আচ্ছা তাই যাচ্ছি। মিঃ জাফরী পুলিশ অফিসারদ্বয় সহ নিজ গাড়িতে উঠে বসলেন।
মিঃ আহম্মদ চললেন নিজ গাড়ির দিকে।
*
ক্রমে রাত বেড়ে আসছে তবু মনিরার ফিরে আসার কথা নেই। মরিয়ম বেগম ঘরবার করছেন। বার বার রেলিং এর পাশে ফিরে এসে পথের দিকে তাকাচ্ছেন, কোথায় গেলো– এতোক্ষণেও ফিরে আসছেনা কেনো। টেবিলে খাবার ঢাকা রয়েছে, নিশ্চয়ই এক্ষুণি আসবে বলেই কোথাও গিয়েছে।
কৃষ্ণপক্ষের চাঁদ ঢলে পড়লো পশ্চিম আকাশে। সুপ্তির কোলে ঢলে পড়েছে সমস্ত পৃথিবীটা।
মরিয়ম বেগম অস্থির চিত্ত নিয়ে কখনও বিছানায় শুচ্ছেন, কখনও গিয়ে দাঁড়াচ্ছেন রেলিং এর পাশে। কখনও আবার ফিরে এসে চেয়ারে বসছেন। মনের দুশ্চিন্তা পরিস্ফুট হয়ে উঠেছে তার সারা মুখে।
এ বাড়ির জন্য চিন্তা করবার আর কে আছে একমাত্র তিনি ছাড়া। স্বামীর জীবিত অবস্থায় যা কিছু ঘটতো বা হতো বেশির ভাগ ভাবতে হতো চৌধুরী সাহেবকে। আর আজ সবকিছু দুশ্চিন্তা দুর্ভাবনা, যতি ঝড়ঝঞ্ঝা বয়ে যাচ্ছে তারই মাথার উপর দিয়ে।
চৌধুরী সাহেবের মৃত্যুর পর থেকে আজ পর্যন্ত কত না দুর্ঘটনা ঘটে গেছে, নীরবে হজম করেছে মরিয়ম বেগম। বুকের ভিতরটা যেন তার পোড়া কয়লার মত কালো হয়ে গিয়েছিলো। কত আর সহ্য হয়, সবেরই তো একটা সীমা আছে। চৌধুরী সাহেবের অপমৃত্যু তার পাঁজরের হাড়গুলো যেন গুড়ো করে দিয়ে গিয়েছিলো। নিষ্ঠুর নিয়তির পরিহাস তাকে শুধু একবার নয় বার বার নিষ্পেষিত করে চলেছিলো।
মরিয়ম বেগম দুশ্চিন্তায় অস্থির হয়ে পড়লেন।
বিছানায় শুয়ে কিছুতেই শান্তি পাচ্ছিলেন না, কোথায় গেলো মেয়েটা। সত্যিই যদি মনির না হয়ে অন্য কোন লোক ওকে ছলনা বা চালাকী করে ভুলিয়ে নিয়ে গিয়ে থাকে–কি সর্বনাশ হবে তাহলে।
কি ভুলই না তিনি আজ করেছিলেন, বাসায় থাকলে অমন হতোনা মনিরাকে–
মরিয়ম বেগমের চিন্তায় বাধা পড়লো।
নীচে গাড়ি বারেন্দায় শোনা গেলো গাড়ি থামার শব্দ।
মরিয়ম বেগমের কানে শব্দটা পৌঁছতেই একটা অনাবিল শান্তির ধারা তার সমস্ত মনের আকাশে প্রলেপ দিয়ে গেলো। তিনি শয্যা ত্যাগ করে উঠে পড়লেন দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে নীচে গেলেন।
নকীব সিঁড়ি ঘরের বারেন্দায় নাক ডেকে ঘুমাচ্ছিলো, মরিয়ম বেগম তাকে জাগিয়ে দিয়ে বললেন–দেখতো নকীব, কে এলো?
চোখ রগড়ে উঠে বসলো নকীব, মনিব গৃহিনীকে এতো রাতে নিচে দেখে অবাক হয়ে বললো–আম্মা সাহেবা যে?
দেখতো কে যেন এলো? গাড়ির শব্দ পেলাম।
নকীব দরজা খুলে দিতেই কক্ষে প্রবেশ করলো মনিরা সম্মুখে মরিয়ম বেগমকে দেখতে পেয়েই ছুটে এসে জড়িয়ে ধরলো তাঁর গলা সঙ্গে সঙ্গে আকুলভাবে কেঁদে উঠলো–মামীমা!
মরিয়ম বেগম স্তব্দ হয়ে গেলেন, হঠাৎ কিছু বুঝে উঠতে পারছিলেন না। তিনি মনিরার পিছনে দরজার দিকে লক্ষ্য করছিলেন, কে সেই রাজকুমার যার সঙ্গে মনিরা গিয়েছিলো। মরিয়ম বেগম ভেবেছেন, মনিরা যার সংগে গিয়েছে আবার তার সংগেই ফিরে এসেছে। তাই বার বার তাকাচ্ছিলেন তিনি দরজার দিকে। একটা দারুণ উকুন্ঠা জাগছিলো তার মনের মধ্যে।
মনিরা উচ্ছ্বসিতভাবে কেঁদে চলেছে। এতক্ষণ যে জমাট বেদনা তার বুকের মধ্যে চাপ ধরে উঠেছিলো, এতক্ষণে তা যেন ঝরে পড়তে লাগলো অঝোরে।
মরিয়ম বেগম কিছু বলতে যাবেন সেই মুহূর্তে কক্ষে প্রবেশ করলেন মিঃ জাফরী ও দুইজন পুলিশ অফিসার।
মরিয়ম বেগম পুলিশ অফিসারদ্বয়কে দেখে তাড়াতাড়ি মাথায় কাপড়টা টেনে ঠিক হয়ে দাঁড়ালেন।
মিঃ জাফরী ও পুলিশ অফিসারদ্বয় মরিয়ম বেগমকে আদাব জানালেন।
মিঃ জাফরী বললেন–মিসেস চৌধুরী, আমাকে হয়তো চিনতে পেরেছেন, আমি পুলিশ ইন্সপেক্টার মিঃ জাফরী, আর এরা আমার সহকারী পুলিশ অফিসার। মিসেস মনিরাকে পৌঁছে দেবার জন্যই আমরা এতো রাতে এখানে এসেছি।
মরিয়ম বেগম কৃতজ্ঞতা পূর্ণ দৃষ্টি নিয়ে একবার তাকালেন মিঃ জাফরী ও পুলিশ অফিসারদ্বয়ের মুখের দিকে। তিনি মনে করলেন মনিরাকে কোন দুষ্ট লোক ধরে নিয়ে গিয়েছিলো বা ফুসলিয়ে নিয়ে গিয়েছিলো, এরা উদ্ধার করে নিয়ে এলেন।
পুলিশ অফিসারদ্বয় মনিরার গাড়িকে অনুসরণ করেই এখানে এসেছেন। যদিও মনিরা রাগ করে নিজেই গাড়িখানা ড্রাইভ করে বাড়ীর পথে অগ্রসর হয়েছিলো, তবুও পুলিশ অফিসারগণ তাকে একা ছেড়ে দেবার ভরসা পাননি। পিছনে পিছনে তাদের গাড়িখানা মনিরার গাড়িখানাকে ফলো করেছিলো।
মিঃ জাফরী ও পুলিশ অফিসারদ্বয়কে বসার জন্য অনুরোধ জানালেন মরিয়ম বেগম। বললেন তিনি–আপনারা বসুন।
মরিয়ম বেগম এখনও জানেন না পুলিশ অফিসারগণ আজ এই মুহূর্তে তার হৃদয়ের ধনকে বন্দী করে কারাগারে নিক্ষেপ করেছে। জানলে হয়তো তিনি এমন সচ্ছমনে তাদেরকে সমাদর জানাতে পারতেন না।
হাজার হলেও মা, গর্ভধারিনী জননী, পুত্র যতই দুষ্ট অশান্ত হোক, কোন মাই তার অমঙ্গল কামনা করতে পারে না। মরিয়ম বেগম সময় সময় তার সন্তান মনিরের উপর খুব রাগ করতেন কিন্তু পারতেন না তাকে অন্তর থেকে কোন অভিশাপ করতে।
মিঃ জাফরী বুঝতে পারলেন, মিসেস চৌধুরী এখনও কিছু বুঝতে পারেন নি! কাজেই তিনি বললেন–মিসেস চৌধুরী, আমরা আপনার অনুরোধ রক্ষা করতে পারছি নে, কারণ এক্ষুণি আমাদের চলে যেতে হবে। একটু থেমে বললেন–আমাদের ক্ষমা করবেন, আজ আমরা আপনার পুত্র দস্যু বনহুরকে গ্রেফতার করেছি।
