মামীমা, আমি যেন আর পারছি না! ওর মৃত্যুর জন্য আমিই দায়ী। সেদিন ওকে আমি জোর করে ধরে নিয়ে গিয়েছিলাম, আমি জানতাম না নিজের মাথায় নিজে কুঠারাঘাত করতে চলেছি। মামীমা, যেতে চায়নি– ও যেতে চায়নি—
মনিরার চোখের পানিতে সিক্ত হয়ে উঠে মরিয়ম বেগমের বুকের বসন। চোখের অশ্রু নেই, মুখে কথা নেই! পলক পড়ছে কিনা বোঝা যায় না। নিশ্চল পাথরের মূর্তির মত বসে থাকেন তিনি।
অনেকক্ষণ কেঁদে কেঁদে কিছুটা হাল্কা হয়ে আসে মনিরার বুকের ভিতরটা। আঁচলে চোখ মুছে নিয়ে সোজা হয়ে বসে সে। বলে– মামীমা, ওকে বাঁচানোর কি কোনো উপায় নেই?
আচম্বিতে মরিয়ম বেগম যেন পাল্টে যান, দৃঢ় কণ্ঠে বলেন– না। ওকে বাঁচাতে চাইনে। ওকে মরতে দে… ওকে মরতে দে…তবু নিশ্চিন্ত হবো। তিল তিল করে যে তুষের আগুন আমার বুকের মধ্যে দাহ করে চলেছে, একবারে সে আগুন নিভে যাবে– নিভে যাবে–
এ তুমি কি বলছো মামীমা! এ তুমি কি বলছো?
আর সহ্য হয় না। কোন অলক্ষুণে মুহূর্তে ওর জন্ম হয়েছিলো। কোন অশুভ মুহূর্তে—
না না, তুমি জানো না মামীমা, অলক্ষুণে সে নয়, অশুভ মুহূর্তেও তার জন্ম হয়নি।
তুই জানিসনে মনিরা, ওর জন্মাবার পর থেকে আমি মনে শান্তি পাইনি। কেন যেন ওর মুখের দিকে তাকালেই মন আমার আনন্দের চেয়ে নিরানন্দে ভরে উঠতো। কেন জানিস? মনে হতো এত সুন্দর জিনিস কোনোদিন থাকবার নয়। ফুল ফোটে-ঝরে যায়। চাঁদ হাসে, আবার অন্ধকার আসে। কেন যেন আমার মনে হতো ওকে আমি ধরে রাখতে পারবো না, কখন হারিয়ে ফেলবো–কখন হারিয়ে যাবে–যেমন মানিক সিন্দুকে রেখেও মালিক শান্তি পায় না। ঠিক আমার অবস্থাও তেমনি ছিলো–কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে বললেন মরিয়ম বেগম শেষ পর্যন্ত আমার। আশঙ্কায় পরিণত হলো, হারালাম আমার মাথার মনি– পারলাম না কিছুতেই তারে ধরে রাখতে– পারলাম না– মরিয়ম বেগমের গণ্ড বেয়ে গড়িয়ে আসে দু’ফোঁটা তপ্ত অশ্রু।
মনিরা বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলে উঠলো– মামীমা, আমিও পারলাম না ওকে ধরে রাখতে– কিন্তু–আমি বেঁচে থাকবো আর ও চলে যাবে! না না, এ হতে পারে না–এ হতে পারে না–মনিরা।
কক্ষ থেকে বেরিয়ে পাশের কক্ষে চলে যায়।
*
ক্ষিপ্তের ন্যায় পায়চারী করে চলেছে রহমান। দক্ষিণ হাতের মুঠায় তার কান্দাই দৈনিক পত্রিকা। মাঝে মাঝে পত্রিকাখানায় দৃষ্টি নিক্ষেপ করে অধর দংশন করছে সে। চোখেমুখে ফুটে উঠেছে একটা ক্রুদ্ধ হিংস্র ভাব। ফোঁটা ফোঁটা ঘাম ফুটে উঠেছে তার ললাটে। ভোরে শিশির বিন্দুর মতই চকচক করছে দরবার-কক্ষের মশালের আলোতে।
একটা পাথরখণ্ডের পাশে দণ্ডায়মান নূরী। আজ তার শরীরে ঘাগড়া আর ওড়না নয়। চুলটাও সাপের মত বিনুনী করে ঝুলে পড়েনি পিঠের উপরে। পুরুষের মত প্যান্ট আর চোস্ত সার্ট, মাথার পাগড়ি, চুলগুলো তারই মধ্যে বেশ করে জড়ানো। মুখভাব গম্ভীর ইস্পাতের মতই শক্ত হয়ে উঠেছে।
দরবার কক্ষের মেঝেতে দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য দস্যু। বলিষ্ঠ মজবুত চেহারা, শরীরে জমকালো পোশাক, মাথায় পাগড়ি এবং প্রত্যেকের হাতেই রাইফেল আর বন্দুক। মুখে গালপাট্টা বাঁধা সকলের। এরা দস্যু বনহুরের পাতাল গহ্বরের অনুচর, নিতান্ত প্রয়োজন নাহলে এদের বাইরে বের করা হয় না। এরা যেমন দুর্ধর্ষ, তেমনি ভয়ঙ্কর। এরা মারতেও ভয় করে না, মরতেও না। যেমন সাহসী তেমিন তেজোদীপ্ত এরা। দস্যু বনহুরের অংশগুলি হেলনে এরা উঠে এবং বসে।
রহমান আজ সর্দারের এই বিপদ মুহূর্তে এদের বের না করে পারলো না।
কায়েসও অত্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়েছে তাদের সর্দারের জন্য। সেও উৎকণ্ঠিতভাবে দাঁড়িয়ে আছে একপাশে। সকলেরই মুখোভাবে প্রকাশ পাচ্ছে একটা কঠিন ভাব।
থমকে দাঁড়িয়ে বলে উঠে রহমান- ভাইসব, তোমরা জানো আজ আমরা রাজাহারা প্রজা হয়ে পড়েছি। সর্দার আজ পুলিশের কারাকক্ষে বন্দী, শুধু বন্দী নয় তাকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করা হয়েছে। হঠাৎ উন্মাদিনীর ন্যায় হেসে উঠে নূরী– হাঃ হাঃ হাঃ, হাঃ হাঃ তারপর হাসি থামিয়ে বলে– দস্যু বনহুরের মৃত্যুদণ্ড হাঃ হাঃ হাঃ। দাঁত পিষে বলে আবার নূরী– কার সাধ্য দস্যু বনহুরকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে। রহমান, তোমরা প্রস্তুত হয়ে নাও, আজ রাতে কান্দাই পুলিশ অফিসে হামলা চালাবো।
রহমান কিছু বলবার পূর্বেই ক্রুদ্ধ অনুচরগণ বজ্রধ্বনি করে উঠে– নূরী রাণী কি জয়! নূরীরাণী কি জয়! আজ আমরা কান্দাই পুলিশ অফিসে হামলা চালাবো।
রহমান গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠে পুলিশ অফিসে হানা দিয়ে সর্দারকে উদ্ধার করা যাবে না নূরী। এতে রক্তপাত ছাড়া লাভ হবে না কিছু।
নূরী দাঁতে দাঁতে পিষে বলে উঠলো শুধু পুলিশ অফিস নয় রহমান, সমস্ত শহরে আগুন জ্বালিয়ে দেবো। আমার হুরকে ওরা হত্যা করবে– এত সাহস ওদের।
নূরী, বিচারে সর্দারকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে, এর জন্য দায়ী নয় পুলিশ বাহিনী বা কান্দাইয়ের জনগণ।
তবে কে দায়ী?
দায়ী আইন। পুলিশ আইনের দাস, তারা তাদের কর্তব্য পালন করেছে।
রহমান!
নূরী, তুমি যেভাবে উত্তেজিত হচ্ছে তাতে ফল হবে না, খুব চিন্তা করে কাজ করতে হবে।
তবে কি করতে চাও রহমান? এতগুলো অনুচর থাকতে তোমরা সর্দারের মৃত্যু দেখতে চাও?
উপায় কি?
এবার নূরী ক্ষিপ্তের ন্যায় চিৎকার করে উঠে– রহমান, তুমি সর্দারের মৃত্যু কামনা করো! একে বন্দী করো কায়েস।
