আজ সেই নাহার মঞ্জিল দস্যু বনহুরকে বন্দী করবার ফাঁদ হিসাবে কাজে লাগাচ্ছেন মিঃ আহম্মদ।
নাহার মঞ্জিলের প্রতিটি গোপনকক্ষে লুকিয়ে আছে শত শত পুলিশ ফোর্স। রাইফেল, পিস্তল, বন্দুক, নানা রকম অস্ত্রে সজ্জিত পুলিশ বাহিনী।
মিঃ আহম্মদ মিঃ জাফরীকে সব দেখালেন।
মিঃ জাফরী অবাক হয়ে দেখলেন–নাহার মঞ্জিলের অভ্যন্তরে কি দুর্গম, কি ভয়ঙ্করভাবে ফাঁদ পেতেছেন মিঃ আহম্মদ। মিঃ জাফরী তাঁকে আন্তরিক ধন্যবাদ না জানিয়ে পারলেন না।
মিঃ আহম্মদ বললেন–বাইরে থেকে কেউ বুঝতে পারবে না, এই নাহার মঞ্জিলে কোন প্রাণী আছে।
হাঁ, আপনার কথা ঠিক। বাইরে থেকে সম্পূর্ণ একটি পোড়া বাড়ি বলে মনে হচ্ছে। কোন জনমানব এদিকে পা দিয়েছে বলে মনে হয় না। অদ্ভুত আপনার বুদ্ধি-কৌশল মিঃ আহম্মদ। কিন্তু সুচতুর দস্যু কোন রকমে না টের পেয়ে থাকে।
না, সে কিছুতেই টের পাবে না। এবার আমি তাকে ফাঁদে ফেলবোই। মিঃ জাফরী, আজ রাতে দস্যু বনহুর এ বাড়িতে আসবেই।
তাহলে…
তাহলে আজ আমাদেরও এখানে, এই নাহার মঞ্জিলে থাকতে হবে। মিঃ জাফরী, আপনি রিভলভার নিয়ে প্রস্তুত হয়ে এসেছেন নিশ্চয়ই?
হাঁ, আমি প্রস্তুত হয়ে এসেছি।
মিঃ আহম্মদ ও মিঃ জাফরী এবার নাহার মঞ্জিলের একটি চোরা কক্ষে আশ্রয় নিলেন।
যে কক্ষে মিঃ আহম্মদ ও মিঃ জাফরী লুকিয়ে রইলেন সেই কক্ষের পাশেই মস্ত বড় হলঘর। এই হলঘরের মেঝেতেই রয়েছে নাহারের কবর।
যে নারী একদিন শত শত নারীকে উদ্ধারের জন্য নিজের জীবন বিনষ্ট করেছিলো, নিজকে উৎসর্গ করে দিয়েছিলো মৃত্যুর কোলে সেই নাহারের কবরের অদূরে লুকিয়ে রইলেন দু’জন পুলিশ। ইন্সপেক্টার। উভয়েরই হস্তে গুলীভরা রিভলভার।
মিঃ আহম্মদের বাম প্যান্টের পকেটে রয়েছে হুইসেল। এই হুইসেলের এক ফুঙ্কারে সমস্ত পুলিশ বাহিনী চারদিক থেকে বেরিয়ে আসবে, ঘেরাও করে ফেলবে নাহারের কবরস্থান।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। নাহার মঞ্জিলের চারিপাশে ঘনীভূত হয়ে আসছে রাতের অন্ধকারে।
*
বিপুল আকাঙ্খা নিয়ে মনিরা প্রতীক্ষা করছে স্বামীর। মনিরার হৃদয়ে আজ এক অদ্ভুত অনুভূতি। একটা কেমন যেন উম্মাদনা তার সমস্ত অন্তরটাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। গোটা দিনটাই আজ মনিরার কেটেছে অস্থিরতার মধ্যে।
মরিয়ম বেগম মনিরার এ চঞ্চলতা লক্ষ্য করেছিলেন, তিনি এক বার বলেও ছিলেন–মনিরা, আজ ঐ দুষ্টটা আসবে বুঝি?
মৃদু হেসে বলেছিলো মনিরা–হয়তো আসতে পারে।
মামীমাকে আর কিছু বলবার সময় না দিয়ে নিজের ঘরে চলে গিয়েছিলো মনিরা, পাছে আর কোন প্রশ্ন করে বসেন তিনি।
নাহার মঞ্জিলের কথা কাউকে বলতে মানা করেছেন সাধক বাবাজী। স্বামীকে না বললে নয়, তাই বলেছে মাত্র সে। তবু মনিরা সে কথা বলে নি, বলতে নিষেধ আছে সেকথা।
কিন্তু দিনটা হেন কাটতে চাইছে না। রোজ কোথা দিয়ে কোথায় সময় কেটে যায়, আর আজ সন্ধ্যা হবে কখন।
মনিরা আজ অনেক কিছু নিজ হস্তে রান্না করেছে।
মরিয়ম বেগম লুকিয়ে লুকিয়ে সব লক্ষ্য করলেও সামনে আসেননি। স্বামীর কথায় কে না লজ্জা পায়। সে তো এখানে থাকে না; আসে বহুদিন পর লজ্জা কাটবে কি করে।
মনিরাকে এ সব করবার সুযোগ দিয়ে সরে থাকেন মরিয়ম বেগম।
অফুরন্ত আনন্দ আর খুশিখুশি ভাব নিয়ে মনিরা এ সব তৈরি করলো আজ।
নানা রকমের খাবার নিজের ঘরে টেবিলে সাজিয়ে রেখে, নিজে খুব করে সেজে নিলো শুধু স্বামীই আসবে না, আজ ফিরে পাবে সে তার নরকে।
মনিরা অফুরন্ত উম্মাদনা নিয়ে ঘরবার করছে। কখনও রেলিং এর ধরে, কখনও মুক্ত জানালায়, কখনও বা বাগানের পাশে গিয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগলো সে। না জানি কখন কোন মুহূর্তে আসবে তার আকাঙ্খার জন।
আজ নিজের হাতে মনিরা ঘর সাজিয়েছে।
বনহুরের ছোটবেলার ফটোখানায় নতুন মালা পরিয়ে বার বার দেখছে। কেননা যে ঐ ছোট্ট মুখখানা আজ মনিরাকে বার বার আকর্ষণ করছে।
স্বামীর ছোট বেলার ছবির পাশেই নিজের ছোট মুখখানা বড় মিষ্টি লাগছে আজ। পাশাপাশি দুটি মুখ যে মুখ দুটি কোনদিন পৃথক হবার নয়।
নির্বাক নয়নে তাকিয়ে আছে মনিরা ছবিটার দিকে।
মরিয়ম বেগম হঠাৎ কক্ষে প্রবেশ করে থমকে দাঁড়ালেন; হেসে বললেন–মনিরা!
চমকে ফিরে তাকালো মনিরা–মামীমা আমায় ডাকছে?
হাঁ, আমি একটু খালেদাদের বাড়ি যাচ্ছি, কিছু পরেই ফিরে আসবো। সরকার সাহেব আমার সঙ্গে যাবেন।
মনিরা বুঝতে পারলো, তাকে সুযোগ দিয়ে সরে পড়তে চান মামীমা। কারণ, ও এলে অসুবিধা বোধ করতে পারে। মায়ের উপস্থিতিতে তারা অবাধে মিশতে পারবেনা ভেবেই তিনি বোন খালেদার বাড়ি বেড়াতে যাচ্ছেন।
মনিরা একটু হেসে বললেন–দেরী করোনা যেন।
না দেরী করবো না–যাবো আর আসবো। মনিরার মুখের দিকে তাকিয়ে একটু হেসে বেরিয়ে যান মরিয়ম বেগম।
মনিরা যা ভেবেছিলেন তাই সত্যি মরিয়ম বেগম বুঝতে পেরেছিলেন, আজ সকাল সকাল মনিরা আসবে। হয়তো কোন অন্যরূপ নিয়েই সে আসবে। কাজেই মায়ের সামনে অতোটা কিছু। পারবে না, হয়তো নিজকে প্রকাশ করতে লজ্জা বোধ করবে।
কোনদিন সন্ধ্যা রাতে সে আসেনি। কোনদিন মনিরা স্বামীকে পায়নি এসময়ে কাছে। আহা। বেচারী মনিরা ওর কি সখ হয়না স্বামীকে খাওয়াবার বা পাশে বসে দুটো ভালমন্দ কথাবার্তা বলবার।
মরিয়ম বেগম সরকার সাহেবকে বললেন–ড্রাইভারকে বলুন গাড়ি বের করতে, খালেদাদের বাড়ি যাবো।
