জুলেখা বিদেশে চলে যাবার পর বেশিদিন ক্লাশ করতে পারেনি মনিরা। নানা দুর্যোগের ঘনঘটা তার জীবনাকাশে এক অন্ধকারময় বিভীষিকা এনে দিয়েছিলো। মামুজানের আকস্মিক মৃত্যু, চূর্ণ বিচূর্ণ করে দিয়েছিলো মনিরার সমস্ত হৃদয়টাকে। এম এ পড়ার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও মনিরা আর ক্লাশ করতে পারেনি।
সেই থেকে মনিরার জীবনে শুরু হয়েছে নানা ঘাত-প্রতিঘাত।
জাহাঙ্গীর শাহ কন্যাকে বিদেশে পাঠিয়ে হঠাৎ কঠিন অসুখে পড়ে গেলেন, শেষ পর্যন্ত জাহাঙ্গীর শাহও বন্ধুর পথ অনুসরণ করলেন–মৃত্যু হলো তাঁর। এক পুত্র এবং তিনকন্যা রেখে তিনি পরপারে যাত্রা করলেন।
পুত্র উপযুক্ত ছিলো, কাজেই তাঁর কারবার এবং সংসার দেখা শোনার দায়িত্ব গ্রহণ করলো সে–ই। জাহাঙ্গীর শাহর পুত্রের নাম ছিলো নাসির শাহ্।
পিতা যেমন ছিলেন সৎ ব্যক্তি, পুত্র তেমন ছিলো অসৎ। নানা ভাবে অর্থ উপার্জনে কুৎসিত পন্থা অবলম্বন করলো। ক্লাব পার্টি–এসব ছিল নাসির শাহের নেশা। এমন কি মদ পানও করতো সে।
জুলেখা বিদেশে, অন্য বড় বোন দুটি বিয়ে হয়ে তারা শ্বশুর বাড়ি, কাজেই নাসির শাহর কাজে বাধা দেবার কেউ ছিলো না।
সংসারে শুধু মাত্র বৃদ্ধা মা তাঁর কথা কানেই নিতো না নাসির শাহ্। নিজের ইচ্ছামত সে কাজ করতো মা কিছু বললে বলতো তুমি আমার চেয়ে বেশি বোঝো না মা। কি করতে হয় না হয় আমিই জানি।
জাহাঙ্গীর শাহ্র স্ত্রী সুলতান বেগম আর কিছু বলতেন না। তিনি জানতেন, সন্তান তাঁর কত মন্দ।
দীর্ঘ সাত বছর পরে ফিরে এলো জুলেখা শুধু ডক্টর উপাধি লাভ করে নয়, হাতে-নাতে অভিজ্ঞতা অর্জন করে। বিলেতে কিছুদিন কাজ করার পর দেশে ফিরে এলো সে।
জুলেখা দেশে ফিরেই প্রথমে পিতার অভাব অনুভব করলো দারুণভাবে। কিন্তু যিনি গেছেন। আর তাকে ফিরিয়ে আনা যাবে না, তাই জুলেখা বৃদ্ধা মাকে বুকে চেপে ধরে পিতার অভাব পূরণ করল।
বড় ভাই নাসির শাহ্ বোনকে সাদর সম্ভাষণ জানিয়ে নিয়ে এলো এরোড্রাম থেকে।
জুলেখা দেশের মাটিতে পা রেখেই আর একজনকে সন্ধান করছিলো, সে হচ্ছে মনিরা।
কিন্তু বাড়িতে কয়েক দিন কাটানোর পর যখন মনিরার কোনো সন্ধান পেলো না জুলেখা, তখন সে স্বয়ং গেলো তার সঙ্গে দেখা করতে।
চৌধুরী বাড়িতে পৌঁছে মনিরার সঙ্গে যখন সাক্ষাৎ ঘটলো জুলেখার তখন বিস্ময়ে আরষ্ট হয়ে গিয়েছিলো সে–মনিরা আজ দৃষ্টিহীন–অন্ধ। কিছুতেই সে বিশ্বাস করতে পারছিলো না মনিরা সত্যই দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেছে। নিজকে সংযত রাখা কষ্টকর হয়ে পড়েছিলো জুলেখার পক্ষে মনিরাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলেছিলো সে–মনিরা, তুই অন্ধ হয়ে গেছিস। এ যে আমি বিশ্বাস করতে পারছিনে–
অনেক কেঁদেছিলো জুলেখা মনিরাকে বুকে আঁকড়ে ধরে। অনেক প্রশ্নই করেছিলো সে তাকে। কিন্তু মনিরা শুধু নীরবে অশ্রু বিসর্জন করেছিলো, একটি জবাবও দেয়নি–দিতে পারেনি সে।
কি করে দেবে মনিরার অন্তরের বেদনা যে কাউকে বলবার নয়। মনের আগুন মনেই জ্বলছে। ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে তার গণ্ড বেয়ে। প্রিয় বান্ধবীকে পেয়েও মনের গোপন ব্যথা জানাতে পারে না সে।
মনিরা কিছু না বললেও জুলেখা আন্দাজ করে নিয়েছিলো নিশ্চয়ই মনিরার জীবনে এমন কিছু ঘটেছে যার জন্য সে আজ এমনভাবে মুষড়ে পড়েছে। তার মনে নানারকম কথাই জাগলো। হয়তো মনিরা দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে এভাবে ভেঙে পড়েছে।
বাড়ি ফিরেও জুলেখা মনিরাকে নিয়েই চিন্তা করতে লাগলো। কি করে মনিরার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনা যায়। সে একজন অভিজ্ঞ ডাক্তার মানুষের জীবন নিয়েই তাকে গবেষণা করতে। হবে। রোগীকে আরোগ্য লাভ করানোই এখন তার জীবনের ব্রত।
মনিরা সম্বন্ধে বাড়িতে কারও সঙ্গে আলোচনা করা সমীচীন মনে করলো না জুলেখা। কারণ সে জানতো, মনিরাকে বিয়ে করার জন্য এক সময় তার বড় ভাই নাসির শাহ্ উন্মাদ হয়ে উঠেছিলো যদিও প্রকাশ্যে নাসির মনিরাকে কোনোদিন কিছু বলেনি বা বলাবার সুযোগ পায়নি, কিন্তু গোপনে সে অনেক কৌশল অবলম্বন করেছিলো।
জুলেখা ভাইকে জানতো, চরিত্রহীন ভাইয়ের পাশে কোনো সময় মনিরাকে কল্পনা করতে পারতো না।
একদিনের কথা আজও মনে পড়ে জুলেখার। সেদিন কলেজ থেকে ফিরে জুলেখা আর মনিরা তাদের বাসায় ঘরে বসে গল্প করছিলো। বাইরে তখন ঝুপঝাঁপ বৃষ্টি পড়ছে। অল্পক্ষণের মধ্যে বৃষ্টির বেগ এত বেড়ে গেলো বাইরে বের হওয়াই মুস্কিল হয়ে পড়লো। এদিকে সন্ধ্যা হয়ে আসছে মনিরা উদগ্রীব হয়ে উঠলো বাসায় ফিরবার জন্য। সেদিন কিন্তু মনিরা জুলেখাদের বাড়িতে কলেজ থেকে ফিরেছিলো। জুলেখাদের বাসায় যাবে বলে মনিরা ছেড়ে দিয়েছিলো। নিজেদের। গাড়ি, ফেরার সময় ওদের গাড়িতে ফিরবে আর কি। কিন্তু হঠাৎ বৃষ্টি পড়তে শুরু করলো। গল্পে গল্পে বেলাও শেষ হয়ে গেলো। বৃষ্টির বেগ ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে। মনিরা বারবার হাতঘড়িটার দিকে তাকাচ্ছে। হাসছিলো জুলেখা। এমন সময় নাসির সেই কক্ষে প্রবেশ করলো। ভাইকে হঠাৎ তাদের বসবার ঘরে প্রবেশ করতে দেখে একটু চমকে উঠেছিলো জুলেখা।
নাসির হেসে বলেছিলো–এসো মনিরা, তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসি।
নাসির শাহর ভিতরের খবর অতো জানতো না মনিরা। জুলেখার বড় ভাই হিসেবে সে তাকে। যথেষ্ট সম্মান করতো। আজ মনিরা সত্যি বিপদে পড়ে গিয়েছিলো, সন্ধ্যা গড়িয়ে গেছে অনেক্ষণ, মামা-মামী হয়তো উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন, শীঘ্র তাকে বাড়ি পৌঁছতেই হবে।
