কথা বলতে বলতে আনমনা হয়ে যায় সাধক বাবাজী। সুপক্ক কেশ গুফে ঢাকা মুখখানা অসম্ভব বিষাদময় হয়ে উঠেছিলো সেদিন তার।
কিন্তু নাহারের চোখ দুটো কেমন যেন উজ্জ্বল মনে হয়েছিলো, অস্ফুট কণ্ঠে বলেছিলো নাহার–বাবা, আমি এই জামরুদীকে সায়েস্তা করবো।
শিউরে উঠে বলেছিলো সাধক বাবাজী–সে পাপাচারের সম্মুখ থেকে তোকে সরিয়ে রেখেছি অতি কষ্টে, অতি সাবধানে আর তুই তাকে শায়েস্তা করবি-বলিস কি মা!
দীপ্ত কণ্ঠে বলেছিলো নাহার–হাঁ, আমি ওকে সায়েস্তা করবো। বাবা, তুমি আমাকে অনুমতি দাও।
সাধক বাবাজী শেষ পর্যন্ত কন্যা নাহারকে অনুমতি না দিয়ে পারেননি।
আশ্চর্য এই নাহার। নারী হয়ে নারীর অবমাননা সে কিছুতেই সহ্য করতে পারলোনা। পিতার অনুমতি নিয়ে একদিন নাহার জামরুদীর সম্মুখে গিয়ে দাঁড়ালো। সেদিন সে অপূর্ব বেশভূষায় সজ্জিত হয়েছিলো।
নাহার ছিলো অদ্ভুত সুন্দরী। তারপর এই মনোহারী পোশাক পরিচ্ছদে তাকে খুবই সুন্দর লাগছিলো। স্বর্গের অপ্সরীর চেয়ে কোন অংশে কম ছিলোনা সে।
জামরুদী নাহারের রূপে তন্ময় হয়ে গেলো। নিজের চোখ দুটিকে সে বিশ্বাস করতে পারলোনা, তার সম্মুখে দন্ডায়মান নারীমূর্তি মানবী, না দেবী বুঝতে পারলোনা সে।
জামরুদী তখন তার বাগানবাড়িতে পায়চারী করছিলো।
সেই সময় নাহার গোপনে বাগানে প্রবেশ করে জামরুদীর সম্মুখে এসে দাঁড়ালো।
বিস্ময় বিস্ফারিত নয়নে জামরুদী দেখলো নাহারকে।
নাহারের ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির রেখা। চোখে ইংগিতপূর্ণ ভাবময়ী চাহনী। জামরুদীর হৃদপিন্ড বিদ্ধ করলো সে দৃষ্টিশক্তি।
জামরুদী যেন সম্বিত হারিয়ে ফেললো, বললো–কে তুমি?
নাহার এসেছে নিজের জীবন বিসর্জন দিয়ে শত শত নারীর ইজ্জত রক্ষার্থে। সেও ভুলে গেলো গোটা পৃথিবীটাকে, নাহারের চোখের সম্মুখে ভাসছে অগণিত মা-বোনদের করুণ মুখচ্ছবি। তাদের হৃদয়বিদারক মর্মস্পর্শী আর্তনাদ শুনতে পাচ্ছে সে কানে। নাহার বললো–আমি তোমার প্রেয়সী নাহার।
নাহারের সুমধুর কণ্ঠস্বরে মোহগ্রস্তের মত জামরুদী অস্ফুট ধ্বনি করে উঠলো–তুমি আমার প্রেয়সী?
হাঁ…বললো নাহার!
জামরুদী জ্ঞানশূন্যের মত দুই হাত বাড়িয়ে ধরতে গেলে নাহারকে। চোখেমুখে তার কুৎসিৎ লালসাপূর্ণ ভাব!
জামরুদী ধরতে গেলে কয়েক পা পিছিয়ে গেলো নাহার। বললো সেনা না, তুমি আমাকে ধরোনা। শোন।
জামরুদী থমকে দাঁড়ালো, মুহূর্ত বিলম্ব যেন তার সইছেনা। নাহারকে কাছে পাবার জন্য উম্মাদ হয়ে উঠলো সে।
বললো নাহার–আমার তিনটি বাসনা পূর্ণ করলে তবেই তুমি আমাকে পাবে।
বলো, কি তোমার বাসনা? বললো জামরুদী।
নাহার বললো–প্রথম হলো–সাতক্ষীরা পাহাড়ের ধারে মস্ত বড় একটি বাড়ি তৈরি করতে হবে–নাম নাহার মঞ্জিল। দ্বিতীয়–তুমি কোন নারী দেহকে স্পর্শ করতে পারবেনা। তৃতীয় হলো–তুমি আমায় বিয়ে করবে।
জামরুদী তখন নাহারের রূপে এতো তন্ময় হয়ে পড়েছে যে, দুনিয়া তার কাছে সামান্য তুচ্ছ বলে মনে হচ্ছে। নাহারই এখন যেন তার কাছে সব। সব ছাড়তে সে বাধ্য হবে যদি নাহারকে পায়।
জামরুদী শেষ পর্যন্ত নাহারের বাসনা পূর্ণ করেছিলো! কান্দাই শহরের অনতিদূরে সাতক্ষীরা পাহাড়ের পাদমূলে গড়ে দিয়েছিলো সে নাহার মঞ্জিল। আর কোন দিন জামরুদী ভুল করেও কোন নারীদেহ স্পর্শ করেনি। নাহারের জন্য লস্পট জামরুদী সাধু বনে গিয়েছিলো। শেষ পর্যন্ত নাহার জামরুদীকে বিয়ে করেছিলো কিন্তু জামরুদীর বাসরকক্ষে সে প্রবেশ করেনি–আত্মহত্যা করে সে ফাঁকি দিয়ে পালিয়েছিলো।
জামরুদীকে ফাঁকি দিয়ে নাহার পরপারে চলে গেলেও জামরুদী আর কোনদিন ভুলতে পারেনি নাহারকে। নাহারও এটা বুঝতে পেরেছিলো জামরুদী তাকে এতো ভালবেসে ফেলেছে। যার জন্য সে তার সব ঐশ্বর্য নিঃশেষ করে তৈরি করেছিলো নাহার মঞ্জিল। সব সে ত্যাগ করেছে নাহারের জন্য। নাহার জানতো, যে তার জন্য সব ত্যাগ করতে পারলো, এমন কি সমস্ত ঐশ্বর্য যে নিঃশেষ করেছিলো সে কোনদিন তাকে ভুলতে পারে না। নিশ্চয়ই জামরুদী তার শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়বে, তখন সে সাধু বা সন্ন্যাসী হয়ে যাবে। লম্পট হতে আর পারবে না, পারবে
সে আর কোন কুকর্ম করতে। কারণ, নাহারকে পাবার জন্য জামরুদী তার যথাসর্বস্ব দিয়ে গিয়েছিলো নাহার মঞ্জিল।
নাহার যখন জামরুদীকে ফাঁকি দিয়ে চলে গেলো তখন জামরুদী নিঃসম্বল পথের ভিখারীর চেয়েও অসহায়। বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, এমন কি দাসদাসী কেউ ছিলোনা তখন তার সম্বল একমাত্র নাহার মঞ্জিল জামরুদীর আশ্রয় স্থান।
জামরুদী নাহার মঞ্জিলে কবর দিলো নাহারকে।
তারপর বহুদিন জামরুদীকে কেউ দেখেনি। হঠাৎ একদিন ভোরে লোকজন দেখলো নাহারের কবরের পাশে পড়ে আছে এক জটাজুটধারী পাগলের মৃত দেহ।
সবাই দেখলো, এ মৃতদেহ অন্য কারো নয়–নবাব জামরুদীর।
একদিন যে জামরুদীর প্রচন্ড দাপটে নগরবাসী থরথর করে কাঁপতো, কান্দাই এর নারীগণ যে জামরুদীর কবল থেকে রক্ষা পাবার জন্য আতঙ্কগ্রস্ত থাকতো, সেই জামরুদীর শেষ পরিণতি দেখে অনেকেরই চোখে অশ্রু এসেছিলো।
জামরুদীর হৃদয়ের বিন্দু বিন্দু রক্ত দিয়ে গড়া নাহার মঞ্জিল আজ ভুতুড়ে বাড়ি। ভুলেও কোন। মানুষ সেদিকে পা বাড়ায়না। কান্দাই এর লোক নাহার মঞ্জিলের নামে শিউরে উঠে।
