বিরাট বিরাট অশ্বথ বৃক্ষে আর বট বৃক্ষে ছেয়ে গেছে আজ সেকালের নাহার মঞ্জিল। কোথাও বা ছাদ ধসে পড়েছে, কোথাও বা দেয়াল ভেঙে পড়েছে। কোথাও ঠিক পূর্বের ন্যায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে দেয়ালগুলো।
এ বাড়িটার মধ্যে কেউ প্রবেশ করলেই বাইরে বেরিয়ে আসা অত্যন্ত কঠিন। কোথায় পথ বা দরজা বোঝা যায় না।
নাহার মঞ্জিলের অর্ধেকটা আজ মাটির নিচে চলে গেছে। তবু যতটুকু জেগে রয়েছে মাটির বুকে, তাই মনে হয় যেন একটা পাহাড়। হার মঞ্জিল একটা দেখবার মত জিনিষ ছিলো এক কালে।
আজ সেই নাহার মঞ্জিল একটা ভূতুড়ে বাড়ি বা পোড়া-বাড়িতে পরিণত হয়েছে। ভুলেও কোন পথিক এ পথে পা বাড়ায় না। যদিও এখনও এখানে দেখবার মত অনেক কিছুই বিদ্যমান রয়েছে, তবু একটা অজানা ভয় সদা-সর্বদা বিরাজ করছে এই বাড়িতে প্রবেশ করলে আর বাইরে বেরিয়ে আসতে পারে না। সেই কারণেই জনগণ এই মঞ্জিলটার নাম শুনলে আতঙ্কে শিউরে উঠে। ভুলেও কোনদিন এ বাড়ি দেখবার জন্য ওদিকে যায় না, বা সখ করে না।
নাহার মঞ্জিলের বিরাট এক কাহিনী আছে। যে কাহিনী এখন কান্দাই এর লোকের কাছে রূপকথার মতই মনে হয়। নবাব জামরুদী ছিলেন সেকালের একজন রাজা-মহারাজার মত প্রতাপশালী জমিদার। কান্দাই শহরের বুকে ছিলো তার প্রবল আধিপত্য। যেমন রাগী তেমনী খেয়ালী মানুষ ছিলেন তিনি। জীবনে কোন নারীকে জামরুদী বিয়ে করেননি। কিন্তু তার বিশ্রামাগারে নারীর কোন অভাব ছিলোনা। জামরুদী সপ্তাহে এক দিন নগর ভ্রমণে বের হতেন। সঙ্গে থাকতো দুইজন সহচর আর অসংখ্য দেহরক্ষী। শহরের যে কোন মেয়ে তার নজরে পড়তো, তাকে তার চাই।
জামরুদীর ইংগিত পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার দেহরক্ষীর দল সেই অসহায় নারীকে জোরপূর্বক ধরে নিয়ে যেতো। এমনি ছিলো জামরুদীর খেয়াল।
জামরুদীর অত্যাচারে নগরবাসী সদা আতঙ্কে কাল কাটাতো। কিন্তু রক্ষক যদি ভক্ষক হয়। তাকে কে কি বলতে পারে! কাজেই সবাই নীরবে অশ্রু ফেলতো কিন্তু মুখে কোন কথা বলতে। পারতোনা।
দেশের নারীগণের এই চরম অবস্থা লক্ষ্য করে এক সাধক কন্যা–নাম তার নাহার, শপথ গ্রহণ করলো–যেমন করে হোক জামরুদীর কবল থেকে এই নারীকুলকে রক্ষা করবে সে।
নাহার ছিলো সাধক সুলতান আলীর কন্যা। অপূর্ব রূপসী ছিলো সে। নাহারকে জীবনে কোন পুরুষ দেখে নাই বা তার সঙ্গে কথা বলেনি! নাহারের কণ্ঠস্বর ছিলো মধুর। চোখ দুটি ছিলো অদ্ভুত মায়াময়।
এই নাহারের প্রাণ কেঁদে উঠলো শত শত মা-বোনদের জন্য। গভীরভাবে চিন্তা করতে লাগলো–কেমন করে রক্ষা করা যায় এই অবলা নারীগণকে। আজ পর্যন্ত কত শত নারীর জীবন বিনষ্ট হয়েছে–আরও হবে, তার ইয়ত্তা নেই।
নাহার একদিন সাধক সুলতান আলীর কাছে মনের কথা ব্যক্ত করলো বাবা, কি করে দেশের নারীগণকে শয়তান নবাব জামরুদীর কবল থেকে রক্ষা করা যায়?
কন্যার কথায় সুলতান আলীর যেন ধ্যান ভঙ্গ হলো। তাই তো! তিনি দিবারাত্রে খোদার ইবাদত নিয়ে মশগুল থাকেন কিন্তু দেশের নবাব দিনের পর দিন কি অন্যায় অবিচার করে যাচ্ছেন সেদিকে খেয়াল করেন না। কন্যার কথায় তার চক্ষু খুলে যায়। তিনি বলেন–মা, তুমি ঠিক বলেছো। হাঁ, এ চিন্তা এখনও আমি করিনি। সত্যি আমি ভুল করেছি মা। কিন্তু কি উপায় আছে। জামরুদীর কবল থেকে দেশের নারীগণকে রক্ষা করার?
বাবা, কোন কি উপায় নেই?
না মা বড় পিশাচ্ এই নবাব। কোন বাধাই তাকে দমন করতে পারবে বলে মনে হয় না। রক্ষক হয়ে যদি সে ভক্ষক হয়, কি করা যায় বল?
বাবা, আমি ওকে দমন করবো। দীপ্ত কণ্ঠে বলে নাহার।
সঙ্গে সঙ্গে সাধক বাবাজীর মুখ বিবর্ণ ফ্যাকাসে হয়, বললেন–মা, এ তুই কি বলছিস? আজ আঠারো বছর ধরে তোকে আমি লুকিয়ে রেখেছি? শুধু তোরই জন্য আমি আজ সন্ন্যাসী হয়ে বনে বনে লুকিয়ে রয়েছি। শুধু তোরই জন্য…ঐ ঐ লম্পট জামরুদীর জন্য…
বাবা!
হাঁ মা, আজ আমি সন্ন্যাসী হয়েছি শুধু তোর কারণে। জানতাম, দেশে থাকলে তোকে আমি জামরুদীর হাত থেকে রক্ষা করতে পারবোনা।
বাবা, বাবা তুমি আমার জন্য…
হাঁ, নাহার শুধু তোর জন্য আজ আমি দেশত্যাগী সন্ন্যাসী। বন আজ আমার আশ্রয় স্থান। বনের ফল আমার খাদ্য। মাটি আমার বিছানা…সব, সব তোর জন্যই আমি বেছে নিয়েছি। নাহার, তোর মাকেও ঐ জামরুদী ধরে নিয়ে গিয়েছিলো, তুই তখন দুই বছরের শিশু।
বাবা!
মা, আমি তখন জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েছিলাম, স্ত্রী গেলো তাও সহ্য করলাম কিন্তু ভবিষ্যতের একটা ভয়ঙ্কর রূপ ভেসে বেড়াতে লাগলো আমার চোখের সম্মুখে। তোর ভবিষ্যত ভেবে আমি তোকে বুকে করে পালিয়ে গেলাম রাতের অন্ধকারে। কিন্তু হাঁ তোর মাকে জামরুদী ধরে নিয়ে গিয়েছিলো সত্য, কিন্তু তাকে জামরুদী পায়নি। ঘোড়ার পিঠ থেকে নদীর বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে অতলে তলিয়ে গিয়েছিলো, আর সে ভেসে উঠেনি।
বাবা, এ কথা তুমি কেমন করে জানলে? আমার মা জামরুদীর কবল থেকে রক্ষা পেয়েছিলো?
আমার এক পরম আত্নীয় পিছু নিয়েছিলো–উদ্দেশ্য ছিলো তোর মাকে রক্ষা করতে পারে কি না। সেও আর একটি ঘোড়ার পিছু নিয়েছিলো, কিন্তু তোর মা নদীবক্ষে নিমজ্জিত হবার পর সে আর এগোয় নি। গাছের আড়াল থেকে সব লক্ষ্য করছিলো–ফিরে এসে সে শপথ করে বলেছিলো তোর মায়ের এই শেষ পরিণতির কথা। বাষ্পরুদ্ধ হয়ে এলো সাধক বাবাজীর কণ্ঠ। চোখ মুছে আবার বললেন–এক সপ্তাহ পর একটা লাশ পাওয়া গিয়েছিলো নদীবক্ষে। ভীড় ঠেলে আমিও গিয়েছিলাম সেদিন ঐ লাশটা দেখতে, তোকে কোলে করে। হাঁ, আর কেউ না চিনতে পারলেও আমি চিনতে পেরেছিলাম তাকে। এক সঙ্গে বিশ বছর ধরে ঘর করেছিলাম আর তাকে চিনবোনা। যদিও তোর মার দেহ পঁচে গলে যাবার মত হয়েছিলো–তবু চিনেছিলাম।
