মরিয়ম বেগমও সায় দিতেন মনিরার কথায়। কাজেই অবিশ্বাস করবার কিছুই ছিলো না।
সেদিন মনিরার বান্ধবীগণ অনেকেই এলো মনিরাকে দেখতে। সবাই ওকে ঘিরে ধরে বললো–হঠাৎ কি হলো মনিরা তোর?
মনিরা কোনো জবাব না দিয়ে চুপ করেই রইলো।
মরিয়ম বেগম বললেন–একটা কঠিন অসুখ হয়েছিলো মা তাই ওর এই অবস্থা। চোখ দুটো নষ্ট হয়ে গেছে।
সবাই ব্যথায় অনুতাপে মুষড়ে পড়লো, দুঃখ করলো অনেকে।
মরিয়ম বেগম এক সময় বেরিয়ে যেতেই বললো সাহানা মনিরার বিশিষ্ট বান্ধবী সে আচ্ছা। মনি, চিরদিন কি তুই এমনি করে কাটিয়ে দিবি?
কি রকম? বললো মনিরা।
বিয়ে করবিনে?
বিয়ে! হাসলো মনিরা বিয়ে আমার হয়ে গেছে অনেক দিন।
নেকামি করিসনে মনি, সত্যি তুই ভুল করেছিস।
ভুল! কেন?
বিয়ে না করে।
আজ সত্যি কথা না বলে পারলো না বললেন মনিরা। আঁচলে অশ্রু মুছে বললো এতদিন তোদের কাছে যে কথা গোপন করেছি আজ বলবো তোরা বিশ্বাস করবিতো?
নিশ্চয়ই করবো। বললো সাহানা।
এমন সময় কক্ষে প্রবেশ করলেন সরকার সাহেব–সঙ্গে তার ডাক্তার।
তখনকার মত বলা আর হলো না।
বান্ধবীগণ সেদিনের মত বিদায় নিয়ে চলে গেলো।
সাহানা অবশ্য মনিরার অনেক খবরই জানতো। দস্যু বনহুরই যে চৌধুরীবাড়ির ছেলে–এ কথাও সে জানতো, আরও জানতো, মনিরার সঙ্গে প্রেমও ঘটেছে বনহুরের। জানতো না তাদের আর কোনো সম্পর্কের কথা।
মনিরার বান্ধবীদের মধ্যে অনেকেরই বিয়ে হয়েছিলো–বাকিও ছিলো অনেকের। তারা কেউ কেউ উচ্চশিক্ষা লাভ করেছিলো। মনিরার বান্ধবী মহলে মনিরা ছিলো সকলের চেয়ে সুন্দরী আর গুণবতী। তাই অনেকেই তাকে ঈর্ষা করতো ভিতরে ভিতরে।
বান্ধবী মহলে মনিরা ছিলো তাদের আলোচনার বস্তু। আজও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। যদিও মনিরার সান্নিধ্য আজকাল তাদের বড় একটা ঘটে না। মনিরা তো কারও বাড়ি যাবেই না, ওরা এসে দেখা করে তার সঙ্গে। তবুও সবাই ঈর্ষা করে মনিরাকে। বড় লোকের মেয়ে বড় লোকের ভাগ্নী তাই নাকি এত অহঙ্কার ওর।
আজ অনেক দিন হলো বান্ধবীরা মনিরার বাড়ি আসা ছেড়েই দিয়েছিলো। বাইরে থেকে নানা জনে নানা রকম মনোভাব পোষণ করতো তার সম্বন্ধে। মনিরা, রূপবতী, গুণবতী, ধনবতী– তাই নাকি তার গর্ব। সেই কারণে বান্ধবীরা তাকে এড়িয়ে চলতো সম্পূর্ণরূপে। কিন্তু আসলে মনিরা ছিলো ভিন্ন রকম। গর্ব বলে তার কিছুই ছিলো না, নিজেকে অপয়া বলে সব সময় সরিয়ে রাখতো সবার কাছ থেকে।
আজ মনিরার বান্ধবীদের সেই ভুল ভেঙে গেলো, যখন তারা নিজের চোখ দেখলো মনিরা তাদের কাছে ঠিক পূর্বের ন্যায়ই আছে এতটুকু অহঙ্কার বা গর্ব নেই। মনিরার ব্যথায় সবাই ব্যথিত হলো। বাড়ি ফিরে দুঃখ করতে লাগলো সকলে। মনিরা দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছে–এটাই তাদের বড় দুঃখের কারণ।
সবচেয়ে বান্ধবীদের মধ্যে জুলেখাই ছিলো মনিরার প্রিয় বান্ধবী। বহুদিন বিদেশে শিক্ষা লাভ করার পর ফিরে এসেছে জুলেখা, মনিরার দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশী ব্যথিত হলো সে।
জুলেখা ধনবান জাহাঙ্গীর শাহর সর্বকনিষ্ঠা কন্যা। জাহাঙ্গীর শাহ কান্দাই শহরের বিশিষ্ট ধনী ব্যবসায়ী ছিলেন। চৌধুরী বাড়ির প্রায় সমকক্ষই বলা চলে তাদের।
চৌধুরী সাহেব আর জাহাঙ্গীর শাহ বন্ধু লোক ছিলেন। এক সঙ্গে মেলামেশা, খানাপিনা বা ফাংশনে যোগদান করা সবই ছিলো তাঁদের এক সাথে। জাহাঙ্গীর শাহ ধনবান ব্যক্তি হলেও তাঁর মন বা হৃদয় নীচ ছিলো না। ন্যায়ভাবে অর্থ উপার্জনই ছিলো তাঁর নীতি।
চৌধুরী সাহেবের সঙ্গে তাই জাহাঙ্গীর শাহর হৃদ্যতা কোনোদিন এতটুকু লাঘব হয়নি।
চৌধুরীবাড়ি আর শাহবাড়ির দূরত্ব ছিলো বেশ কিছু, প্রায় মাইল দুই। তবু চৌধুরী বাড়ির সঙ্গে মেলামেশায় কোনোদিন বিঘ্ন ঘটেনি শাহবাড়ির।
মনিরা আর জুলেখার মধ্যেও ছিল তাই অভেদ্য ভালবাসা। উভয়ে উভয়ের কাছে ছিলো এক মন এক প্রাণ। জুলেখার সঙ্গে মনিরা যেমনভাবে মিশতো তেমন করে আর কারও সঙ্গে মিশতে পারেনি। যদিও মনিরা ছিলো আর্টসের ছাত্রী ও জুলেখা সায়েন্সের ছাত্রী। স্কুলজীবনের প্রীতি তাদের দুজনকে একসূত্রে গেঁথে ফেলেছিলো শক্ত করে। কলেজ জীবনেও ওরা দুজন দু’জনের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারেনি কোনোদিন।
মনিরাই ওকে নিজের গাড়িতে কলেজে নিয়ে যেতো প্রতিদিন। একসঙ্গে কলেজে যাওয়া থেকে একসঙ্গে সব কিছু চলতো ওদের দুজনের মধ্যে।
হঠাৎ জুলেখার সঙ্গে মনিরার ছাড়াছাড়ি হয়ে গিয়েছিলো ওরা উভয়ে যখন কলেজ থেকে পাশ করে বের হলো। মনিরা মামা মামীর নয়নের মণি, কাজেই তাকে কান্দাই শহরেই এম এ ক্লাশে ভর্তি হতে হলো আর জুলেখা চলে গেলো বিদেশে। পিতামাতার ইচ্ছা-সর্বকনিষ্ঠা কন্যা জুলেখাকে তাঁরা বিলেতে পাঠিয়ে লেখাপড়া শেখাবেন। আরও দুটি কন্যা শাহ্ সাহেবের কাজেই কনিষ্ঠাকে দূরে পাঠাতে তাঁরা দ্বিধা করলেন না। বিশেষ করে জাহাঙ্গীর শাহর ইচ্ছা–কন্যাকে তিনি ডক্টর করবেন।
পিতার বাসনা পূর্ণ করবার জন্য জুলেখা বিদেশে যাত্রা করলো।
এরপর থেকে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলো উভয়ের। মনিরাও সেদিন এরোড্রামে বিদায় সম্ভাষণ জানাতে গিয়েছিলো জুলেখাকে। উভয়ের মধ্যে ছিলো এতো গভীর ভালবাসা মনিরা জুলেখাকে বিদায় দিতে গিয়ে কিছুতেই অশ্রুসম্বরণ করতে পারেনি।
