রহমান বাসযোগে তাদের শহরের আস্তানায় ফিরে এলো, নিজের গাড়ি নিয়ে রওয়ানা দিলো চৌধুরী বাড়ির দিকে।
কান্দাই শহর, মস্ত বড় শহর–শহরের প্রায় এক প্রান্তে চৌধুরীবাড়ি।
রহমান যখন চৌধুরী বাড়ি গিয়ে পৌঁছলো তখন অবাক হলো বাড়ির সবাই যেন বেশ উকুণ্ঠার সঙ্গে চলাফেরা করছে। বৈঠকখানা কক্ষে সরকার সাহেব আরও কয়েকজন লোকের সঙ্গে কথাবার্তা বলছেন।
এত রাতে চৌধুরীবাড়িতে সবাই জেগে, ব্যাপার কি?
রহমান দূর থেকে লক্ষ্য করছে, এগুবো কিনা ভাবছে সে। এমন সময় গাড়ি বারান্দার সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলেন সরকার
সাহেব এবং আর একজন ভদ্রলোক। ভাল করে লক্ষ্য করতেই চমকে উঠলো রহমান। দেখতে পেলো–ভদ্রলোকটার গলায় স্ট্যাথিসকোপ ঝুলছে নিশ্চয়ই কোনো ডাক্তার কিন্তু এত রাতে ডাক্তার কেন?
রহমান আতঙ্কিত হলো, তাহলে কি বৌরাণীর কোনো অসুখ! নিজকে ধরে রাখতে পারলো না সে এগুলো সম্মুখের দিকে। একটা ফুলঝাড়ের আড়ালে লুকিয়ে কান পাতলো রহমান। ঐ শোনা যাচ্ছে তাদের কথাগুলো, সরকার সাহেব বলছেন–ডাক্তার সাহেব মনিরা বাঁচবে তো?
ডাক্তার একটু চিন্তা করে বললেন–ওর পেটে আর বিষ নেই। সব আমি যন্ত্র দ্বারা বের করে নিতে সক্ষম হয়েছি; তবে এখনও আমি সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত নই।
রহমানের কানে যেন কে গরম সীসা ঢেলে দিলো, বৌরাণী তাহলে বিষ পান করেছে। সর্দারের মৃত্যুদণ্ডাদেশ জানতে পেরে সে এই কাজ করেছে।
ডাক্তার গাড়িতে উঠে বসলেন।
রহমান ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে পড়লো।
একটা গাছের নীচে বসে মাথায় হাত দিয়ে ভাবতে লাগলো রহমান–সর্দার নেই কার কাছে গিয়ে বলবে বৌরাণী বিষ খেয়েছে, এখন কি উপায়ে তাকে বাঁচানো যায়। সর্দারের উপস্থিতকালে এ ঘটনা ঘটলে তাকে এত ভাবতে হতো না। কিন্তু যেমন করে থোক বৌরাণীকে বাঁচাতেই হবে। হঠাৎ মনে পড়লো আস্তানায় একটা ওষুধ আছে সেই ওষুধ পান করালে যত বিষাক্ত জিনিসই ভক্ষণ করুক না কেন, অল্পক্ষণের মধ্যেই আরোগ্য লাভ করে। রহমান আর বিলম্ব না করে দ্রুত উঠে দাঁড়ালো, কিছুদূরে তার গাড়ি অপেক্ষা করছিলো। ফিরে গেলো গাড়ির পাশে।
দ্রুত হস্তে গাড়ির দরজা খুলে ড্রাইভ আসনে উঠে বসলো রহমান। গাড়ি এবার উল্কাবেগে ছুটতে শুরু করলো।
এ পথ, সে পথ করে যে পথ এগুলে শীঘ্র হবে সেই পথে গাড়ি চালিয়ে চললো।
রাত বেড়ে যাওয়ায় পথে প্রায় জনহীন, কোনো অসুবিধা হলো না রহমানের।
জঙ্গলের নিকট যেখানে তার অশ্ব দুলকী বাঁধা ছিলো সেই খানে পৌঁছে আশ্বস্ত হলো, কায়েস দুলকী রেখেছে ঠিক তার কথামতই। রহমান তাকে বলেছিলো হঠাৎ কখন না কখন আস্তানায় দরকার পড়ে কাজেই সব সময় দুলকীকে যেন পথের বাঁকে তাদের সেই গোপন জঙ্গলে বেঁধে রাখা হয়।
রহমান এবার দুলকীর পিঠে চেপে বসলো।
দুলকী তার মনিবের কথা যেন বুঝতে পারলো। ঠিক তাদের আস্তানার পথ ধরে দ্রুত ছুটে চললো। যেমন করেই হোক এই রাতেই তাকে আবার শহরে ফিরতে হবে। আবার তাকে যেতে হবে চৌধুরী বাড়ি না হলে বৌরাণীকে বাঁচানো যাবে না।
ঝোপ-ঝাড়-জঙ্গল ডিঙ্গিয়ে ছুটে চলেছে দুলকী। রহমানের শরীর বেয়ে ঘাম ঝরে পড়ছে। এখনও তার দেহে ড্রাইভারের ড্রেস।
পূর্বের সেই আস্তানা এখন আর নেই। এখন দস্যু বনহুর মাটির নিচে কৌশলে তার আস্তানা। তৈরি করেছে। লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয় হয়েছে এ আস্তানা তৈরি করতে। পুলিশের সাধ্য নেই। এই আস্তানার সন্ধান পায়।
রহমান যখন আস্তানায় পৌঁছলো তখন রাতের শেষ ভাগ। দুলকী থেকে নেমে সুড়ঙ্গপথে অগ্রসর হলো সে। বনহুরের কক্ষের একটা শিশিতে ঐ ওষুধ ছিলো।
রহমান বনহুরের কক্ষ থেকে ওষুধের শিশি নিয়ে যখন বের হতে যাবে, অমনি নূরী এসে দাঁড়ালো তার সম্মুখে–রহমান তুমি।
রহমান এত দ্রুত বের হতে যাচ্ছিলো, শুধু একটা শব্দ করলো–হাঁ।
কখন এলে? কোথায় যাচ্ছো আবার?
এখন সময় নেই বলবার ফিরে এসে বলবো নূরী।
নূরী কিছু বলবার পূর্বেই রহমান ছুটে বেরিয়ে যায়।
শুনতে পায় নূরী সুড়ঙ্গ পথে দ্রুত অশ্বপদ শব্দ। বুঝতে পারে রহমান চলে গেলো।
নূরীর দুশ্চিন্তা আরও বেড়ে যায়। এত রাতে রহমান কেনই বা এসেছিলো, আবার এমনভাবে কেনইবা চলে গেলো। কি যেন গোপনে নিয়ে গেলো সে। কি নিয়ে গেলো–বনহুরের কক্ষ থেকেই সে কিছু নিয়ে গেলো তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
কিন্তু কি নিয়ে গেলো সে?
নূরী যখন এসব চিন্তায় ব্যস্ত তখন রহমান দুলকীর পিঠে বন জঙ্গল ভেঙে ছুটছে। কোনো দিকে তার খেয়াল নেই। রাত ভোর হবার আগেই তাকে চৌধুরী বাড়িতে পৌঁছতে হবে।
অশ্ব চালনায় রহমান বনহুরের সমকক্ষই ছিলো। তীরবেগে ছুটে চললো দুলকীর পিঠে রহমান।
চৌধুরী বাড়ির পেছনে এসে অশ্বপৃষ্ঠ থেকে নেমে দাঁড়ালো রহমান। দুলকীকে একটা গাছের সঙ্গে বেঁধে রেখে পিছন পাইপ বেয়ে দ্রুত উঠে গেলো উপরে যে পথে বনহুর মনিরার কক্ষে প্রবেশ করে থাকে।
রহমান মনিরার কক্ষে প্রবেশ করে দেখলো–বিছানায় শায়িত মনিরা, শিয়রে একটা চেয়ার ঠেস দিয়ে চোখ বুজে আছে বৃদ্ধা মরিয়ম বেগম তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছেন তিনি।
রহমান পকেট থেকে ছোট্ট একটা শিশি বের করলো পাশের টেবিলেই ছিলো ওষুধ খাওয়ানোর গেলাস–ঐ গেলাসে শিশি থেকে ওষুধ ঢেলে মনিরার মুখের কাছে নিয়ে গেলো। চারিদিকে তাকিয়ে একবার দেখে নিলো রহমান।
