ্যুতির ভয়ে কেউ একটু নড়ছে না পর্যন্ত। সকলেরই চোখে-মুখে ফুটে উঠেছে দস্য বনহুরকে দেখবার বিপুল উন্মাদনা। অন্তরের সমস্ত অনুভূতি নিয়ে প্রতীক্ষা করছে সবাই একটুখানি দেখবে তাকে। যার নাম শুনে তাদের হৃদকম্প শুরু হতো। যার নামে দেশবাসীর মনে এত আতঙ্ক।
যার নামই শুধু শুনে এসেছে এতদিন, কোনদিন তাকে দেখেনি কেউ,সেই দস্যু বনহুরকে আজ স্বচক্ষে দর্শন করবে। একটু স্থানের অভাবে যদি তাকে দেখতে না পায়। এমন সুযোগ আর কোন দিন তাদের জীবনে আসবে না।
দস্যু বনহুরকে স্বচখে দেখেছে–এটাই হবে যে তাদের মস্তবড় একটা বলবার মত কথা। বংশানুবংশক্রমে তারা বলতে পারবে তাদের পুত্র-কন্যাদের কাছে রং লাগিয়ে চটকদার কাহিনী হিসাবে।
কিন্তু এত আগ্রহশীল দর্শকবৃন্দের আশা সফল হবে কিনা কে জানে।
অসংখ্য পুলিশ ফোর্স পরিবেষ্টিত দস্যু বনহুরকে তাদের নজরে পড়বে কিনা তাইবা কে বলতে পারে!
দর্শকগণ নীরবে দাঁড়িয়ে নেই, তাদের মধ্যে বনহুরকে নিয়ে নানা রকম আলোচনা চলছে। তার চেহারার নানা জনে নানা রকম বর্ণনা দিচ্ছে। অদ্ভুত অদ্ভুত সে সব কথা। কেউ বলছে,দস্যু বনহুরের বিরাট চেহারা, মস্তবড় মাথা, বড় বড় চোখ, হেইয়া গোঁফ, হাতগুলী লোহার-সাড়াশির মত শক্ত, দেহটা রাক্ষসের মত দেখতে। কেউ বলছে, বনহুর মানুষই নয়–একটা অসুর; কেউ বলছে, বনহুর সুন্দর সুপুরুষ, এত সুন্দর মানুষ নাকি হয় না।
দর্শকগণ যখন বনহুরকে নিয়ে নানা রকম আলোচনায় ব্যস্ত, তাকে দেখার জন্য উদগ্রীব, তখন পুলিশ ভ্যানগুলো জনসমুদ্রের মাঝ দিয়ে দ্রুত এগিয়ে আসছে।
মধ্যের ভ্যানটিতে দস্যু বনহুর এবং পুলিশ ইন্সপেক্টারদ্বয় রয়েছেন আর আছে কয়েকজন সশস্ত্র পুলিশ।
কান্দাই শহরের বিশিষ্ট পথ ধরে ভ্যানগুলো এগিয়ে চলেছে। অসংখ্য জনতা ভীড় করে ঝুঁকে আসছে ভ্যানগুলোর দুই পাশে, সবাই দেখতে চায় দস্যু বনহুরকে।
পুলিশ ভ্যান এগুনো সম্ভব হচ্ছে না আর। একেবারে জনগণ ভ্যানের উপরে এসে পড়েছে সবাই জটলা করে।
পুলিশ কিছুতেই হটাতে পারছে না তাদের। গাড়ি যখন থেমে পড়লো অমনি অসংখ্য জনতা জটলা করে ঝুঁকে পড়লো বনহুরের ভ্যানটার উপরে।
একেবারে এভাবে জনতা ভেঙে পড়বে কল্পনা করতে পারেনি পুলিশ বাহিনী বা ইন্সপেক্টারদ্বয়।
জনতাকে সামলানো কঠিন হয়ে পড়লো। সমস্ত পুলিশ বাহিনী ক্ষণিকের জন্য অন্যমনস্ক হয়ে পড়লো জনতার চাপে।
ঠিক সেই মুহূর্তে বনহুর শৃঙ্খলাবদ্ধ অবস্থায় লাফিয়ে পড়লো জনসমুদ্রে। হট্টগোল আর কলরবে জনতার ভীড়ে অদৃশ্য হয়ে গেলো।
পুলিশ রাইফেল উদ্যত করে আছে কিন্তু গুলী ছুঁড়তে সক্ষম হলো না, অসংখ্য জনতার মধ্যে কোথায় গুলী ছুঁড়বে তারা।
মিঃ আহমদ ও মিঃ জাফরী চিৎকার করে উঠলেন–গ্রেপ্তার করো, গ্রেপ্তার করো, দস্যু বনহুর পালিয়েছে…
লক্ষ কণ্ঠের কলরবে পুলিশ অফিসারদ্বয়ের কণ্ঠ মিশে গেলো। পুলিশ তবুও ভীড় ঠেলে ছুটলো, জনগণের ভীড়ে খুঁজতে লাগলো দস্যু বনহুরকে।
এদিকে জনতা যখন জানতে পারলো দস্যু বনহুর তাদের মধ্যেই আত্মগোপন করে পালিয়েছে, তখন এক মহা হই হুল্লোড় শুরু হলো। যে যেদিকে পারলো পালাতে লাগলো। ভয়ে সকলেরই মুখ বিবর্ণ ফ্যাকাশে হলো।
পুলিশ বাহিনী কিছুতেই জনতাকে আয়ত্তে আনতে পারছে না। যে যেদিকে পারছে ছুটে পালাচ্ছে। ‘চাচা আপন জীবন বাঁচা’ এ অবস্থা সকলের। যে যার টাকা-পয়সা, অলঙ্কার সামলানো নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। যুবতীগণ যেদিকে পারলো নিজেদের সামলাতে লাগলো, ভয় দস্যু বনহুর তাদের কাউকে হরণ করে নিয়ে না যায়। কর্তাগণ ছুটলেন নিজ নিজ বাড়ি সামলাতে।
আধঘন্টার মধ্যেই জনসমুদ্র, জনহীন রাজপথে পরিণত হলো। শুধু পুলিশের বাঁশির শব্দ আর তাদের ভারী বুটের আওয়াজ বিক্ষিপ্তভাবে শহরের রাজপথ অলিগলি মুখর করে তুললো।
সঙ্গে সঙ্গে কান্দাই শহরের রাজপথে যানবাহন, লোক চলাচল বন্ধ হয়ে গেলো। শুধু পুলিশের ভ্যানগুলো এদিক থেকে সেদিক উল্কাবগে ছুটাছুটি করতে লাগলো।
প্রতিটি বাড়িতে পুলিশ অনুসন্ধান চালালো।
প্রত্যেকটা অলিগলি, বাড়ির ছাদ, সিঁড়িঘর, আনাচে-কানাচে খুঁজতে লাগলো পুলিশ বাহিনী।
শুধু পুলিশ বাহিনী নয়, যার যার নিজ নিজ বাড়িতে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে অনুসন্ধান করে চললো বাড়ির মালিকগণ। সকলেরই বুক দুরু দুরু কাঁপছে। আতঙ্কগ্রস্ত হৃদয় নিয়ে সবাই খাটের নিচে, দরজার পাশে, আলমারীর পেছনে, বাথরুমে সন্ধান চালিয়ে চলেছে।
কিন্তু কোথায় বনহুর, সেকি হাওয়ায় উড়ে গেলো।
সমস্ত শহর তন্নতন্ন করে সন্ধান চললো। হোটেল-রেষ্টুরেন্ট-ক্লাব, সিনেমা হল, ছোটখাটো দোকানপাট সব জায়গাতেই খোঁজাখুজি চললো, কিন্তু কোথাও বনহুরকে খুঁজে পাওয়া গেলো না।
