মনিরার ঠোঁটের ফাঁকে ওষুধটুকু ঢেলে দিলো সে অতি সন্তর্পণে। ঠিক সেই মুহূর্তে আজান ধ্বনি ভেসে এলো দূর কোনো মসজিদ থেকে।
রহমান সোজা হয়ে দাঁড়াবার পূর্বেই জেগে গেলেন মরিয়ম বেগম, চোখ মেলে তাকিয়েই অজানা-অচেনা একটা লোককে কক্ষে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চিৎকার করে উঠলেন তিনি –কে–কে–
রহমান যেমনি জানালা দিয়ে পালাতে যাবে অমনি সরকার সাহেব রিভলভার হাতে মেঝেতে এসে দাঁড়ালেন–খবরদার, পালাতে চেষ্টা করলেই মরবে।
রহমান অগত্যা থমকে দাঁড়িয়ে পড়লো।
ফিরে তাকালো সে সরকার সাহেবের দিকে। রহমানকে সরকার সাহেব জানতেন, কারণ অনেক দিন সে এ বাড়িতে এসেছে নানা ছদ্মবেশে। আজ রহমানের শরীরে ড্রাইভারের ড্রেস এখনও বিদ্যমান।
সরকার সাহেব রহমানকে চিনতে পারলেন না। তিনি এগিয়ে গিয়ে রিভলভার চেপে ধরলেন তার বুকে। গম্ভীর কঠিন কণ্ঠে বললেন কে তুমি? কি কারণে এখানে এসেছিলে?
রহমান তার মুখ থেকে ছাট করা দাঁড়ি আর গোঁফ খুলে ফেললো।
সরকার সাহেব বলে উঠলেন–আপনি!
সরকার সাহেব রহমানকে চিনলেও মরিয়ম বেগম তাকে দেখেননি কোনোদিন, তিনি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন–কে এই বলিষ্ঠ যুবক, কি এর নাম, কেনই বা এখানে এসেছিলো আর সরকার সাহেবই বা তাকে চিনলেন কি করে।
মরিয়ম বেগম যখন অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন সরকার সাহেব আর রহমানের দিকে, তখন রহমান বললো–মা, আমিও আপনার একজন হতভাগ্য সন্তান। আপনার পুত্র দস্যু বনহুর। আমাদের সর্দার–
তুমি তুমি আমার মনিরের অনুচর সঙ্গী?
হাঁ, আমি বৌরাণীর বিষপানের কথা জানতে পেরেছি এবং সেই কারণেই এখানে এসেছি। আমাদের আস্তানায় এমন একটা ওষুধ ছিলো যে ওষুধ পান করলে সব রকম বিষক্রিয়া বিনষ্ট হয়ে যায়।
কই, কোথায় সে ওষুধ? বললেন সরকার সাহেব।
মরিয়ম বেগম আগ্রহভরা কন্ঠে বলে উঠলেন–এনেছো? এনেছো তুমি সেই ঔষুধ?
হাঁ মা, এনেছিলাম। বৌরাণীকে খাইয়ে দিয়েছি।
আনন্দভরা গলায় বলে উঠেন মরিয়ম বেগম–সত্যি তুমি আমার মনিরাকে ওষুধ খাইয়ে দিয়েছো? এবার আমার মনিরা বেঁচে উঠবে?
যদি আয়ু থাকে তবে নিশ্চয়ই বেঁচে উঠবে; ওষুধ আমি তাকেই খাইয়ে দিয়েছি।
সরকার সাহেব আর রহমান মনিরার বিছানার পাশে এসে দাঁড়ালো।
সরকার সাহেব হাতের রিভলভারটা রাখলেন টেবিলে।
রহমান বললো–প্রকাশ্যে আসার সুযোগ করে উঠতে পারিনি। তাছাড়া আপনারা যদি এ ওষুধ বৌরাণীকে পান করতে না দেন, সেই জন্যই আমি গোপনে তাকে ওষুধ খাইয়ে দিয়েছি।
সরকার সাহেব রহমানের হাত মুঠায় চেপে ধরলেন–আমি ভুল করে আপনাকে–না না, তাতে কি, আপনি তো জানতেন না আমি কে, আর কি উদ্দেশ্যেই বা এসেছিলাম।
হাঁ, জানতামনা বলেই এমন একটা অঘটন ঘটাতে যাচ্ছিলাম—
সরকার সাহেবের কথা শেষ হয় না, মনিরা অস্ফুট কন্ঠে বলে উঠে পানি–একটু পানি– দাও–
মুহর্তে মরিয়ম বেগম এবং সরকার সাহেবের মুখ খুশিতেই দীপ্ত হয়ে উঠে।
রহমানের চোখে মুখেও আনন্দের দ্যুতি খেলে যায়।
একসঙ্গে সবাই ঝুঁকে পড়ে মনিরার মুখের উপর।
রহমানের পাশের ঢাকা দেওয়া পানির গেলাসটা তুলে দেয় মরিয়ম বেগমের হাতে।
মরিয়ম বেগম একটু পানি ঢেলে দেন মনিরার ঠোঁটের ফাঁকে।
ব্যাকুল আগ্রহ নিয়ে সবাই তাকিয়ে আছে মনিরার মলিন মুখের দিকে।
ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকালো মনিরা।
মরিয়ম বেগম উদগ্রীব কণ্ঠে ডাকলেন–মা মনিরা!
মনিরা ক্ষীণ কণ্ঠে বলে উঠলো–এত অন্ধকার কেন? এত অন্ধকার কেন?
কই, কোথায় অন্ধকার মা?
সরকার সাহেব ওদিকের জানালাটা খুলে দিলেন সঙ্গে সঙ্গে এক ঝলক রৌদ্র এসে লুটিয়ে পড়লো মনিরার বিছানায়।
রহমান বললো এবার–বৌরাণী।
রহমানের কণ্ঠস্বরে মনিরা ফিরে তাকালো। কিন্তু মনিরা তাকে দেখতে পেলো না। বিষপানে তার দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হয়ে গিয়েছে। আবার বলে উঠলো– কে কে তুমি? আমি কাউকে দেখতে পাচ্ছিনে, দেখতে পাচ্ছিনে–
বৌরাণী, বৌরাণী আমি রহমান।
রহমান, রহমান তুমি এসেছো? কিন্তু আমি তোমাকে দেখতে পাচ্ছিনে– উঠে বসতে যায় মনিরা।
মরিয়ম বেগম মনিরাকে ধরে শুইয়ে দিয়ে বলে উঠেন সরকার সাহেব, একি হলো একি হলো আমাদের।
সরকার সাহেবের গণ্ড বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিলো, বললেন তিনি বেগম সাহেবা, ডাক্তার বলেছিলেন, যে বিষ মনিরা পান করেছে যদি বেঁচে থাকে তবে সে আর দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাবে। না।
অস্ফুট আর্তনাদ করে উঠলেন মরিয়ম বেগম–সরকার সাহেব।
রহমানের দু’চোখ ডিমের মত গোলাকার হয়ে উঠলো–একি অঘটন ঘটে গেলো বৌরাণীর।
মনিরা এতক্ষণে বুঝতে পারলো কি হয়েছে তার। মনে পড়লো ধীরে ধীরে সব কথা সে তো বিষ পান করেছিলো; তবু এখনও বেঁচে আছে। যে বিষ সে পান করেছে, বাঁচবারতো কথা না। মনিরা হঠাৎ চিৎকার করে উঠলো–আমি মরতে চাই। আমি মরতে চাই। এ জীবন নিয়ে আমি বেঁচে থাকতে পারবো না না না না।
একি পাগলামি করছো মা মনিরা? বললেন সরকার সাহেব।
মরিয়ম বেগম মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন।
রহমান বললো–বৌরাণী, আপনি এত অবুঝ জানতাম না। আপনি বিষ পান করলেন কেন? কেন আপনি এ ভুল করলেন বৌরাণী?
রহমান, এ জীবন নিয়ে বেঁচে থেকে কি হবে বলো? যার জন্য বেঁচে থাকবো সেই যদি চলে যায়। না না, আমাকে তোমরা মেরে ফেলো। মেরে ফেলো রহমান, ওর মৃত্যু সংবাদ যেন শুনতে না হয়।
