রহমান এবার হেসে উঠলো– নূরী, তুমি উন্মাদ হয়ে পড়েছে।
না, আমি উন্মাদ হইনি।
তাহলে তুমি এতক্ষণে আমাকে বন্দী করবার জন্য কায়েসকে নির্দেশ দিতে না।
তুমি বিশ্বাসঘাতক।
নূরী, জবান সংযত করে কথা বলো। নারী বলে তোমাকে ক্ষমা করলাম। অন্য কেউ হলে এতক্ষণ তার বুকের রক্তে দরবার কক্ষের মেঝে লালে লাল হয়ে উঠতো। যাক, শোন, বাজে চিন্তা করবার সময় নেই, আগামী সপ্তাহের প্রথম দিন সর্দারকে জম্বুর কারাকক্ষের গুপ্তস্থানে গুলীবিদ্ধ করে হত্যা করা হবে।
উঃ! এত বড় কথা বলতে পারলে রহমান।
যা ঘটতে যাচ্ছে তা বলতে পারবো না? শোন নূরী, তুমি দস্যুকন্যা এতে সহজে মুষড়ে পড়লে চলবে না। সর্দারকে রক্ষা করবার উপায় খুঁজতে হবে।
প্রাণ দিয়েও আমি তোমাকে সাহায্য করবো রহমান।
হাঁ, তাই চাই। সর্দারকে হাঙ্গেরী কারাকক্ষে এখন বন্দী করে রাখা হয়েছে।
সেখান থেকে একবার হুর পালাতে সক্ষম হয়েছিলো!
হাঁ নূরী, কিন্তু এবার তাকে পূর্বের মত রাখা হয়নি। লৌহ পাত দিয়ে তৈরি সেই কক্ষ। শুধু তাই নয়, লৌহ কারাকক্ষের চারপাশে সদাসর্বদা রাইফেলধারী পাহারাদার দণ্ডায়মান। এক জন দু’জন নয়, শত শত পুলিশ ফোর্স সমর প্রাঙ্গণের সৈনিকের মতই সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে। যে কোনো মুহূর্তে যেন বিপক্ষ বাহিনী তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে এইভাবে তারা প্রস্তুত হয়ে আছে।
তাই বলো, না হলে কি কেউ সিংহশাবককে বন্দী করে রাখতে পারে। আমার হুর তাহলে …তাহলে মুক্তি পাবে না।
শোন নূরী।
বলো?
আগামী সপ্তাহে প্রথম দিন বেলা দু’টায় প্রকাশ্য কান্দাইর রাজপথ দিয়ে শত শত পুলিশ ফোর্স পরিবেষ্টিত হয়ে সর্দারকে নিয়ে যাওয়া হবে জম্বুর কারাকক্ষে। ওখানে একটা গুপ্তকক্ষ আছে, সেই কক্ষে তাকে হত্যা করা হবে গুলীবিদ্ধ করে। কিন্তু যখন তাকে পুলিশ ভ্যানে শত শত পুলিশফোর্স বেষ্টিত করে কান্দাই থেকে চব্বিশ মাইল দূরে জন্ধুর কারাকক্ষে নিয়ে যাওয়া হবে, তখন একটি মাত্র সুযোগ তাকে উদ্ধার করবার।
হঠাৎ নূরীর চোখ দুটো উজ্জ্বল দীপ্ত হয়ে উঠলো, খুশিভরা গলায় বলে উঠলো সে ঐ মুহূর্তে আমার মনে হয় পালাতে সক্ষম হবে রহমান? আমার হুর পালাতে সক্ষম হবে …
নূরীর কথায় রহমান কিছুমাত্র খুশি না হয়ে বললো– যা ভাবছো তা অসম্ভব নূরী। সর্দারের সমস্ত শরীর থাকবে লৌহ শৃঙ্খলাবদ্ধ। হাতে থাকবে লৌহ হাতকড়া, কোমরে গলায় পিঠে — সমস্ত দেহটা জড়ানো থাকবে লৌহ শিকলে কি উপায়ে সে পুলিশ ফোর্সকে পরাজিত করে পালাতে সক্ষম হবে, বলো? একটু থেমে বললো রহমান–হাঙ্গেরী কারাগার হতে যখন কান্দাই রাজপথ দিয়ে পুলিশ ভ্যানগুলো জন্ধু অভিমুখে রওয়ানা দেবে ঠিক সেই মুহূর্তে আক্রমণ চালাতে হবে আমাদের। রক্ত ক্ষয় হবে প্রচুর, কিন্তু যেমন করে হোক উদ্ধার করতে হবে সর্দারকে।
আমিও তোমাদের সহায়তা করবো রহমান।
কিন্তু তুমি যে,–
আমি নারী তাই ভয় পাচ্ছো? কিন্তু জানো না– আমি যেমন কোমল হৃদয়, তেমনি ভয়ঙ্করী– নূরীর দু’চোখে যেন আগুন ঠিকরে বের হচ্ছে।
রহমান স্তব্ধ নিশ্বাসে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো নূরীর মুখের দিকে, তারপর বললো– বেশ তাই হবে। এবার ফিরে তাকালো। সে অনুচরগণের মুখে ভাই, আমাদের জীবন-মরণ সমস্যা এখন সম্মুখে। প্রাণের মায়া বিসর্জন দিয়ে সর্দারকে উদ্ধার করতে হবে।
সমস্বরে বলে উঠে অনুচরগণ … আমরা সর্দারের জন্য প্রাণ দেবো। আমরা সর্দারকে উদ্ধার করবো। আমরা শপথ করছি।
শত শত অনুচর কণ্ঠের বজ্রধ্বনিতে প্রকম্পিত হয়ে উঠলো দস্যু বনহুরের দরবারকক্ষ।
রহমান তার দক্ষিণ হাতখানা উর্ধ্বে তুলে ধরে মুষ্টিবদ্ধভাবে বলে উঠে সাবাস! সাবাস ভাই!
সমস্ত দস্যগণের চোখে যেন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ নির্গত হয়।
মশালের আলোতে চক চক করে উঠে তাদের চোখগুলো। বলিষ্ঠ দেহের মাংসপেশীগুলো শক্ত হয়ে উঠে ইস্পাতের মত। মুখমন্ডল কঠিন হয়ে উঠে তাদের। সর্দারের মুক্তি কামনায় সবাই। আজ বদ্ধপরিকর।
তখনকার মত দরবারকক্ষ ত্যাগ করবার জন্য আদেশ দেয় রহমান অনুচরগণকে।
সবাই কুর্ণিশ জানিয়ে বিদায় গ্রহণ করে।
রহমান এবার পত্রিকাখানা মেলে ধরে টেবিলে। নূ
রী ঝুঁকে পড়ে বলে রহমান, কবে সেই দিন?
আগামী মঙ্গল বার–আজ থেকে আটদিন পর।
আজও বুঝি ঐ দিন?
হাঁ, আজ ঐ দিন, মঙ্গলবার। নূরী আমাকে এক্ষুণি একটু বাইরে বের হতে হবে চলো। দরবারকক্ষ হতে বাইরে বেরিয়ে আসে রহমান আর নূরী।
দস্যু বনহুরের দরবারকক্ষ হতে বাইরে বেরিয়ে আসতেই দরজা বন্ধ হয়ে গেলো কেউ বুঝতে পারবে না সেখানে কোনো দরজা বা কোনো গর্ত আছে। একটা পাথরের বিরাট চাপ ছাড়া কিছু মনে হবে না।
দস্যু বনহুর যখন ঐ দরবারকক্ষে তার অনুচরদের নিয়ে আলাপ আলোচনায় রত থাকে, তখন দরজা এমনভাবে বন্ধ থাকে বাইরে থেকে কেউ বুঝতে পারবেনা এটা পাথরখন্ড নয়; কোনো দরজা বা কোনো কক্ষে প্রবেশপথ। দরবারকক্ষের কোনো কথাবার্তা বাইরে থেকে শোনবার উপায়। নেই। এতটুকু শব্দও বাইরে আসে না।
পাথরখণ্ডের দুই পাশে দু’জন রাইফেলধারী দস্যু অনুচর সদাসর্বদা পাহারায় নিযুক্ত রয়েছে।
রহমান আর নূরী বাইরে আসতেই রাইফেলধারী পাহারাদ্বয় কুর্নিশ জানালো। সর্দারের অনুপস্থিতিতে রহমানকে তারা সর্দারের মতই সমীহ করে। সে যেভাবে তাদের পরিচালনা করে সেইভাবেই কাজ করে তারা। তার কথায় উঠে-বসে।
