বৌরাণী, আমাদের দেহে প্রাণ থাকতে আমাদের সর্দারের মৃত্যু হবে এ কথা আপনি চিন্তা করতে পারলেন। দস্যু বনহুরকে মৃত্যুদণ্ড দেয় এমন সাধ্য কারও নেই–
রহমান!
হাঁ বৌরাণী, সর্দারকে আমরা উদ্ধার করবোই করবো। আমাদের জীবন দিয়েও তাকে আমরা ফিরিয়ে আনবো। কিন্তু বৌরাণী এ আপনি কি করলেন, আপনি কেন এ ভুল করলেন।
মরিয়ম বেগম নীরবে অশ্রু বিসর্জন করছিলেন।
সরকার সাহেব দাঁড়িয়েছিলেন কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের মত কোনো কথা তার মুখ দিয়ে বের হচ্ছিলো না।
রহমান বললো–আমি আর বিলম্ব করতে পারছিনে। অনেক কাজ আছে।
মনিরা বলে উঠলো–চলে যাচ্ছো রহমান?
হাঁ বৌরাণী, আবার আসবো।
সরকার সাহেব বললেন–মনিরা, রহমানই তোমাকে এই মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আনলো। তার ওষুধই তোমাকে এখনও জীবিত রেখেছে।
অস্ফুট কন্ঠে বললো মনিরা রহমান।
আসি বৌরাণী, খোদা হাফেজ।
খোদা হাফেজ! বললো মনিরা।
মনিরার অবস্থা একটু আরোগ্যের দিকে কিন্তু সে এখন আর দেখতে পায় না। দুনিয়ার সমস্ত আলো তার চোখে অন্ধকার। শহরের বড় বড় ডাক্তার বিমুখ হয়ে ফিরে গেলেন একবাক্যে সবাই বললেন বিষাক্ত ওষুধ পানে তার দৃষ্টি শক্তি সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। আর কোনো দিন সে দৃষ্টি শক্তি ফিরে পাবে না।
এই বিপদ মুহর্তে মরিয়ম বেগম নিজেও চোখে অন্ধকার দেখতে লাগলেন। কেঁদে কেটে আকুল হলেন তিনি। বিপদের উপর বিপদ–একে পুত্রশোকে কাতর তার উপর মনিরার চোখ দুটো চির দিনের জন্য অন্ধ হয়ে গেলো। তিনি যেন অকুল সাগরে হাবুডুবু খেতে লাগলেন।
সুযোগ পেলেই আসে রহমান, নানারকম প্রবোধ বাক্যে মনিরা ও মরিয়ম বেগমকে সান্ত্বনা দেয় সে।
মনিরা নিজের দৃষ্টিশক্তি হারিয়েও দুঃখিত নয়, তার সদা-সর্বদা চিন্তা স্বামীর জন্য। রহমানকে বলে মনিরা–কেন আমি বেঁচে রইলাম? কেন আমাকে মরতে দিলে না রহমান? দৃষ্টিশক্তি হারিয়েও আমার দুঃখ নেই কেমন করে সহ্য করবো ওর মৃত্যু সংবাদ?
বৌরাণী, সর্দারের মৃত্যুসংবাদ আপনাকে শুনতে হবে না। দৃঢ় কণ্ঠে বললো রহমান।
সত্যি তাই যেন হয় রহমান, তাই যেন হয়।
*
মাঝে মাত্র আর দুটো দিন আছে দস্যু বনহুরের মৃত্যুদণ্ডের। দু’দিন পর জন্ধু কারাগারে বনহুরকে ত্রিশূল বিদ্ধ করে গুলী করা হবে।
পত্রিকায় পত্রিকায় এ সংবাদ ছাপা হলো। লোকের মুখে মুখে সমস্ত শহরবাসীর ঘরে ঘরে প্রচার হলো দস্যু বনহুরের মৃত্যুদণ্ডের খবর। শুধু শহরেই নয়–দেশ হতে দেশান্তরে এ খবর গিয়ে পৌঁছলো।
দস্যু বনহুরের মৃত্যুদণ্ড সংবাদে খুশি হলো অনেকেই আবার অনেকে গোপনে দুঃখ প্রকাশ করতে লাগলো। দীনহীন অনাথগণ অশ্রু বিসর্জন করতে লাগলো।
গ্রাম হতে গ্রামান্তরে, পথে-ঘাটে-মাঠে সবাই জানতে পারলো দস্যু বনহুরের মৃত্যুদণ্ডাদেশের কথা। সকলেরই একমাত্র বলার বস্তু হলো ঐ এক সংবাদ।
ধনপতিগণ নিজ নিজ আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবদের কাছে খুশির সাথে এ সংবাদ পরিবেশন করতে লাগলো। এবার থেকে তারা নিশ্চিন্ত মনে তাদের কারবার ব্যবসা বাণিজ্য চালিয়ে যেতে পারবে। আর দস্যু বনহুরের ভয়ে তাদের কম্পিত হৃদয় নিয়ে কালাতিপাত করতে হবে না। টাকা পয়সা নিয়ে পথ-ঘাট চলতে তেমন করে সাবধান হওয়ার প্রয়োজন হবে না। কত নিশ্চিন্ত এখন তারা। আরও অনেক কথা ধনবানদের মনে উদিত হলো বিশেষ করে কালো বাজারে যারা বেশ। ফেঁপে উঠেছে তাদের মনে আনন্দের বান বয়ে গেলো। বনহুর গ্রেপ্তারের পর হতে একটা খুশিভাব তাদের আচ্ছন্ন করে ফেলেছিলো।
ধনবানগণ যেমন হয়েছিলো খুশি, অসহায়-অনাথ আতুর যারা, বনহুরের অনুগ্রহে যারা। আজও বেঁচে আছে তাদের হৃদয়ে শেল বিদ্ধ হলো। অন্তরে শুধু আঘাতই পেলো না তারা তাদের বেঁচে থাকবার আশা ধূলিসাৎ হলো। বেচারা অন্ধ-আতুর-খঞ্জ সবাই খোদার কাছে দস্যু বনহুরের জন্য দোয়া চাইতে লাগলো।
বৃদ্ধা জরাগ্রস্ত অসহায় তারাও জায়নামাজে বসে দু’হাত তুলে বললো–হে পরওয়ারদেগার বনহুরকে তুমি রক্ষা করে নাও।
জানি না খোদা মেহেরবান অনাথ-অসহায় দীনহীনদের দোয়া কবুল করলেন কিনা।
মরিয়ম বেগম পুত্রের জন্য খোদার দরগায় ফরিয়াদ জানালেন জায়নামাজে বসে মাথা ঠুকে দোয়া করতে লাগলেন তিনি। তাঁর ললাটের রক্তে রাঙা হয়ে উঠলো সেজদার স্থান। মায়ের এই আকুল আহ্বানে আকাশ বাতাস নীরবে যেন অশ্রু বিসর্জন করে চললো।
মনিরা এখনও শয্যাশায়ী, উঠা-বসা তার পক্ষে অত্যন্ত কষ্টকর।
খবর পেয়ে মনিরার বান্ধবীগণ এলো দেখা করতে। কিন্তু মনিরার অবস্থা দেখে তাদের দুঃখের সীমা রইলো না। সবাই মনিরার করুণ অবস্থায় মর্মাহত হলো।
মনিরার অসুস্থতার কারণ কি খুঁজে কেউ পেলো না। সবাই নানা কথা বলে তাকে সান্ত্বনা। দিতে লাগলো।
একটা ব্যাপার ঘটেছিলো–বান্ধবীরা আজও জানে না মনিরা বিবাহিতা, তার একটা সন্তানও জন্মেছে। এ কথা কেউ শোনেনি বা জানে না এখনও।
মনিরা কারও সঙ্গে মিশতো না বা কারও বাড়ি যেতো না তাই বান্ধবীরাও তার কাছে আসতো কম।
অবশ্য দস্যু বনহুরের সঙ্গে যে তার একটা সম্বন্ধ আছে, এটা গোপনে কেউ কেউ জানতো। কিন্তু তার সঙ্গে যে স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ক ঘটে গেছে এটা কেউ জানতো না।
মনিরার কোলে যখন নূরকে অনেকেই দেখে অবাক হয়েছিলো তখন বলতো মনিরা আমার বোনের ছেলে কিনা, আমাকে বড় ভালোবাসে, ‘আম্মা বলে ডাকে।
