যত ন্যায় কথাই বলো না কেনো, এবার তোমার সাধুগিরি সমাপ্ত হবে।
সে ভয়ে ভীত নয় বনহুর।
তোমাকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হবে। বললেন মিঃ আহম্মদ।
হঠাৎ অট্টহাসিতে ভেঙে পড়লো বনহুর–হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ–মৃত্যুদন্ড?
দস্যু বনহুরের হাসির শব্দ হাঙ্গেরিয়ার কারাগারের পাষাণ প্রাচীরে প্রতিধ্বনি জাগালো।
.
[পরবর্তী বই–দস্যু বনহুরের মৃত্যুদন্ড]
২.০২ দস্যু বনহুরের মৃত্যুদন্ড
‘দস্যু বনহুরের মৃত্যুদণ্ড’ কান্দাই পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠার বড় বড় অক্ষরে লেখা শব্দটার দিকে তাকিয়ে আছে মনিরা। গণ্ড বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু। অব্যক্ত একটা বেদনা গুমড়ে কেঁদে ফিরছে তার মনের মধ্যে। তুষের আগুনের চেয়েও সে জ্বালা তীব্র দাহময়।
মনিরার জীবন শিশুকাল থেকেই দুঃখ আর ব্যথায় গড়ে উঠেছে তিল তিল করে। স্নেহ মায়া মমতার অভাব সে পায়নি কোন দিন, কিন্তু তবু সে বড় অপেয়া। জীবনভর শান্তির ছোঁয়া কোনো সময় তার জীবনকে সুন্দর ও সুষমামণ্ডিত করতে পারেনি। চন্দ্র গ্রহণের মত কালকুট রাহুগ্রস্ত মনিরা। বসন্তের আহ্বানে বসুন্ধরা যেমন ফুলে ফুলে ভরে উঠে, তেমনি প্রকৃতির নিয়মানুযায়ী মনিরার দেহমনে এসেছে ভাবের আবেগ, যৌবনের কোঠায় পা দিয়েই পেয়েছে নির্মম আঘাত, মায়ের মৃত্যুশোক ভুলতে না ভুলতেই স্নেহময় মামাজানকে হারিয়ে চোখে অন্ধকার দেখছে। হাঁ, ভুলে গিয়েছিলো মনিরা তার শিশুকালের সাথী মনিরকে, বিস্মিত হয়েছিলো তার সব কথা। অতো ছোটবেলায় ছিলোনা কোনো প্রীতির বন্ধন, ছিলোনা হৃদয়ের নিভৃত কোণের কোনো স্পন্দন। মনির হারিয়ে গিয়েছিলো- এতটুকু অনুভূতি জাগেনি কোনো দিন তার মনে।
কালের অতলে তলিয়ে গিয়েছিলো সেদিনের সেই নৌকাডুবির কথা। স্বপ্নের মতও মনে হতো না তার, মনে হতো একটা গল্পে শোনা কাহিনীর মত। তার জীবনে একদিন যে এমন একটা ঘটনা ঘটেছিলো, ভাবতেও পারতো না মনিরা কোনো সময়।
জীবন জোয়ারে ক্ষুদ্র একটা স্মৃতিকণা কুটার মতই ভেসে গিয়েছিলো কোন্ অজানার অতলে। সেদিন কি মনিরা ভেবেছিলো, আবার একদিন এই ক্ষুদ্র স্মৃতিটুকু তার মনের গহনে প্রচণ্ড আলোড়ন জাগাবে।
সব কথা ছাপিয়ে আজ বারবার মনে পড়ছে– নাহার মঞ্জিলে কেন গিয়েছিলো সে–মনে পড়ছে স্বামীর প্রতিটি কথা। সেতো যেতে চায়নি, মনিরাই তাকে জোর করে নিয়ে গিয়েছিলো ঐ অলক্ষুণে প্রেতপুরীতে। যেখানে সে হারিয়েছে তার জীবনের সব আলো। দু’হাতে মুখ ঢেকে ফুলে। কাঁদে মনিরা।
নির্বোধ শিশুর মতই অঝোরে কাঁদে মনিরা, কোনো সান্ত্বনাই সে খুঁজে পায় না আজ। অকূল সাগরে যেন খেই হারিয়ে ফেলেছে মনিরা। দিশেহারার মত ঝাপসা চোখে তাকায় সে আংগুলের ফাঁকে পাশে পড়ে থাকা পত্রিকাখানায়, দস্যু বনহুরের মৃত্যুদণ্ড’, অস্ফুট কণ্ঠে বলে উঠে– না না, এ হতে পারে না, এ হতে পারে না– ওর মৃত্যুর পূর্বে আমি মৃত্যুবরণ করে নেবো।
মনিরা বালিশে উবু হয়ে পড়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে।
এমন সময় কক্ষে প্রবেশ করেন মরিয়ম বেগম। দরজার পাশে থমকে দাঁড়িয়ে তাকান কক্ষমধ্যে। মনিরাকে বিছানায় লুটিয়ে ফুলে ফুলে কাঁদতে দেখে হৃদয়টা তার যেন চুরমার হয়ে। যায়। অতি কষ্টে নিজকে সংযত করে নিয়ে ধীর পদক্ষেপে মনিরার পাশে গিয়ে বসেন, হাত রাখেন তার পিঠে– মা মনিরা!
না, হঠাৎ মামীমার করস্পর্শে মনিরা তার বুকে মাথা রেখে ডুকরে কেঁদে উঠে– একি হলো মামীমা।
পুত্রের মৃত্যুদণ্ড সংবাদ শ্রবণে কোন্ মা না বিচলিত হয়। কোন্ মার হৃদয়ে না দারুণ আঘাত লাগে। বিশ্বের সবকিছু ত্যাগ করতে পারে কিন্তু কোনো মা কি পারে সন্তানকে ত্যাগ করতে। দস্যু বনহুরের মৃত্যু সংবাদ শোনা অবধি মরিয়ম বেগমের হৃদয়ে তুষের আগুন জ্বলছিলো, চূর্ণ-বিচূর্ণ অন্তর নিয়ে তিনি ছটফট করছিলেন। পৃথিবীর কোথাও যেন নেই এতটুকু শান্তির ছোঁয়াচ। যেদিকে তাকাচ্ছিলেন সব যেন গাঢ় অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে আসছিলো। আলো, এতটুকু আলো যেন নেই কোথাও।
ঘরে, বাইরে, খোলা ছাদে একটু শান্তির জন্য বারবার গিয়ে দাঁড়াচ্ছিলেন মরিয়ম বেগম। কিসের সন্ধানে হাহাকার করে উঠছিলো তার মন। তখনও মুক্ত জানালায় দাঁড়িয়ে তাকাচ্ছিলেন সীমাহীন আকাশের দিকে। নেই কোথাও একটু শান্তি নেই। বুকের মধ্যে তার কান্নার রোল উঠছিলো কিন্তু চোখে পানি আসছিলো না। বুকটা যদি পাথরের তৈরি হতো, তাহলে এতক্ষণ ফেটে চৌচির হয়ে যেতো। লোহা হলেও বুঝি গলে যেতো– এত আগুন সহ্য হতো না।
মরিয়ম বেগম মনিরার কথায় কোনো জবাব দিতে পারলেন না। বুকের মধ্যে হাহাকার করে উঠলো একটা ব্যথার কাটা। হৃৎপিন্ডটা যেন হাতুড়ির আঘাতে কেউ থেতলে দিচ্ছিলো কাবাবের মাংসখণ্ডের মত কুচি কুচি করে।
মনিরার কান্নার সঙ্গে যোগ দিয়ে তারও ডুকরে কাঁদতে ইচ্ছা হচ্ছিলো, কিন্তু কান্না যে আসছিলো না। জমাট বরফের মত জমে গিয়েছিলো তার বুকের ভিতরটা।
বলে উঠলেন মরিয়ম বেগম– কাদিস না মনিরা। দেখছিস না, আমি মা হয়ে কেমন পাষাণ হয়ে গেছি! বুকটা আমার পাথরের মত শক্ত হয়ে উঠেছে। কাঁদতে চাইলেও কান্না বেরোয় না। মনিরা, শুধু আজ নয় আমি ছাব্বিশটা বছর ধরে ওর জন্য কেঁদেছি। কেঁদে কেঁদে শুকিয়ে গেছে আমার ভিতরটা, আর এক ফোঁটা অশ্রু নেই আমার চোখে।
