মনিরা দুই হাতে মুখ ঢেকে ছোট্ট বালিকার মত কেঁদে উঠে কালকের প্রভাতের কাছে। আজকের প্রভাত কত বিষময়–কত বেদনাদায়ক। কাল প্রভাতে এই মুক্ত জানালায় দাঁড়িয়ে নতুন সূর্যের দিকে তাকিয়ে ভেবেছিলো মনিরাসন্ধ্যায় আসবে সে, মিলিত হবে আবার ওরা দু’জনা! আর আজ সব আশা বাসনা মুছে গেছে নিঃশেষ হয়ে কোন্ অতলে। না জানি এখন তাকে কোথায় কোন কারাগারে বন্দী করে রাখা হয়েছে। খাবার দিয়েছে কি না দিয়েছে তারই বা ঠিক কি আছে।
স্বামীর চিন্তায় মনীরা ভুলে গেলো নিজের ক্ষুধা-তৃষ্ণা সবকিছু। ভোরের আলো নিষ্প্রভ হয়ে এলো তার চোখে।
*
একটা দুঃস্বপ্নে ঘুম ভেঙে গেলো নূরীর। ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসে তাকালো চারিদিকে, পাশে ঘুমন্ত মনি। কক্ষে আর কেউ নেই, নাসরিন আর অন্যান্য সংগিনীরা ঘুমাচ্ছে। তখনও। পাশের জানালা দিয়ে ভোরের আলো মেঝেতে ছড়িয়ে পড়েছে।
নূরী শয্যা ত্যাগ করে ছুটে গেলো বনহুরের কক্ষে। প্রবেশ করে দেখতে পেলো–শূন্য বিছানা পড়ে রয়েছে–বনহুর নেই। গত রাতের কথা মনে পড়লো নূরীর, বলেছিলো–সে আজ কোথাও যাবে না, বিশ্রাম করবে গোটা রাত।
কিন্তু কোথায় সে, তবে কি তার স্বপ্ন সত্যি!
ভোরের স্বপ্ন নাকি সত্য হয়, নূরী বসে পড়লো বনহুরের শূন্য বিছানায়। কক্ষের চারিদিকে তাকিয়ে দেখতে লাগলো, জামা কাপড়গুলি যেখানে যেমন তেমনি রয়েছে। মাথার পাগড়ীটাও টেবিলে পড়ে রয়েছে, তবে সে কোথায় গেছে। নূরী তাড়াতাড়ি বালিশ সরিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো–বালিশের তলায় রিভলভার রাখতো বনহুর, কিন্তু রিভলভারটা নেই তো সেখানে।
নূরী এলোমেলো কত কি চিন্তা করছে, চিন্তা করছে স্বপ্নের কথা। দেখছিলো নূরী অদ্ভুত স্বপ্ন–বনহুর আর সে একটা রথে চেপে আকাশপথে কোথায় যেনো উড়ে যাচ্ছিলো। শুভ্র মেঘের স্তরে স্তরে জোছনার আলো ছড়িয়ে পড়ছিলো। ফুরফুরে হাওয়া বইছিলো চুলগুলি উড়ছিলো তার পাশে বসে হাসছিলো বনহুর–সুন্দর মধুর সে হাসি।
অপলক নয়নে নূরী উপভোগ করছিলো প্রকৃতির এই মধুময় দৃশ্য।
কত সাগর নদী পেরিয়ে ওদের দুজনকে নিয়ে রথখানা হাওয়ায় ভেসে চলেছে, কোন। অজানার পথে। কত পাহাড় নদী গাছপালা। কত প্রান্তরের উপর দিয়ে তাদের রথ উড়ে চলেছে– বনহুর আর নূরী তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে।
হঠাৎ তারা দেখলো–দূরে মেঘের ফাঁকে একটি সুন্দর কক্ষ।
বললো নূরী–দেখছো হুর, কি সুন্দর ঐ কক্ষটা, কেমন মেঘের উপরে হাওয়ায় ভাসছে। কক্ষটার উপরে জোছনার আলো পড়ে অদ্ভুত এক রঙ এর সৃষ্টি হয়েছে যে ঠিক রামধনুর।
নূরীর দু’চোখে খুশির উচ্ছ্বাস এমন কক্ষ তো কোনদিন সে দেখেনি। মনের ভিতরে প্রবল বাসনা জাগলো বড় দেখতে ইচ্ছা হলো কক্ষটার মধ্যে। বললো সেহুর, ওখানে তুমি আমাকে নিয়ে যাবে?
নূরী লক্ষ্য করলো, তার কথায় বনহুরের মুখ গম্ভীর হয়ে এলো বললো না না, ওখানে যেতে নেই। অতি ভয়ঙ্কর স্থান ওটা ওখানে যেতে নেই।
নূরী ভীষণ জেদ ধরে বসলো–যাবেই সে ওখানে যত বিপদই থাক।
নূরীর জেদে বনহুর রাজি হলো।
রথের সারথীকে বললো বনহুর–ওই কক্ষটার দিকে চলো।
সারথী রথের মোড় ফিরিয়ে নিলো।
নূরীর মনে খুশি আর ধরছে না।
কক্ষের চারিপাশে সোনালী কারুকার্য খচিত দেয়াল–অপূর্ব এই কক্ষ। নূরীর মনে প্রবল বাসনা দেখবে সে ওর মধ্যে কি আছে।
কক্ষের সম্মুখে এসে তাদের রথ দাঁড়িয়ে পড়লো।
নূরীর হাত ধরে বনহুর এগুতে লাগলো কক্ষটার দিকে।
মেঘের ধাপে ধাপে পা রেখে এগুচ্ছে বনহুর আর নূরীর। মেঘের গায়ে জোছনার আলো ঝকমক করে উঠেছে। রামধনুর মত কত রঙ এর ছটা ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে।
বনহুর আর নূরী প্রবেশ করলো সেই কক্ষে, সঙ্গে সঙ্গে অদ্ভুত এক কান্ড ঘটে গেলো। কক্ষমধ্যে প্রবেশ করতেই অসংখ্য অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ছুটে এসে শরীরে লাগলো বনহুরের আগুন ধরে গেলো তার শরীরে। দাউ দাউ করে আগুন জ্বলতে লাগলো নূরী চিৎকার করে উঠলো, বাঁচাও– ও– ঘুম ভেঙে গেলো নূরীর।
নূরী বনহুরের শূন্য বিছানায় বসে ভোরের স্বপ্নের কথাই চিন্তা করছে, এমন সময় রহমান। প্রবেশ করলো সেই কক্ষে, নূরীকে দেখে বললো–সর্দার আসেনি?
নূরী রহমানকে দেখে উঠে দাঁড়ালো, বললো সেনাতো, বনহুর এখনো ফিরে আসেনি। কিন্তু সে কোথায় গিয়েছিলো বলতে পারো রহমান?
রহমান জানতো বনহুর আজ শহরে যাবে, চৌধুরী বাড়িতে। কিন্তু ভোরের পূর্বেই তো তার ফিরে আসার কথা ছিলো। দিনের বেলায় শহরে সে কিছুতেই থাকবেনা। তাছাড়া আস্তানায় অনেক কাজ আছে। ফিরে না আসার কারণ কি? নূরীর প্রশ্নে বললো রহমান–সর্দার, কোথায় গেছে আমি তো ঠিক জানি না।
জানো না?
না নূরী।
আমি একটা দুঃস্বপ্ন দেখেছি রহমান, ওর তো কোন বিপদ ঘটেনি? বিপদ! চমকে উঠে বললো রহমান।
হাঁ, রহমান আমার মন বলছে ওর কোন বিপদ ঘটেছে। তুমি যাও সন্ধান নিয়ে দেখো আজ এতো বেলা হলো তবু এলোনা কেনো।
রহমান চিন্তিত হলো, কিন্তু মুখে বললো–না, ভয় নেই নূরী, সর্দার নিশ্চয়ই এসে পড়বে।
রহমান নূরীর নিকট থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে এলো কিন্তু মনের মধ্যে একটা দুশ্চিন্তার ঝড় তোলপাড় শুরু করলো। সর্দার তাকে না বলে কোথাও রাত্রি যাপন করেনা আজ সে এমন করে কোথায় ডুব মারলো। ভয় না হলেও আশঙ্কা জাগলো।
