ওদের-কাদের?
ওই যে আপামনি আর কে একজন রাজকুমার না কে…
রাজকুমার?
হাঁ, লোকটা আপামনিকে নিয়ে পালাতে যাচ্ছিলো, আমি তাই ওদের দু’জনকে আটকে রেখেছি ঘরের মধ্যে…
নকীবের কথায় মরিয়ম বেগমের দু’চোখ কপালে উঠে, মুখখানা গম্ভীর বিবর্ণ হয়ে উঠে, বলেন তিনি-দরজা আটকে বসে আছিস কি হতভাগা বাবা। দরজা খোল, দরজা খোল দেখি।
নকীব দরজা খুলে দিলো।
কিন্তু একি! ঘরের মধ্যে ফাঁকা, লোক কোথায়?
মরিয়ম বেগম কক্ষমধ্যে প্রবেশ করে অবাক হলেন।
পিছনে নকীব, তার চোখেমুখে রাজ্যের বিস্ময়। যে কারণে সে দরজা বন্ধ করে পাহারা দিচ্ছিলো, তবু রাজকুমার তার আপামনিকে নিয়ে পালিয়েছে।
মরিয়ম বেগম নকীবের দিকে তাকাতেই হাউ মাউ করে কেঁদে উঠলো–আম্মা সাহেব, আমি প্রথমেই সন্দেহ করেছিলাম, রাজকুমার না কে একটা লোক এসে বললো, বাড়িতে কেউ আছে?
তুই কি বললি? প্রশ্ন করলেন মরিয়ম বেগম।
নকীব কাঁদতে কাঁদতে জবাব দিলো–আমি বললাম–আম্মা নেই সরকার সাহেব নেই…
মরিয়ম বেগম রেগে উঠলেন–মাথা আর মুন্ড, ও সব না বললে কি চলতোনা?
আমি কি অতশত জানি যে, লোকটা কুমতলব নিয়ে এসেছে!
তারপর কি বলেছিলি তুই?
বলেছিলাম, কেউ নেই, শুধু আপামনি আছে।
ঐ তো সর্বনাশ করেছিলি।
আমার ভুল হয়ে গেছে আম্মা সাহেব! লোকটা বললো, আমি রাজকুমার, তোমার আপামনির সঙ্গেই দেখা করতে চাই।
আর তুই মনিরাকে ডেকে নিয়ে গেলি বুঝি?
না, আমি এসে আপামনিকে সব বললাম, আপামনি তো কথাটা শুনে রেগে আগুন কোথাকার কে রাজকুমার, আমি কেনো যাবো তার সংগে দেখো করতে। আমি গিয়ে আপামনির কথাটা তাকে বললাম।
মরিয়ম বেগম অবাক হয়ে শুনছিলেন নকীবের কথাগুলো আর মনে মনে ভাবছিলেন, কেননা তিনি আজ বাইরে গেলেন। বাসায় থাকলে এমন তো হতো না। নকীবের কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনেছিলেন তিনি।
নকীব বলে চলেছে–রাজকুমার আমার কথা শুনে মুচকি হাসলো। একটা চিঠি লিখে আমার হাতে দিয়ে বললো, তোমার আপামনিকে দাও গে।
তারপর? অবাক কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন মরিয়ম বেগম।
আপামনিকে চিঠিটা এনে দিলাম, ছোট্ট একটু চিঠি। আপামনি চিঠিটা পড়ে বললেন-বলগে আসছি। জানেন আম্মা, আপামনি তক্ষুণি নিচে নেমে এলো রাজকুমারের কাছে। আমিও তার পিছনে পিছনে এলাম–কেউ তো আর নেই, তাই। আপামনি রাজকুমারকে দেখেই খুশিতে ডগমগ হলো।
নকীবের কথায় মরিয়ম বেগমের মুখ অনেকটা প্রসন্ন হয়ে এসেছে, বললেন–তারপর?
তারপর আপামনি আমাকে বললেন–ইনি আমাদের আত্মীয় হন, একে উপরে নিয়ে আয়। আপামনির কথা শুনে রাজকুমার খুশি হলো, আপামনির সংগে চলে এলো উপরে।
তাই নাকি?
হাঁ। বলে মাথা নত করলো নকীব, গলার স্বর নিচু করে বললো–আপামনি রাজকুমারের সংগে খুব হাসাহাসি–চুপ করে গেলো নকীব।
মরিয়ম বেগম বুঝতে পারলেন রাজকুমারটা কে। মনির ছাড়া কেউ নয় টের পেয়ে গেলেন তিনি। হেসে বললেন–রাজকুমার মনিরাকে নিয়েই ভেগেছে।
হাঁ আম্মা, সাহেবা। নকীব মরিয়ম বেগমের মুখে হাসির আভাষ দেখে বিস্মিত হলো। অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে সে মনিব গৃহিণীর দিকে।
মরিয়ম বেগম বললেন–চিন্তার কোন কারণ নেই নকীব, রাজকুমার আমাদের আত্মীয়ই হয়!
কিন্তু…
ওরা তোকে অবাক করার জন্য পিছন জানালা দিয়ে কোথাও বেড়াতে গেছে, এই এলো। বলে।
এতোক্ষণে নকীবের মন থেকে যেন পাষাণ ভার নেমে যায়। আশ্বস্ত নয় নকীব।
মরিয়ম বেগম এগিয়ে গিয়ে টেবিল থেকে খাবারের ঢাকনা তুলে দেখলেন, একি! খাবারগুলি যেমনকার তেমনি আছে তো। তবে নিকটে কোথাও গেছে ওরা–এখনই ফিরে আসবে।
মরিয়ম বেগম টেবিলের খাবারগুলি আবার সুন্দর করে চাপা দিয়ে রাখলেন।
*
জনহীন পথ বেয়ে বনহুর আর মনিরার গাড়িখানা স্পীডে ছুটে চলেছে। ড্রাইভ করছে স্বয়ং বনহুর। পাশে বসে আছে মনিরা।
এসব পথে ইলেকট্রিক আলো না থাকলেও লণ্ঠনযুক্ত লাইট পোষ্ট ছিলো। আলো তেমন তীব্র না হলেও পথ পরিস্কার দেখা যাচ্ছিলো। গাড়ি চালাতে কোন কষ্ট হচ্ছিলোনা বনহুরের।
পথের দুই ধারে ঘন শালবৃক্ষগুলি নিস্তব্ধ প্রহরীর মত দাঁড়িয়ে আছে সোজা হয়ে। আকাশে অসংখ্য তারার মালা ফুটে উঠেছে। বাতাস বইছে সা সা করে।
বনহুরের ঠোঁটের ফাঁকে সিগারেটের আগুনটা জ্বল জ্বল করে জ্বলছে। মনিরা তাকিয়ে দেখছে মাঝে মাঝে স্বামীর মুখখানা। অস্পস্ট হলেও বড় সুন্দর লাগছে ওকে। মনিরার হদয়ে একটা অভূতপূর্ব আনন্দ নাড়া দিয়ে যাচ্ছে। তার মত স্বামীভাগ্য এ পৃথিবীতে বুঝি আর কারো হয়নি। কে বলে মনিরা অসুখী–কে বলে সে দুঃখী।
মনিরার মনে কত কথা উঁকি দিয়ে যাচ্ছে, একটির পর একটি করে। আজ কেনো যেন বার বার স্বামীর মুখখানাই দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে মনিরার, কেনো যেন মনে হচ্ছে একটু স্বামীর কোলে মাথা রেখে শুতে পারতো! একটু যদি হাতখানা রাখতো তার হাতের উপরে…একি! আজ এমন লাগছে কেননা। এতো কাছে রয়েছে স্বামী, তবু কেমন যেন ফাঁকা লাগছে, কেমন যেন দুরু দুরু করছে বুকের ভিতরটা। তবে কি নূরের জন্য এমন লাগছে তার!
উদাস ভাবে মনিরা তাকিয়ে আছে গাড়ির সম্মুখের দিকে।
বনহুর মনিরার মৌনভাব লক্ষ্য করে বললো–কি ভাবছো মনিরা?
স্বামীর কথায় সম্বিৎ ফিরে পায় মনিরা, বলে–আর কতদূর সেই নাহার মঞ্জিল?
এই তো প্রায় এসে গেছি। কিন্তু মনিরা, আমি বুঝতে পারছিনে এই নাহার মঞ্জিলে আসবার তোমার এতো সখ হলো কেনো?
