মরিয়ম বেগম মিঃ জাফরীর মুখে থেকে তড়িৎ গতিতে তাকালেন মনিরার মুখে।
মনিরা তখন নীরবে অশ্রু বিসর্জন করছিলো।
মরিয়ম বেগমের সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় হতেই মাথা নত করে অধর দংশন করতে লাগলো।
মনিরার অকাতর মুখের দিকে তাকিয়ে প্রথমেই তিন হকচকিয়ে গিয়েছিলেন, এবার সব স্পষ্ট হয়ে এলো তার কাছে। বুঝতে পারলেন, অমন একটা ঘটনা ঘটে গেছে যা অতি মর্মান্তিক –নিদারুণ।
মরিয়ম বেগমের মুখভাব লক্ষ্য করে বললেন মিঃ জাফরী–মিসেস চৌধুরী, বুঝতে পারছি এ সংবাদ আপনার হৃদয়ে দারুণ আঘাত করেছে। কিন্তু কি করবো, আপনার সন্তান হলেও আমরা তাকে ক্ষমা করতে পারিনে। আইনের চোখে সে অপরাধী, কাজেই কর্তব্যের–
এবার বলে উঠলো মনিরা মিথ্যা ছলনায় আমাকে ভুলিয়ে আপনার কর্তব্য পালন করেছেন। মিথ্যাই কি আপনাদের পেশা?
মিঃ জাফরী হাসলেন ন্যায় কার্য্যে মিথ্যার চেয়ে আরও কিছু করতেও আমরা রাজি আছি।
বলে উঠলেন মরিয়ম বেগম–আমার মনির আজ কি করেছিলো? কি অন্যায় সে করেছিলো আজ?
অন্যায় আজ না করলেও সে গুরুতর অপরাধী। তাকে যে কোন মুহূর্তে গ্রেফতার করা পুলিশ বাহিনীর কর্তব্য। বললেন মিঃ জাফরী।
মরিয়ম বেগমের গন্ড বেয়ে ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগলো। গম্ভীর স্থির হয়ে তিনি দাঁড়িয়ে রইলেন।
মিঃ জাফরী ও পুলিশ অফিসারদ্বয় মরিয়ম বেগমকে পুনরায় আদাব জানিয়ে বেরিয়ে গেলেন।
মিঃ জাফরী মরিয়ম বেগমকে শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন। শুধু তিনিই নন সমস্ত পুলিশ বাহিনী চৌধুরী পরিবারকে সব সময় সমীহ করে চলতেন কারণ বংশ মর্যাদার বা আভিজাত্যের দিক দিয়ে কোন অংশে তারা কম ছিলেন না। তাছাড়া দস্যু বনহুরকে পুলিশ বাহিনী ভালোচোখে না দেখলেও তার সম্বন্ধে ভিতরে ভিতরে মস্তবড় একটা মনোভাব পোষণ করতো সবাই।
মিঃ জাফরী বিদায় গ্রহণ করতেই মরিয়ম বেগম বলে উঠলেন– কি বলছিস মনিরা, ওকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে?
হাঁ মামীমা! কম্পিত গলায় বললো মনিরা।
মরিয়ম বেগম বললেন–কি হয়েছিলো? কি করে আমার মনিরা বন্দী হলো মনিরা?
চলো মামীমা, সব বলছি।
মনিরা আঁচলে চোখ মুছে মামীমাকে অনুসরণ করলো।
সিঁড়ি বেয়ে এগিয়ে চললো তারা, নকীবও চললো তাদের পিছনে পিছনে। ওর কাছে সব যেন কেমন এলো মেলো লাগছে।
মনিরার বুক ফেটে কান্না আসছিলো যখন সে সিঁড়ির ধাপ বেয়ে উঠে যাচ্ছিলো উপরে। মনে পড়েছিলো কয়েক ঘন্টা আগে তারা দু’জন এই সিঁড়ির ধাপ বেয়ে উপরে উঠে গিয়েছিলো কিন্তু এখন সে কোথায়–হুঁ হু করে কেঁদে উঠে মনিরা মন।
বার বার আঁচলে অশ্রু মোছে মনিরা। চোখের সম্মুখে ভেসে উঠছে স্বামীকে গ্রেপ্তারের সেই ভয়াবহ দৃশ্যটা।
উভয়ে মনিরার কক্ষে প্রবেশ করলো।
টেবিলে তখনও খাবার ঢাকা দেওয়া রয়েছে।
মনিরা কক্ষে প্রবেশ করেই পুনরায় দু’হাতে মুখ ঢেকে কেঁদে উঠলো। টেবিলে নজর পড়তেই ছটফট করে উঠলো তার হৃদয়ে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললো–মামীমা, একি হলো মামীমা? আমি যে নিজ হাতে ওকে পুলিশের হাতে সপে দিয়ে এলাম।
কি হয়েছে সব খোলাসা বল্ মনিরা, আমি সব শুনবো।
মামীমা, আমি কেমন করে বলবো আমি কোন্ মুখে বলবো তোমাকে সেই হৃদয় বিদারক কাহিনী।
মনিরা, আমি ওর মা, আমি বুকে পাষাণ বেঁধেছি। সে অপরাধী, যে কোন মুহূর্তে ওকে গ্রেপ্তার হতে হবে। কেউ তাকে আটকে রাখতে পারবেনা। বল বল মনিরা, রাজকুমারের বেশেই। কি আমার মনির এসেছিলো।
হাঁ মামীমা, কিন্তু কে বলেছে এ কথা?
নকীব, নকীব সব আমাকে বলেছে। মনিরা, আমার মনির কি এসেছিলো?
হাঁ, সেই এসেছিলো রাজকুমারের বেশে–মামীমা, ও বলেছিলে। ফিরে এসে খাবে– বাষ্পরুদ্ধ হয়ে এলো মনিরার কণ্ঠস্বর। ধীরে ধীরে টেবিলের পাশে গিয়ে খাবারের ঢাকনা তুলে দেখতে লাগলো। চোখ দিয়ে অশ্রুবিন্দু মুক্তার মত ঝরে পড়তে লাগলো খাবারের থালার উপরে। আবার বললো মনিরা–মামীমা, ফিরে এসে খাবে বলেছিলো কিন্তু ফিরে আর এলোনা। আমি কি জানতাম, আজ ওকে আমি হারাবো–নাহার মঞ্জিল আমাকে হাতছানি দিয়ে ডেকে নিয়ে। গিয়েছিলো–
নাহার মঞ্জিল!
হাঁ, মামীমা, নাহার মঞ্জিলেই আজ আমরা গিয়েছিলাম, শোন সব তোমাকে বলছি। সেদিন দুপুরে নকীব এসে বললো–আপা মনি, এক সন্ন্যাসী তোমার নূরের সন্ধান জানে বলে বলছে
সন্ন্যাসী!
হাঁ, সেই সন্ন্যাসী অন্য কেহ নয় পুলিশ ইন্সপেক্টার আহম্মদ। তিনিই ছদ্মবেশে এসেছিলেন মনিরা সমস্ত ঘটনা মামীমার নিকট বলে গেলো।
স্তব্ধ নিশ্বাসে সব শুনলেন মরিয়ম বেগম। চিত্রার্পিতের ন্যায় নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। একটি শব্দও তার মুখ দিয়ে বের হলো না।
মনিরা সব কথাই বলল। কেমন করে নাহার মঞ্জিলে তারা প্রবেশ করলো কি বলেছিলো তার স্বামী, সব ব্যক্ত করলো মনিরা মামীমার কাছে। আরও বললো–মামীমা আমিই ওকে বন্দী করলাম।
মরিয়ম বেগম মনিরার পিঠে হাত বুলিয়ে সান্তনার স্বরে বললেন –সবই অদৃষ্ট, নাহলে এতো বড় একটা ঘটনা ঘটবার পূর্বে এতোটুকু আমিও জানতে পারিনি কেনো?
আমিই এজন্য দায়ী মামীমা, আমিই এজন্য দায়ী।
মনিরা আঁচলে চোখ চাপা দিয়ে কাঁদতে লাগলো।
মরিয়ম বেগম হতাশভাবে বসে পড়লেন খাটের উপরে। চোখের সম্মুখে গোটা পৃথিবীটা যেন অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে এলো। পুত্র শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়লেন তিনি। টেবিলে খাবার ঢাকা, পাশে দাঁড়িয়ে আছে মনিরা পাথরের মূর্তির মত স্থির হয়ে। স্বামীর কথাগুলো ভাসছে তার কানের কাছে–তুমি খেয়ে আসতে বলেছিলে, কিন্তু না খেয়ে এসে ভুল করেছি মনিরা বড্ড ক্ষুধা পেয়েছে।–মনিরা খাবারের ঢাকনা খুলে নীরবে তাকিয়ে থাকে খাবারের দিকে। ভাবে, তার অদৃষ্টে নাই স্বামীর পাশে বসে তাকে খাওয়াবে। আনমনা হয়ে যায় মনিরা, স্পষ্ট দেখতে পায় চেয়ারে বসে আছে তার স্বামী, হাসছে মনিরার মুখের দিকে তাকিয়ে। মনিরা প্লেটখানা এগিয়ে দেয় স্বামীর সম্মুখে। মনিরাও হাসে–খাবার তুলে দেয় প্লেটে–উভয়ের মুখে তাকিয়ে আছে– মনিরা খাবার তুলে স্বামীর মুখে দেয়–হাত থেকে খাবার পড়ে যায় মাটিতে। তাড়াতাড়ি চমকে উঠে, মনিরা, নিজের ভুল বুঝতে পেরে ফিরে তাকায় খাটের দিকে। মামীমা নেই–কখন তিনি উঠে চলে গেছেন। মনিরা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে, ফিরে তাকায় মুক্ত জানালার দিকে। পূর্ব আকাশ আলোকিত করে প্রভাতের সূর্য উঁকি দিয়েছে।
