সরকার সাহেব হঠাৎ মরিয়ম বেগমের মুখে বেড়াতে যাবার কথা শুনে আজ অবাক না হয়ে পারলেন না। কারণ তিনি কোনদিন দেখেন নাই নিজ মনে বেগম সাহেবা কোথাও বেড়াতে যেতে চেয়েছেন।
সরকার সাহেব বিস্মিত হলেও মুখে কোন কথা বললেন না। তিনি চলে গেলেন ড্রাইভারকে গাড়ি বের করার আদেশ দিতে।
মরিয়ম বেগম চলে গেলেন খালেদার বাড়ি বেড়াতে।
ঠিক তার পরমুহূর্তেই কক্ষে প্রবেশ করলো নকীব।
মনিরা বললো–কি খবর নকীব?
আপামনি, কে একজন রাজকুমার আপনার সাক্ষাৎ চায়।
রাজকুমার!
হাঁ খুব সুন্দর দেখতে, গায়ে রাজার মত চকচকে কাপড়। আমি বললাম, বাড়িতে কেউ নেই–আম্মাও নেই, সরকার সাহেবও নেই। তবু বললেন রাজকুমার–তোমার আপামনিও নেই?
আপামনি! আমার কথা জানলো সে কি করে? তুই বুঝি বলেছিস?
না, আমি কোন কথাই বলিনি, সত্যি করে বলছি।
কিন্তু আমি কি করে যাবো? যা গিয়ে বল আজ দেখা হবেনা।
নকীব চলে গেলো, কিন্তু একটু পরে ফিরে এসে বললো নকীব–আপামনি, রাজকুমার এই চিঠিটা দিলো, বললো তোমাকে দিতে।
অসময়ে এ ধরনের বিরক্তি ভালো লাগলো না মনিরার। কে এই রাজকুমার-এতো বড় সাহস, তার সঙ্গে দেখা করতে চায়। নকীবের হাত থেকে চিঠিখানা নিয়ে মেলে ধরে চোখের সামনে। সঙ্গে সঙ্গে মনিরার চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। চিঠিতে লেখা আছে–
এসেছি, চলে এসো।
‘বনহুর’।
বললো মনিরা–আচ্ছা, গিয়ে বল্ আমি আসছি!
নকীব মনে করলো, আপামনির পরিচিত কেউ হবে, তাই সে বিলম্ব না করে চলে গেলো নীচে।
বনহুর আজ নতুন ড্রেসে সজ্জিত হয়ে এসেছে। শরীরে তার রাজকীয় পোশাক। চোখে। চশমা, নকল গোফ শোভা পাচ্ছে নাকের নিচে। মাথায় একটা নতুন ধরনের ক্যাপ। ইলেকট্রিক আলোতে বনহুরের পোশাকগুলি ঝক ঝক করছে।
মনিরা এসে দাঁড়ালো বনহুরের সম্মুখে।
প্রথমে একটু হকচকিয়ে গেলেও সঙ্গে সঙ্গে চিনতে পারলো স্বামীকে। খুশিতে দীপ্ত হয়ে উঠলো মনিরার মুখমন্ডল।
উভয়ে তাকিয়ে আছে উভয়ের দিকে।
নকীব অবাক হয়ে গেলো আপামনি, আপনি ওনাকে আপনি–হাঁ, আমি ওকে চিনি। আমাদের আত্মীয়। চলুন, উপরে চলুন। নকীবকে শোনাবার জন্যই স্বামীকে আপনি বলে সম্বোধন করলো মনিরা।
বনহুর আর মনিরা উপরে এসে বসলো।
মনিরা বললো–আজ এ ভাবে না এলে কি তোমার চলতোনা?
সন্ধ্যারাতে আসা কি সহজ আমার পক্ষে? বিলম্ব করোনা মনিরা, বহুদূর যেতে হবে।
তোমার জন্য কিছু খাবার তৈরি করে রেখেছি।
হাতঘড়ির দিকে তাকালো বনহুর বললো–ফিরে এসে খাবো।
একটুও মুখে দেবেনা?
না, চলো গাড়ি নিচে অপেক্ষা করছে।
মনিরা যখন রাজকুমারকে ঘরে নিয়ে এলো, তখন নকীবের মনে কেমন যেন একটু সন্দেহ জেগেছিলো। বিশেষ করে বেগম সাহেবা বাসায় নাই, এমতঅবস্থায় একটা অজানা লোককে– একেবারে আপামনির ঘরে…না, এ ঠিক একটা অভিসন্ধি নিয়ে এসেছে। নকীব কান পেতে সব শুনতে লাগলো।
বনহুর যখন মনিরাকে বলছিলো, চলো গাড়ি অপেক্ষা করছে, তখন নকীবের রাগে মুখ। কালো হয়ে উঠলো। নিশ্চয়ই কোন দুষ্ট লোক তার আপামনিকে ফুসলিয়ে নিয়ে যাবার জন্য এসেছে। দরজার পাশে পথরোধ করে দাঁড়িয়ে রইলো নকীব। কিছুতেই আজ আপামনিকে ওর সঙ্গে বাইরে যেতে দেবেনা–কিছুতেই না। রাজকুমার আর যেই হোক, নকীব খুব শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।
মনিরার হাসির শব্দ ভেসে আসছে কক্ষমধ্য হতে, বলছে মনিরা–কতদূর সেই নাহার মঞ্জিল?
অনেক দূর, সেখানে পৌঁছতে রাত অনেক হবে।
তাহলে কখন ফিরে এসে খাবে?
যখন আসি, তখন খাবো।
একটু খাও।
না মনিরা, এখন কিছু খাবোনা। ফিরে এসে ক্ষুধা পাবে, তখন দু’জন মিলে খাবো।
চলো।
বনহুর আর মনিরা দরজায় এসে অবাক! দরজা বাইরে থেকে বন্ধ।
নকীব দরজা বন্ধ করে দিয়েছে বাইরে থেকে, যেতে দেবেনা সে আপামনিকে রাজকুমারের সঙ্গে।
মনিরা যখন দরজা ধরে টানাটানি করছে তখন নকীব বললো–আমি তোমাকে যেতে দেবোনা আপামনি। কিছুতেই না।
মনিরা অবাক হলো, বললো–সে কি!
হাঁ, আম্মা ফিরে না আসা অবধি তোমাদের আমি কিছুতেই বেরুতে দেবো না।
কেনো? কক্ষমধ্য হতে বললো মনিরা।
দরজার ওপাশ থেকে জবাব দিলো নকীব–তুমি রাজকুমারের সঙ্গে কোথায় যাবে?
হাসলো মনিরা–যেখানে খুশি।
তা হবেনা। বললো নকীব।
মনিরা আর বনহুর নকীবের কথায় মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে হাসলো। বললো মনিরা–নকীব সব গোলমাল করে ফেললো।
বনহুর বললো–চলো, ওদিকের জানালা দিয়ে পালাই।
কিন্তু আমি?
তোমাকে আমি পার করে নিচ্ছি।
ওরে বাবা, ওদিকে তাকালেই অমনি অজ্ঞান হয়ে যাবো।
এলো…মনিরার হাত ধরে বনহুর পিছন শার্শী দিয়ে বেরিয়ে কার্নিশের উপর এসে দাঁড়ালো।
অতি সাবধানে, কৌশলে মনিরাকে নিয়ে বনহুর এক সময় নেমে এলো গাড়ির পাশে।
ওদিকে নকীব দরজায় শিকল আটকে বসে রইলো দরজার পাশে।
বেশ কিছু সময় পর ফিরে এলেন মরিয়ম বেগম আর সরকার সাহেব।
নকীব তখন দরজায় ঠেস দিয়ে বসে বসে ঝিমুচ্ছে।
মরিয়ম বেগম এসে নকীবকে এভাবে দরজায় ঠেস দিয়ে বসে থাকতে দেখে অবাক হলেন, ব্যাপার কি বুঝতে না পেরে বললেন–একি! নকীব তুই এখানে? আমি তোকে খুঁজে মরছি!
মরিয়ম বেগমের কথায় ধড়মড় করে উঠে দাঁড়ালো নকীব, আমতা আমতা করে বললো– আপনি এসেছেন বেগম সাহেবা?
হাঁ, মনিরা কোথায়?
ঘরে।
তা এখানে দরজায় অমন করে বসে আছিস কেনো?
ঢোক গিলে বললো নকীব–ওদের ঘরে আটকে রেখেছি।
