মনিরার মনের চঞ্চলতা লক্ষ্য করে বললো বনহুর–অমন করে কি দেখছো মনিরা?
না, কই কিছু না তো?
তোমাকে যেন বড়ড় অন্যমনস্ক লাগছে!
না না, কিন্তু…
থামলে কেনো, বলো, বলো মনিরা কি বলতে চাইছিলে?
বলবো, বলবো তোমাকে?
বলো মনিরা, বলো?
না না, ও কথা বলতে মানা আছে, বলতে মানা আছে।
বলতে মানা? অবাক কণ্ঠে বললো বনহুর।
মনিরা বললো–চল ফিরে যাই।
কেননা এলে, কেননাই বা ফিরে যেতে চাচ্ছো–কি হয়েছে তোমার?
চলো ফিরে যাই…
বলো কেননা এলে এখানে?
বনহুরের কথা শেষ হয়না, মুহূর্তে অসংখ্য পুলিশ বাহিনী উদ্যত রাইফেল হস্তে ঘিরে ধরে বনহুরকে।
মিঃ আহম্মদ ও মিঃ জাফরী গুলীভরা পিস্তল চেপে ধরলেন বনহুরের বুকে। নিমিষে এ কাজ করলেন মিঃ আহম্মদ, মিঃ জাফরী ও তার পুলিশ বাহিনী।
বনহুর দেখলো–আচমকা যাদুর মত অসংখ্য সশস্ত্র পুলিশ ফোর্স তার চারিপাশে ঘিরে দাঁড়িয়েছে।
মিঃ আহম্মদ দাঁতে দাঁত পিষে বললেন–দস্যু, হাত উঠাও।
বনহুর ধীরে ধীরে হাত তুলে দাঁড়ালো।
মনিরা কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের মত হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। যেদিকে তাকাচ্ছে অসংখ্য পুলিশ আর উদ্যত রাইফেল ছাড়া কিছুই নজরে পড়ছেনা। মনিরার কণ্ঠ শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে, নিজের চোখকে সে বিশ্বাস করতে পারছেনা। একটি কথাও তার মুখ দিয়ে বের হলোনা।
মিঃ আহম্মদ রিভলভার বনহুরের বুকে চেপে ধরে মিঃ জাফরীকে বললেন–ওর পকেট থেকে রিভলভার বের করে নিন।
মিঃ জাফরী পকেট থেকে রিভলভারটা বের করে নিলেন।
মিঃ আহম্মদ এবার বনহুরের হাতে হাতকড়া পরিয়ে দিলেন।
মনিরা স্বামীর এই অবস্থা দেখে দু’হাতে মুখ ঢেকে কেঁদে উঠলো। এতোক্ষণে সে বুঝতে পারলো-নূরের সন্ধানে এসে স্বামীকে সে হারালো। কোন পুলিশের গুপ্তচর তার স্বামীকে বন্দী করবার জন্যই এই ফন্দি এটেছেলো এবং সাধক সেজে গিয়েছিলো তার কাছে, বলতে মানা করেছিলো সব কথা…মনিরার মনে সব কথাগুলি যেন হুড়োহুড়ি করে ভীড় পাকাতে লাগলো।
মিঃ আহম্মদ বললেন–মিসেস মনিরা আপনি আপনার স্বামীকে আমাদের হাতে তুলে দিয়ে যে উপকার করলেন তার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
বনহুর তাকালো মনিরার দিকে।
মনিরা স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো, অপরাধীর মত মাথা নত করে নিলো। সে। কত বড় অপরাধ সে করেছে এবার মর্মে মর্মে অনুভব করলো। দুঃখ, বেদনা, ক্ষোভে মুষড়ে পড়লো মনিরা, নিজের শরীরের মাংস নিজেই চিবিয়ে খেতে ইচ্ছে করছিলো তার।
বনহুরের মুখমন্ডল কঠিন হয়ে উঠেছে, মনিরাই কি আজ তাকে পুলিশের হাতে তুলে দিলো। তাকে এ ভাবে মিথ্যা ছলনায় ভুলিয়ে নাহার মঞ্জিলে নিয়ে আসার পিছনে কি এই অভিসন্ধি ছিলো মনিরার? গতকাল রাতে মনিরার কথাগুলো স্মরণ হতে লাগলো বনহুরের। নাহার মঞ্জিলে আসা তার সেকি উন্মাদনা, সেকি আগ্রহ। বনহুরের মনে সন্দেহের ছোঁয়া গম্ভীর হয়ে এলো। একটি কথা বনহুর বললোনা–বলতে পারলোনা।
মনিরার মুখ দিয়েও কোন কথা সরলো না।
অসংখ্য পুলিশ ফোর্স বনহুরের চারিপাশে রাইফেল উদ্যত করে তাকে নিয়ে চললো।
নাহার মঞ্জিলের পিছনে একটা ঝোপের আড়ালে পুলিশ ভ্যানগুলি অপেক্ষা করছিলো। বনহুরকে এই ভ্যানে তুলে নেওয়া হলো।
মনিরার মনের অবস্থা তখন অবর্ণনীয়। বনহুরকে যখন পুলিশ ভ্যানে তুলে নেওয়া হলো, উচ্ছ্বসিতভাবে কেঁদে উঠলো মনিরা–ছুটে গেল পুলিশ ভ্যানের পাশে।
লৌহ শিকল দিয়ে বনহুরকে তখন পুলিশ ভ্যানের সঙ্গে বেঁধে ফেলা হয়েছে। হাতে হাতকড়া। বুকে পিঠে এবং দেহের চারপাশে উদ্যত পিস্তল আর রাইফেল।
বনহুর ফিরে তাকালো ক্রন্দনরত মনিরার দিকে।
মনিরা কেঁদে বললো–আমাকেও নিয়ে যাও তোমার সঙ্গে।
বনহুর কিছু বলতে যাচ্ছিলো ঠিক সেই মুহূর্তে গাড়ি ছেড়ে দিলো।
মনিরা চিৎকার করে উঠলো–আমি কি করবো, কোথায় যাবো, বলে গেলেনা। ওগো, আমি কোথায় যাবো–
মনিরার কণ্ঠস্বর আর শুনতে পেলোনা বনহুর।
পুলিশ ভ্যানগুলি এক সংগে ছুটতে লাগলো।
মাঝখানের গাড়িতে বনহুর, সামনে আর পিছনে পরপর প্রায় সাতখানা ভ্যান স্পীডে ছুটে চললো।
মিঃ আহম্মদ ও মিঃ জাফরী তখনও মনিরার পাশে দাঁড়িয়ে আরও দু’জন পুলিশ অফিসার রয়েছে সেখানে।
মিঃ আহম্মদ বললেন–মিসেস মনিরা, ক্ষমা করবেন, সেদিনের সাধক অন্য কেহ নয় আমি। আমি পুলিশ ইন্সপেক্টার মিঃ আহম্মদ। একটু থেমে বললেন তিনি–আমাদের কার্য সিদ্ধ হয়েছে, এবার আপনাকে যথোচিত সম্মানের সঙ্গে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হবে। মিঃ জাফরীকে লক্ষ্য করে বললেন মিঃ আহম্মদ মিঃ জাফরী আপনি একে এর বাড়িতে পৌঁছে দিন, আমি পুলিশ ভ্যানগুলির সংগেই চললাম।
মিঃ জাফরী বললেন–আচ্ছা, আপনি পুলিশ ভ্যানগুলির সংগেই যান। কারণ, শয়তান দস্যু–
মনিরা তীব্র কণ্ঠে বলে উঠলো “খবরদার! শয়তান বলবেন না। দস্যু হলেও সে শয়তান। নয়।
মিঃ জাফরী হেসে বললেন–ভুল হয়েছে, আসুন আপনাকে পৌঁছে দিয়ে আসি।
মনিরা দৃঢ়কণ্ঠে বললো–আমি কারো সাহায্য চাইনে ইন্সপেক্টার। আমার গাড়ি আছে–
এই–এতো রাতে একা একা যাবেন? বললেন মিঃ আহম্মদ।
মনিরা বললো–দস্যুপত্নী এতো সহজে ভয়পাবার নয়। কথা শেষ করে মনিরা নিজের গাড়িখানা যেদিকে দাঁড়িয়েছিলো। সেই দিকে অগ্রসর হলো।
মিঃ আহম্মদ বললেন–মিঃ জাফরী, ও নিজে গেলেও আপনি মিঃ হারুন ও মিঃ করিমকে নিয়ে আপনার গাড়িতে যান। মেয়ে মানুষ–একা ছেড়ে দেওয়া ঠিক হবে না।
