বনহুর এগুতেই নুরী ছুটে এলো খুশিতে উচ্ছল তার চোখমুখ। বনহুরের দক্ষিণ হাতখানা চেপে ধরে বললো–কোথায় ছিলে আজ রাতে। কত কাজ আমার, ঠিক আছে বলো?
কাল রাতে সবাই তো আস্তানায় ছিলো, শুধু ছিলেনা তুমি।
বনহুর এগিয়ে চললো।
নূরী পিছন পিছন চলতে চলতে বললো–আমার কথার জবাব দিচ্ছেনা কেনো হুর?
চলতে চলতে বললো বনহুর–বললাম তো কাজ ছিলো!
রহমানকেও তো কিছু বলে যাওনি হুর?
না, আমার বিশেষ কোন কাজ ছিলো।
কথা বলতে বলতে বনহুর আর নূরী বনহুরের বিশ্রাম কক্ষে এসে পৌঁছলো।
বনহুর ড্রেস খুলতে খুলতে বললো–এখনও কৈফিয়ৎ নূরী? একটু থেমে বললো আবার তোমার মনিকে নিয়ে এখনতো বেশ আছো? তবুও আমাকে,
হাঁ, তবুও তোমাকে আমি কোথায়ও যেতে দেবো না হুর।
এখনও তুমি পূর্বের ন্যায় ছেলেমানুষী করবে?
ছেলেমানুষী নয় হুর, আমি চাইনা তুমি আমাকে না বলে কোথাও যাও। বলো আর যাবেনা। কোথাও? নূরী বনহুরের জামার আস্তিন চেপে ধরে।
হেসে বলে বনহুর–আচ্ছা তাই হবে।
সত্যি কথা দিচ্ছো তো?
বনহুর নূরীর গালে আংগুল দিয়ে মৃদু আঘাত করে বলে– হাঁ সত্যি।
বনহুরের জামার বোতাম খুলে দিতে দিতে হাসে নূরী।
বনহুর বলে–তোমার মনি কোথায়?
নূরী বলে–ঘুমাচ্ছে।
আর তুমি এত ভোরে জেগে উঠেছে, তোমার মনিকে ছেড়েই?
এমন সময় নূরীর সহচরী জেরিনা এসে দাঁড়ায়! বনহুরকে কুর্ণিশ জানিয়ে বলে সে–সর্দার, নূরী গোটা রাত ঘুমায়নি।
বনহুর অবাক হয়ে তাকালো নূরীর মুখের দিকে, তারপর ফিরে চাইলো জেরিনার মুখে, বললো–কেনো?
জেরিনা কিছু বলতে যাচ্ছিলো, ধমক দিলো নূরী–তুই চলে যা জেরিনা, এখান থেকে।
জেরিনা একবার সর্দার ও নূরীর মুখে তাকিয়ে মুখ টিপে হেসে বেরিয়ে গেলো।
জেরিনা বেরিয়ে যেতেই বললো বনহুর–নুরী, আমি আজ জানতে চাই, তুমি কেননা ঘুমাওনি।
মাথা নত করলো নূরী।
বনহুর বাম হস্তে নূরীর চিবুক ধরে উঁচু করে তুলে বললো–সব বুঝতে পেরেছি। কিন্তু নূরী, তোমাকে তো মনিকে এনে দিয়েছি তবু কেনো তুমি–গম্ভীর হয়ে পড়লো বনহুর।
নূরী বললো–মনিকে দিয়ে তুমি কি সরে পড়তে চাও? হাঁ, আমি লক্ষ্য করেছি, যেদিন থেকে তুমি আমার কোলে মনিকে এনে দিয়েছো তারপর থেকে সব সময় আমাকে তুমি এড়িয়ে চলো।
বনহুর হঠাৎ যেন বিপদে পড়ে গেলো, যতই সে নূরী থেকে দূরে থাকতে চায়, ততই নূরী যেন তাকে অক্টোপাসের মত আকড়ে ধরতে যায়। কিন্তু শুধু কি নূরীই তাকে ভালবাসে, না এর পিছনে তার মনেরও প্রবল আকর্ষণ আছে। বনহুর শয্যায় এসে বসে পড়ে গভীরভাবে চিন্তা করে। নূরীই শুধু তাকে আকর্ষণ করে না, তারও অপরাধ আছে।
বনহুর নূরীর কাছে নিজকে দুর্বল মনে করে, বলে সে–নূরী, তোমাকে না বলে আমি কোথাও যাবোনা।
নূরী খুশি হয়, বনহুরের পাশে বসে ওর চুলে আংগুল বুলিয়ে দেয়। নূরীর কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ে বনহুর। নূরী অপলক নয়নে তাকিয়ে থাকে বনহুরের মুখের দিকে। ভোরের সূর্য তখন পূর্ব আকাশে অনেক উপরে উঠে গেছে।
*
অর্ধদগ্ধ সিগারেটটা এ্যাসট্রেতে নিক্ষেপ করে আর একটি সিগারেটে অগ্নি সংযোগ করে বললেন আহম্মদ সাহেব–নাহার মঞ্জিল। দস্যু বনহুরকে বন্দী করবার বিরাট একটা ফাঁদ এখানে পাতা হয়েছে। শত শত সশস্ত্র পুলিশ ফোর্স এই নাহার মঞ্জিলের গোপন স্থানে লুকিয়ে রয়েছে। এবার যত বুদ্ধিমানই সে হোক, কিছুতেই এ ফাঁদ থেকে উদ্ধার পাবে না।
মিঃ জাফরীর চোখমুখে ক্রুদ্ধভাব ঝরে পড়ছে, তিনি গম্ভীর কণ্ঠে বললেন–এবার বনহুর কিছুতেই পুলিশ বাহিনীর হাত থেকে পরিত্রাণ পাবে না। মিঃ আহম্মদ, সত্যি আপনার দক্ষ বুদ্ধি কৌশলের কাছে আমিও হেরে গেলাম।
মিঃ আহম্মদ সিগারেট থেকে এক মুখ ধোয়া সম্মুখের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বললেন–আজ চার দিন যাবত নাহার মঞ্জিল আমার পুলিশ বাহিনী দস্যু বনহুরকে গ্রেপ্তারের জন্য বিপুল আগ্রহ নিয়ে প্রতিক্ষা করছে। আমি চব্বিশ দিন যাবত ঐ নাহার মঞ্জিলে নানা কৌশলে পুলিশ বাহিনী লুকিয়ে রাখবার গোপন স্থান আবিস্কার করেছি।
আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ মিঃ আহম্মদ। বললেন মিঃ জাফরী।
মিঃ আহম্মদ বললেন–এবার অতি গোপনে এ কাজ আমি করেছি, এমন কি দুদিন পূর্বেও আপনিও জানতেন না, আমি কোথায় কি করেছি।
এবার নিশ্চয়ই আমাদের প্রচেষ্টা সার্থক হবে।
হাঁ মিঃ জাফরী, দস্যু বনহুরকে গ্রেফতার না করে এবার আমি বিশ্রাম গ্রহণ করবো না। চলুন, আজ নাহার মঞ্জিলটা একবার স্বচক্ষে দেখে আসবেন। দেখুন, অতি গোপনে ওখানে যেতে হবে। আপনি আর আমি ছাড়া কেউ জানেনা, আর জানে আমার কিছুসংখ্যক পুলিশ ফোর্স। দস্যু বনহুরকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হলে এদের আমি পুরস্কৃত করবো। শুধু পুরস্কৃতই নয়, উপাধিও লাভ করবে তারা।
আরও কিছুক্ষণ মিঃ আহম্মদ ও মিঃ জাফরীর মধ্যে গোপন আলোচনা চলার পর মিঃ আহম্মদ বললেন–এবার চলুন, নাহার মঞ্জিলটা দেখে আসবেন।
অতি গোপনে বেরিয়ে পড়লেন মিঃ আহম্মদ এবং মিঃ জাফরী।
*
কান্দাই শহরের শেষ প্রান্তে দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে নাহার মঞ্জিল অবস্থিত। সেকালের কোন সৌখিন নবাবজাদা সখ করে নির্জন স্থানে এই মঞ্জিলটা তৈরি করেছিলেন। লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয় হয়েছিলো এই মঞ্জিল গড়ে তুলতে। প্রায় এক মাইল নিয়ে এ বাড়িটা। অসংখ্য কুঠরী আর কক্ষে ঘেরা একটি রঙমহল। রঙমহলের সে জৌলুস যদিও আজ আর নেই তবু মানবচক্ষু স্থির হয়ে যায় রঙমহলের কারুকার্য খচিত দেয়াল, দৃঢ় প্রাচীর আর গেটের দিকে তাকিয়ে।
