তাজ বনহুরকে পথের বাঁকে গাড়ি অবধি পৌঁছে দিয়ে ফিরে এসেছিলো। একজন অনুচর গিয়েছিলো তাজকে ফিরিয়ে আনার জন্য রহমান তার নিকট গিয়ে জিজ্ঞাসা করলো–খালেক,
সর্দার কি তোমাকে কিছু বলে গেছেন?
খালেক ঘর্মাক্ত কলেবরে গামছায় হাওয়া খাচ্ছিলো, রহমানকে দেখেই উঠে দাঁড়ালো বললো–আমি এইমাত্র তাজকে নিয়ে ফিরে এলাম।
তুমি আবার গিয়েছিলে?
হাঁ, আমি সর্দারের আদেশ মত শেষ রাতে আবার গিয়েছিলাম। ভোর পর্যন্ত সর্দারের অপেক্ষা করে ফিরে এলাম এই মাত্র।
সর্দার আসেন নি?
না হুজুর।
তাহলে সর্দার নিজেই ড্রাইভ করে গিয়েছিলেন?
হাঁ, তিনি নিজেই গাড়ি নিয়ে গিয়েছিলেন।
রহমান সোজা চলে গেলো তার ড্রেস পরিবর্তনের কক্ষে।
*
অসংখ্য পুলিশ পরিবেষ্টিত হয়ে দস্যু বনহুরের পুলিশ ভ্যান হাঙ্গেরিয়া কারাগারের সম্মুখে এসে দাঁড়ালো। আকাশচুম্বী প্রাচীরের ঘেরা হাঙ্গেরিয়া কারাগার। প্রাচীরে উপরিভাগে সূতীক্ষ্ণ ধার লৌহফলক চার আংগুল ফাঁকে ফাঁকে গাঁথা। একটি পাখি পর্যন্ত বসতে পারেনা আজ এটি প্রাচীরের উপরে। লৌহ গেট পূর্বের চেয়ে আরও মজবুত আরও দৃঢ় করা হয়েছে।
সেইবার দস্যু বনহুর হাঙ্গেরিয়া কারাগার থেকে পালাবার পর কারাগারটি আরও নতুনভাবে নতুন কৌশলে অতি ভয়ঙ্কর ইস্পাত দ্বারা মজবুত করে নেওয়া হয়েছিলো। আর যেন কোন দস্যু বা ডাকু ঐ ভাবে পালাতে সক্ষম না হয়।
দস্যু বনহুরকে পুনরায় গ্রেপ্তার করতে পারলে হাঙ্গেরিয়ার কারাগারেই তাকে বন্দী করা হবে এবং সে যেন আর পালাতে সক্ষম না হয়, সেজন্য পূর্ব হতেই হাঙ্গেরিয়া কারাগারে এ সাবধানতা।
বনহুরের সমস্ত শরীরে লৌহ শিকল বাঁধা। হাতে হাতকড়া শুধু পায়ে কোন বন্ধন নেই। চারিদিকে উদ্যত রাইফেল।
বনহুরকে হাঙ্গেরিয়া কারাগারে নিয়ে যাওয়া হলো।
সবচেয়ে বড় এবং ভেনটিলেটার বিহীন একটা কক্ষে দস্যু বনহুরকে আটকে রাখা হলো। লৌহ দরজায় একটি নয় সাতটি মজবুত তালা লাগানো হলো। যে কক্ষে বনহুকে বন্দী করা হলো সেই কক্ষের চারিপাশে সদা সর্বদা রাইফেলধারী পুলিশ সতর্ক পাহারায় নিযুক্ত রইলো। লৌহ দরজার পাশে চারজন পুলিশ গুলীভরা রাইফেল নিয়ে দন্ডায়মান।
অদ্ভুত এ দৃশ্য। পাষাণ প্রাচীরে ঘেরা লৌহ কারাগারে বন্দী এক রাজকুমার। দস্যু বনহুরের শরীরে এখনও সেই রাজকীয় ড্রেস, পুলিশ বাহিনীর সাহস হয়নি বনহুরের শরীর থেকে ড্রেস পরিবর্তন করে নিতে। কাজেই এখনও তার দেহে পূর্বের সেই ড্রেস বিরাজ করছে। শুধু মাথায় ক্যাপটা এখন আর নেই। আর নেই তার পেকেটে পিস্তলটা।
লৌহ খাঁচায় আবদ্ধ আজ সিংহ শাবক দস্যু বনহুর।
কারাগারে বন্দী হয়ে বনহুর ভূমি শয্যায় এসে বসলো।
ভোরের আলো তখন কারাগার কক্ষে প্রবেশ করেছে।
বনহুর ভাবতে লাগলো, আজ নাহার মঞ্জিলে সে বন্দী হয়েছে। মনিরাই তাকে নিয়ে এসেছিলো সেখানে, কিন্তু কেনো? তবে কি মনিরা জানতো সব? হঠাৎ এতো জায়গা থাকতে নাহার মঞ্জিল আসার এতো সখ কেননা চেপেছিলো মনিরার? কি যেন বলতে গিয়েও সে বলছিলো না, চেপে যাচ্ছিলো তার কাছে। নিশ্চয়ই মনিরা জানতো, না জানলে সে তাকে নাহার মঞ্জিলে প্রবেশে বাধা দিচ্ছিলো কেনো? মনিরার মুখোভাবও বেশ উত্তোজনাপূর্ণ ছিলো। একটা কেমন যেন ভাব লক্ষ্য করেছিলো বনহুর মনিরার মুখে– কিন্তু তা কি করে সম্ভব হয় মনিরা তার সঙ্গে চাতুরী করবে তাকে ধরিয়ে দেবো পুলিশের হাতে! না না, বিশ্বাস হয় না ওকথা, মনিরা স্বামীকে বন্দী করতে পারে না। তাহলে কি এর পিছনে কোন অদৃশ্য ইংগিত রয়েছে।
বনহুর যতই ভাবছে ততই ঘোরালো হয়ে আসছে সমস্ত ঘটনাটা মনিরা শুধু তাকে ভালই বাসেনা সমস্ত অন্তর দিয়ে তাকে কামনা করে। কিছুতেই সে পারে না তাকে পুলিশের কবলে তুলে দিতে। নিশ্চয়ই কোন রহস্য আছে–
বনহুর অধর দংশন করে তাকায় বাইরের দিকে, মনিরাকে পুলিশ বাহিনী তার বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছে কি না কে জানে। মনিরার মুখখানা কারাগারে বন্দী হয়েও ভুলতে পারে না বনহুর। সত্যিই যদি মনিরা জেনেশুনে নাহার মঞ্জিলে এনে পুলিশের হাতে সঁপে দিয়ে থাকে, তাহলেও বনহুর তাকে ক্ষমা করবে?
বনহুর যখন গভীর চিন্তায় মগ্ন, তখন মিঃ আহম্মদ ও মিঃ জাফরী কারাগারে এলেন বনহুরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে।
বনহুর মৃত্তিকা শয্যায় হাঁটুর মধ্যে মাথা গুঁজে বসেছিলো।
মিঃ জাফরী ও মিঃ আহম্মদ এসে দাঁড়ালেন লৌহ দরজার পাশে। শিকের ফাঁকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দেখলেন–বনহুর নিশ্চুপ বসে আছে, কিছু চিন্তা করছে সে।
মিঃ আহম্মদ বললেন–কি ভাবছো দস্যু সম্রাট?
বনহুর মুখ তুলে তাকালো, গম্ভীর কণ্ঠে বললো–ভাবছি আমার প্রজাদের কথা।
প্রজা! হাসলেন মিঃ আহম্মদ–রাজ্যের কথা না ভেবে প্রজাদের কথা ভাবছো?
হাঁ ইন্সপেক্টার রাজ্যের কথা ভাববেন আপনারা, আর আমি ভাববো আমার শত শত দুঃস্থ ভাই বোনদের কথা। যাদের চোখের পানিতে সিক্ত হয়ে উঠে কান্দাই এর শুকনো মাটি।
ওঃ খুব তো সাধু বাক্যে আওড়াচ্ছো, কিন্তু মনে রেখো, এবার এই লৌহকক্ষ থেকে তোমার। মুক্তি নেই। চালাকি করে আমাকে বন্দী করেছিলে এবার তার পরাভোগ ভোগ করো। কথাগুলি বললেন মিঃ জাফরী।
বনহুর হাসলো, উঠে দাঁড়ালো এবার সে কারাগার মধ্যে। এগিয়ে এলো লৌহশিকের পাশে, বললো–ইন্সপেক্টার আমি চালাকি করে বন্দী করেছিলাম বটে আপনাকে কিন্তু তার পিছনে কোন মন্দ অভিসন্ধি ছিলোনা। দস্যু হলেও আমার উদ্দেশ্য কোনদিন উকট নয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে। সংগ্রামই আমার কাজ।
