বলছি, ও কথা বলবোনা। তুমি শুনতে চেওনা এখন।
তবে কখন বলবে?
নাহার মঞ্জিলে পৌঁছে.ঐ দেখো চাঁদ উঠেছে। মনিরা আংগুলি দিয়ে দেখিয়ে দেয় পূর্ব। আকাশটা।
বনহুর একবার তাকিয়ে দেখে নেয়, শালবনের শাখার ফাঁকে কৃষ্ণপক্ষের চাঁদ উঁকি ঝুঁকি মারছে। বললো বনহুর–ভালই হলো নাহার মঞ্জিল কৃষ্ণপক্ষের চাঁদের আলোয় ঝলমল করে উঠবে। মনিরা, নাহার মঞ্জিল দেখতে তোমার কোন কষ্ট হবেনা।
হাঁ, চাঁদটা আমাদের আলোর কাজ করবে।
মনিরা!
বলো?
তুমি খেয়ে আসতে বলেছিলে কিন্তু না খেয়ে ভুল করেছি–বড্ড ক্ষুধা পেয়েছে।
সত্যি আমার খুব খারাপ লাগছে। কত রাতে ফিরবো তবেই খাবে।
না, ফিরতে তেমন বিলম্ব হবে না মনিরা। ফিরেই আমরা দুজন একসঙ্গে খাবো তখন।
এবার গাড়িখানা বেশ উঁচুনীচু পথ বেয়ে এগুতে লাগলো। ঝোপঝাড় আর আগাছা ভরা। পথের দু’পাশ। মাঝে মাঝে শিয়াল আর ফেউ আর ডাক শোনা যাচ্ছে।
মনিরা স্বামীর গা ঘেষে বসলো।
হেসে বললো বনহুর–ভয় পাচ্ছো?
না।
মনিরা মুখে না বললেও অন্তরে অন্তরে কেমন যেন একটা ভীত ভাব মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে লাগলো। যদিও স্বামী পাশে থাকতে তার কোন ভয় নেই, তবুও নারী মন একটুতেই চমকে উঠে।
মনিরার গলার স্বর লক্ষ্য করে হেসে বললো বনহুর–ভয় তো পাচ্ছেনা কিন্তু নাহার মঞ্জিলে। গিয়ে ভয় পেলে চলবে না কিন্তু?
মনিরা শুনেছিলো–এখানে নাহারের কবর আছে, নবাব জামরুদ এই কবরের পাশে একদিন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলো। কথাগুলো মনে হওয়ায় মনিরার মনের সাহস সব উবে গেলো। কর্পূরের মত। আগে তো এমন করে ভেবে দেখেনি, ভেবেছিলো নাহার মঞ্জিলে এমন কি আছে! কিন্তু এখন এসব কথা স্বরণ হতেই দুরু দুরু করে বুকটা কেঁপে উঠলো। বিশেষ করে রাতের বেলায় এটা কি ভাল হলো। কিন্তু তখনই ভেসে উঠলো হৃদয়ের ধন নূরের মুখখানা, সঙ্গে সঙ্গে সাধক বাবাজীর ভবিষ্যৎ বাণী…নাহার মঞ্জিল মে তুমহারা বেটা মিল জায়েগা। নাহার মঞ্জিল যে…মুহূর্তে মনিরার মনের ভয়-ভাবনা দূর হয়ে যায়।
বলে মনিরা–তোমার অর্ধাঙ্গিনী হয়ে ভয় পাবো নাহার মঞ্জিলে গিয়ে, কি যে বলো!
মনিরার সাহসভরা কণ্ঠস্বর শুনে বনহুর আনন্দিত হলো।
আরও কিছুটা চলার পর বনহুর বললো–ঐ যে দেখা যাচ্ছে নাহার মঞ্জিল।
মনিরার বুকটা হঠাৎ যেন ধক করে উঠলো। বুকের মধ্যে কেমন যেন ঢিপ ঢিপ করছে। সম্মুখে তাকিয়ে অবাক হলো মনিরা, কৃষ্ণপক্ষের চাঁদের আলোতে দেখলো মস্তবড় একটা পাথরের মত কোন জিনিষ, মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। খুব স্পষ্ট না দেখা গেলেও বেশ বুঝা যাচ্ছে– ওটা পাহাড় নয়, একটা ভগ্ন বাড়ির ধ্বংসাবশেষ। সুউচ্চ বাড়িটার সিঁড়ির ধাপগুলি ক্রমান্বয়ে নেমে এসেছে নিচে।
চাঁদের আলোতে নাহার মঞ্জিল ধূসর বর্ণের মনে হচ্ছিলো।
বনহুরের গাড়ি গিয়ে থামলো নাহার মঞ্জিলের পাদমূলে সিঁড়ির ধাপগুলির নিচে।
গাড়ি রেখে নেমে দাঁড়ালো বনহুর, মনিরাকে লক্ষ্য করে বললো–এসো। হাত বাড়িয়ে দিলো বনহুর মনিরার দিকে।
মনিরা স্বামীর হাতের উপর হাত রেখে নেমে দাঁড়ালো।
উভয়ে উভয়ের মুখে তাকিয়ে একবার হাসলো।
গাড়ি রেখে বনহুর আর মনিরা সিঁড়ি বেড়ে উঠতে লাগলে উপরের দিকে।
সিঁড়ির ধাপগুলো যেমন লম্বা তেমনি প্রশস্ত। স্থানে স্থানে ভেঙে ধসে গেছে, ঝোপঝাড় আর আগাছা জন্মেছে সেই ধসে পড়া স্থানে।
বনহুর মনিরার হাত ধরে এগিয়ে চলেছে।
চাঁদের আলোতে নাহার মঞ্জিল স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, ওদের চলতে কোন কষ্ট হচ্ছেনা।
দিনের আলোতে যে স্থানে মানুষ প্রবেশ করতে ভয় পায়, সেই স্থানে বনহুর হাসিমুখে এগুতে লাগলো, এতটুকু ভয় বা দুশ্চিন্তা তার মনে রেখাপাত করলোনা বা করেনি।
দুঃসাহসী দস্যু বনহুর স্ত্রীর হাত ধরে নাহার মঞ্জিলের সিঁড়ির ধাপগুলি অতিক্রম করে চলেছে।
যতই এগুচ্ছে ওরা ততই মনিরার বুকের মধ্যে তোলপাড় শুরু হয়েছে। বড় অস্বস্তি বোধ করছে সে–এতোক্ষণ নূরের চিন্তায় মনটা তার আচ্ছন্ন ছিলো, কিন্তু এই মুহূর্তে সব যেন ভুলে গেল মনিরা। বনহুরের হাতের মধ্যে মনিরার হাতখানা ঘেমে উঠতে লাগলো।
বনহুর বললো–কি হলো তোমার মনিরা?
না কিছুনা।
বনহুর বুঝতে পারলো, মনিরার গলা কাঁপছে।
অভয় দিয়ে বললো বনহুর–ভয় পাচ্ছো?
না।
বনহুর আর মনিরা এসে সিঁড়ির উপর ধাপে দাঁড়ালো। কিছুক্ষণ নীরবে তাকিয়ে রইলো নাহার মঞ্জিলের দিকে। একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে বনহুর বললো–মনিরা, এখানে এলেই আমি শুনতে পাই একটা অতৃপ্ত হৃদয়ে করুণ হাহাকার।
মনিরা অবাক হয়ে স্বামীর মুখে তাকিয়ে বললো–কার?
নবাব জামরুদীর। বেচারা জামরুদীর বাসনা পূর্ণ হয়নি।
মনিরা বললো–তুমি পুরুষ, তাই নবাব জামরুদীর হৃদয়ের হাহাকার শুনতে পাও, আর যে। শত শত নারীর ইজ্জৎ রক্ষার্থে জীবন দিলো, সেই নাহারের কথা মনে হয় না তোমার?
শত শত নারীর ইজ্জৎ সে রক্ষা করেছে সত্য কিন্তু সে নিজের স্বামীকে ধোকা দিয়ে অপরাধী হয়েছে। জানো মনিরা, নাহার বিয়ে করেছিলো জামরুদীকে, কিন্তু…
থাক আর শুনতে চাইনে। বললো মনিরা।
বললো বনহুর-চলো ভিতরে যাই।
ভিতরে যাবোনা।
কেনো?
মন আমার কেমন করছে?
ও কিছু না, চলো। মনিরার হাত ধরে নাহার মঞ্জিলে প্রবেশ করলো বনহুর।
মনিরা চারিদিকে ব্যাকুল দৃষ্টি মেলে তাকাতে লাগলো, কোথায় তার নূর। সাধক বাবাজী বলেছিলেন, নাহার মঞ্জিলে তার নূরকে পাবে, কিন্তু কোথায় নূর?
