নাসির শাহর কথায় মনিরা খুশি হয়ে উঠে দাঁড়ালো–চলি তাহলে জুলেখা?
কিন্তু জুলেখার মুখে নজর পড়তেই মনিরা চমকে উঠলো। গম্ভীর দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে সে ভাইয়ের মুখের দিকে দৃঢ়কণ্ঠে বললো জুলেখা–তুমি যাও ভাইয়া। তোমাকে আর কষ্ট করতে হবে না। ড্রাইভারের সঙ্গে আমিই যাবো।
নাসির শাহ্ ক্রুদ্ধভাবে একবার জুলেখার দিকে তাকিয়ে গট গট করে বেরিয়ে গেলো কক্ষ। থেকে।
এই রকম আরও বহুবার মনিরাকে হাতের মধ্যে আনার জন্য চেষ্টা নিয়েছিলো নাসির শাহ। জুলেখাকেও এজন্য অনেক কথা বলেছে সে। কিন্তু জুলেখা প্রিয় বান্ধবীর অমঙ্গল চিন্তা করতে পারেনি কোনোদিন।
বিলেত থেকে ফিরে নাসির শাহর আচরণ দেখে জুলেখার মন একেবারে ভেঙে গিয়েছিলো। মদপান আর ক্লাব ফাংশন তার নিত্য সহচর। চরিত্রহীন ভাইয়ের জন্য জুলেখা প্রাণে ব্যথা পেয়েছিলো যেমন, ঘৃণাও হয়েছিলো তেমনি এবং সেই কারণেই মনিরা সম্বন্ধে কোনো কথা বাড়িতে কারও কাছে বলতে পারলো না।
বান্ধবী হয়ে বান্ধবীর চিন্তায় মগ্ন রইলো।
*
অসংখ্য অশ্বারোহী দস্যু সারিবদ্ধভাবে দণ্ডায়মান। সকলেরই পিঠের সঙ্গে রাইফেল ঝুলছে। কারও কারও হাতে তীর ধনু আর বর্শা।
প্রত্যেকের দেহে জমকালো পোশাক পায়ে বুট, মাথায় পাগড়ি আর গালপাট্টা বাঁধা। এক একজনের চেহারা অতি ভয়ঙ্কর। মস্ত মস্ত গোলাকার চোখ, মাথায় খোঁচা খোঁচা চুল-শরীরের রং প্রায় সকলেরই কালো। মস্ত মস্ত একজোড়া গোঁফ, দেখলেই ভয় হয়। অনেকেরই মুখে এখানে– সেখানে ক্ষতিচিহ্ন।
সকলের মাঝখানে অশ্বপৃষ্ঠে রহমান, দ্বিতীয় অশ্বে নুরী। নূরীর দেহেও আজ পুরুষের ড্রেস পিঠে রাইফেল ঝুলছে। মাথায় পাগড়ি গালপাট্টা বাঁধা তাকে দেখলে কেউ নারী বলে ভ্রম করবে না। একটা সুন্দর যুবক বলেই মনে হয়।
রহমান সবাইকে লক্ষ্য করে বললো–ভাই, আজ আমাদের সর্দারকে উদ্ধারের দিন। আমরা নিজেদের জীবন দিয়ে হলেও সর্দারকে রক্ষা করবো। হয়তো আমাদের অনেকেই আর ফিরে আসবে না। কিন্তু দেহে প্রাণ থাকতে সর্দারকে উদ্ধার না করে ফিরবো না বলো, তোমরা শপথ। করো আমার সামনে।
অসংখ্য কণ্ঠে প্রতিধ্বনি হলো আমরা শপথ করছি, সর্দারকে উদ্ধার না করে ফিরবো না। বনভূমি প্রকম্পিত হলো দস্যগণের বজ্রধ্বনিতে। রহমান আনন্দসূচক শব্দ করলো–সাবাস!
রহমানের ইংগিতে সমস্ত দস্যু অনুচর নিজ নিজ অশ্বের লাগাম টেনে ধরলো। এবার উল্কাবেগে ছুটতে শুরু করলো অশ্ব গুলো। রাত্রির অন্ধকারে তারা জম্বুর গমনপথের দুই পাশে ছোট ছোট পাহাড় আর জঙ্গলে লুকিয়ে থাকবে।
রাত্রি ভোর হবার পূর্বেই হাঙ্গেরী কারাগার থেকে দস্যু বনহুরকে নিয়ে পুলিশ ভ্যান জম্বুর পথে রওয়ানা হবে। জম্বুর কারাকক্ষে ত্রিফলা বিদ্ধ করে গুলী করে হত্যা করা হবে।
পথের দুই পাশে জঙ্গলে আর পাহাড়ে লুকিয়ে পড়লো বনহুরের অনুচরগণ। সবাই অধীর। আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগলো।
ওদিকে হাঙ্গেরী কারাগার প্রাঙ্গণে এসে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ালো প্রায় পঁচিশখানা পুলিশ ভ্যান। অগণিত পুলিশফোর্স গুলীভরা রাইফেল হাতে সতর্কভাবে দণ্ডায়মান যেন পুলিশ বাহিনী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে।
ব্যস্তভাবে ঘোরাফেরা করছেন কয়েকজন পুলিশ অফিসার। প্রত্যেকের দেহেই সরকারি ড্রেস কোমরে বেল্টে গুলী ভরা রিভলভার।
পুলিশ সুপার কাওসার আহমদ স্বয়ং মিঃ আহমদ ও মিঃ জাফরী সহ বনহুরের কারাকক্ষের সম্মুখে এসে দাঁড়ালেন। সংগে কয়েকজন সশস্ত্র পুলিশ।
বনহুর তার মৃত্তিকা শয্যায় বসেছিলো হাঁটুর মধ্যে মাথা গুঁজে একটু পূর্বে তাকে নিদ্রা থেকে জাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতক্ষণ বনহুর নিশ্চিন্ত মনে ঘুমিয়েছিলো।
পুলিশ সুপার কাওসার আহমদের আদেশে কারাকক্ষের দরজা কড় কড় শব্দে খুলে গেলো।
উদ্যত রিভলভার হাতে কারাকক্ষে প্রবেশ করলেন পুলিশ ফোর্সসহ স্বয়ং পুলিশ সুপার ও পুলিশ ইন্সপেক্টারদ্বয়।
বনহুর উঠে দাঁড়ালো নিজের ইচ্ছায়।
পুলিশ সুপার ও পুলিশ ইন্সপেক্টারদ্বয় রিভলভার উদ্যত করে আছেন বনহুরের বুক লক্ষ্য করে।
তাছাড়াও পুলিশগণ গুলীভরা রাইফেল বাগিয়ে ধরে আছে তার চারপাশে। মিঃ আহমদের নির্দেশে একজন পুলিশ বনহুরের হাতে হাতকড়া পরিয়ে দিলো। আরও কয়েকজন বনহুরের সমস্ত শরীরে শিকল দ্বারা মজবুত করে বেঁধে ফেললো। বনহুরের মুখে নেই তবু ভীতির চিহ্ন, দীপ্ত সে মুখমণ্ডল। পুলিশ ফোর্স পরিবেষ্টিত হয়ে পুলিশ ভ্যানে উঠে বসলো দস্যু বনহুর। মাঝখানের ভ্যানে বনহুর, সম্মুখে এবং পিছনে বহু সংখ্যক পুলিশ ভ্যান। হাঙ্গেরী কারাকক্ষ হতে ভ্যানগুলো বেরিয়ে সোজা চলতে শুরু করলো।
আজ কান্দাইয়ের পথের দুই ধারে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে অসংখ্য জনতা,সবাই একনজর দেখতে চায় দস্যু বনহুরকে। যে দস্যুর নামই শুধু তারা শুনে এসেছে এতদিন, আজ একবার চাক্ষুস। দেখতে চায় তারা।
পরে স্থান যদি না পায় সেইজন্য গভীর রাত থেকে পথের ধারে ভীড় করে জায়গা নিয়ে দাঁড়িয়েছে সবাই। পথের দুই পাশে কোথাও তিল পরিমাণ স্থান নেই। লোকে লোকারণ্য। বৃদ্ধ যুবক, শিশু-নারী-পুরুষ সবাই দস্যু বনহুরকে দেখবে বলে দাঁড়িয়ে আছে।
কান্দাইয়ের মহারাজ এলেও পথের ধারে এত ভীড় জমে উঠেনা,দস্যু বনহুরকে দেখবার জন্য প্রতিটি নরনারীর যত ভীড় জমে উঠেছিলো।
