নূরী চলে গেলো তার নিজ কক্ষের দিকে।
রহমান এগিয়ে চললো সম্মুখে। তার ড্রেস পরিবর্তন কক্ষে প্রবেশ করলো।
যখন সে ড্রেস পরিবর্তন কক্ষ থেকে বাইরে বেরিয়ে এলো তখন তাকে ঠিক একজন ট্যাক্সি ড্রাইভার বলে মনে হচ্ছিলো। পিস্তলটা পকেটে রেখে নূরীর পাশে এসে দাঁড়ালো।
হঠাৎ একজন অপরিচিত লোক মনে করে নূরী কঠিন কণ্ঠে বললো-”কে তুমি? কেন এখানে এলে?
অন্যদিন হলে রহমান কিছুটা ঠাট্টা করতে ছাড়তো না, কিন্তু আজ তার মন অত্যন্ত দুশ্চিন্তায় পূর্ণ। একটু হাসবার চেষ্টা করে বললো–নূরী আমি শহরে যাচ্ছি।
রহমানের কন্ঠস্বর চিনতে পেরে আশ্বস্ত হলো নূরী। বললো এবার সে–শহরে যাচ্ছো?
হাঁ।
দুলকীকে নিয়ে যাবে না?
না, সেই কারণেই তো এই ড্রেস।
ফিরবে কখন রহমান?
কবে ফিরবো, কখন ফিরবো জানি না। নাও ফিরতে পারি।
এসব তুমি কি বলছো রহমান?
হাঁ নূরী, পুলিশ ইন্সপেক্টার মিঃ আহমদের গাড়ির ড্রাইভার আজ থেকে রহমান–বুঝলে?
পুলিশ ইন্সেপেক্টার আহম্মদ
হাঁ, যে আমাদের সর্দারকে বন্দী করেছে।
তুমি তুমি–
আমি তারই গাড়ির ড্রাইভার হয়ে সব সংবাদ সংগ্রহ করবো। তারপর–তারপর–থেমে যায় রহমান।
নূরী অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে।
রহমান পকেটে হাত রেখে পিস্তলটার অস্তিত্ব অনুভব করে নিয়ে পা বাড়ালো সামনের দিকে।
নূরী অস্ফুট কণ্ঠে বললো–খোদা হাফেজ।
*
মিঃ আহমদ ও মিঃ জাফরী গাড়ির পাশে এসে দাঁড়ালেন। ড্রাইভার গাড়ির দরজা খুলে দাঁড়িয়ে আছে।
মিঃ আহমদ গাড়িতে উঠে বসে মিঃ জাফরীকে বললেন–আপনিও আসুন আমার গাড়িতে, আপনার বাসায় পৌঁছে দিয়ে যাবো।
মিঃ জাফরী বললেন–আমার গাড়ি এতক্ষণও এলো না কেন বুঝতে পারছিনে।
হয়তো গাড়ির কোনো অসুখ ঘটেছে। বললেন মিঃ আহমদ।
মিঃ আহমদের হ্যস্যপূর্ণ কথায় মিঃ জাফরী হেসে গাড়িতে উঠে বসলেন।
ড্রাইভার গাড়িতে স্টার্ট দিলো।
পুলিশ ইন্সপেক্টারদ্বয় সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করলেন।
এক মুখ ধোয়া উদগীরণ করে বললেন মিঃ আহমদ –মিঃ জাফরী আমি কল্পনাও করতে পারিনি এত সহজে দস্যু বনহুরকে গ্রেপ্তারে সক্ষম হবো।
আপনার সূতীক্ষ্ণ বুদ্ধি কৌশলের জন্যই গভর্ণর খুশি হয়ে আপনাকে নতুন নামে ভূষিত করেছেন এবং লক্ষ টাকা পুরস্কার দিয়েছেন। দস্যু বনহুরকে আজও কেউ বন্দী করতে সক্ষম হয়নি।
বন্দী তো দূরের কথা তার দর্শন লাভই সম্ভব ছিলো না।
এবার শুধু বন্দীই নয় মিঃ আহমদ, আপনার অক্লান্ত চেষ্টায় দস্যু বনহুরকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করা সম্ভব হলো।
ড্রাইভারের হাতখানা মুষ্টিবদ্ধ হলো নিজের অজ্ঞাতে দাঁতে দাঁত পিষে আপন মনে বললো– সর্দারকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা দুনিয়ার কারও পক্ষে সম্ভব নয়, যতক্ষণ না পরওয়ার দেগার তার আয়ু শেষ না করে–
ড্রাইভারকে বিড়বিড় করে কিছু বলতে শুনে বললেন মিঃ আহমদ ড্রাইভার?
জ্বী, বড় শীত লাগছে, দাঁত ঠক ঠক করে কাঁপছে আমার।
শীতে দাঁত কাঁপলেও কাজ শেষ না করে উপায় নেই। চলো মিঃ জাফরীকে তার বাংলোয় পৌঁছে দিয়ে যেতে হবে।
ড্রাইভার মিঃ জাফরীর বাংলো অভিমুখে গাড়ি চালিয়ে চললো। দৃষ্টি তার গাড়ির সম্মুখে সীমাবদ্ধ থাকলেও কান ছিলো পিছনে। পুলিশ ইন্সপেক্টার দ্বয়ের কথোপকথন শুনছিলো সে মনোযোগ সহকারে।
মিঃ জাফরী এক সময় বলে উঠলেন–মিঃ আহমদ, দস্যু বনহুরকে হাঙ্গেরী কারাগার থেকে জন্ধুর কারাগারে নিয়ে যাওয়া ঠিক হচ্ছে?
কেন?
আমার মনে হয় তাকে হাঙ্গেরী কারাগারেই হত্যা করা সমীচীন হবে।
কিন্তু আইনে তাকে যেভাবে হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তাতে জম্বুর কারাকক্ষ ছাড়া উপায় নেই। ত্রিফলার সঙ্গে তার হাত দু’খানা, আর পা নিচে ফলার সঙ্গে বাঁধা থাকবে, চক্রাকারে এই ত্রিফলা ঘুরতে থাকবে, সেই অবস্থায় তাকে গুলী করে হত্যা করা হবে। কারণ, তার মত দুর্ধর্ষ দস্যুর মৃত্যু আর কোনো উপায়ে দেওয়া যায় না।
এইবার শয়তানকে উচিত সাজা দেওয়া হবে।
শুধু উচিত নয় মিঃ জাফরী। ত্রিফলা যখন চক্রাকারে ঘুরতে থাকবে তখন দূর থেকে তার হাতে পায়ে শরীরের বিভিন্ন অংশে গুলী ছোঁড়া হবে।
যতক্ষণ না দস্যুর মৃত্যু ঘটেছে ততক্ষণ আমি যেন নিশ্চিন্ত হতে পারছিনে মিঃ আহমদ।
হো হো করে হেসে উঠলেন মিঃ আহমদ–কেন বলুন তো?
মিঃ জাফরী বললেন–দস্যু বনহুরের অসাধ্য কিছু নেই।
মিঃ আহমদ এবার গম্ভীর কণ্ঠে বললেন–অগণিত পুলিশ ফোর্স পরিবেষ্টিত হয়ে দস্যু বনহুরকে নিয়ে যাওয়া হবে জম্বুর কারাকক্ষে। তার হাত পা সব থাকবে লৌহশিকলে আবদ্ধ এসব তো আপনি শুনেছেন–তবু আশঙ্কা?
নানা কথাবার্তার মধ্যে মিঃ জাফরীর বাংলোর সামনে এসে গাড়ি থামলো।
সেদিনের মত বিদায় নিয়ে নেমে পড়লেন মিঃ জাফরী।
মিঃ আহমদ বললেন ড্রাইভারকে লক্ষ্য করে–বাসায় চলো।
রহমানের পরিচিত এসব পথ। এ শহরের কার বাসা কোথায়, সব তার নখদর্পণে, কাজেই কোনো অসুবিধা হলো না।
মিঃ আহমদকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে ড্রাইভার বেশি রহমান ছুটি পেলো। রাতেও তার বিশ্রাম নেই।
রহমান এবার চললো চৌধুরী বাড়ির দিকে। বেশ কয়েক দিন হলো বৌরাণীর সন্ধান সে নিতে পারেনি। সর্দারের মৃত্যুদণ্ড সংবাদে নিশ্চয়ই বৌরাণী পাগলিনী প্রায় হয়ে পড়েছে। তাকে সান্ত্বনা দেওয়া নিতান্ত প্রয়োজন।
কিন্তু এত রাতে চৌধুরী বাড়িতে গিয়ে বৌরাণীর সঙ্গে দেখা করা কি সম্ভব হবে? দেখা না করলেও তো নয়। যেমন করে হোক উপায় খুঁজে নিতে হবে তাকে।
