কান্দাই শহরের সবচেয়ে সেরা বাড়ি ছিলো এককালে এই নাহার মঞ্জিল। কিন্তু আজ সে বাড়ি পোড়াবাড়ী হয়ে গেছে।
নাহার মঞ্জিল পোড়াবাড়ী হয়ে গেলে এখন!
হাঁ, কিন্তু নাহার মঞ্জিলের পূর্বের সেই সৌন্দর্য এখনও যেন অক্ষত রয়েছে। বাড়িটা দেখবার মত একটা জিনিষ। যাবে এ বাড়ি দেখতে?
সত্যি নিয়ে যাবে আমাকে সেই নাহার মঞ্জিলে?
এটা আর এমনকি, যাবো একদিন।
না একদিন নয়, আজ রাতেই নিয়ে চলো সেই নাহার মঞ্জিলে।
অবাক করলে মনিরা। এই গভীর রাতে– তা হয় না।
তবে কথা দাও–কাল সন্ধ্যায় তুমি আসবে।
আসবো।
সত্যি বলছো?
হাঁ, সত্যি আসবো।
মনিরা ক্ষণিকের জন্য অন্যমনস্ক হয়ে পড়লো নূরের কথা মনে পড়লো তার। একটা কচি। মুখ ভেসে উঠলো তার হৃদয়ের কোণে।
বনহুর মনিরার গালে মৃদু আঘাত করে বললো কি ভাবছো আবার?
না, কিছু না।
বনহুর বললো–এসো মনিরা, আমার ঘুম পাচ্ছে।
একটু হাসলো মনিরা, বললো–দস্যুর আবার ঘুম!
মনিরা! বনহুর ধরতে গেলো মনিরাকে।
মনিরা সরে দাঁড়ালো –উঁহু।
বনহুর হাত বাড়ালো মনিরাকে ধরবার জন্য।
মনিরা আবার সরে দাঁড়ালো।
মনিরা যতই দূরে সরে যেতে লাগলো বনহুর ওকে ধরবার জন্য ততই আগ্রহশীল হয়ে উঠলো।
বনহুরকে নাজেহাল পেরেশান করাই যেন মনিরার উদ্দেশ্য। মনিরা কিছুতেই ধরা দিবেনা বনহুরকে।
এক সময় বনহুর মনিরাকে ধরতে গেলো। অমনি মনিরা সুইচ টিপে আলো নিভিয়ে দিলো, সঙ্গে সঙ্গে সরে গেলো সেখান থেকে। বনহুর অন্ধকারে মনিরাকে হাতড়ে চললো। মনিরা বিছানায় গিয়ে চুপ করে শুয়ে বালিশে মুখ চেপে হাসতে লাগলো। বনহুর সুইচ টিপতেই মনিরা হেসে উঠলো খিল খিল করে।
বনহুরের মুখে খেলে গেলো দুষ্টুমির হাসি। কোন কথা না বলে আবার আলো নিভিয়ে দিলো বনহুর। এবার সে সোজা খাটে গিয়ে ধরে ফেললো মনিরাকে।
অন্ধকারে মনিরার চাপা আনন্দভরা কণ্ঠস্বর জেগে উঠলো–এতো দুষ্টু তুমি!
*
ভোরের আজান ধ্বনি ভেসে এলো অদূরস্থ কোন মসজিদ থেকে। ঘুম ভেঙে গেলো মনিরার। দরবড় করে উঠে বসে পাশে হাতড়ে দেখলো কেউ নেই–কোথায় তার স্বামী।
শয্যা ত্যাগ করে উঠে পাশের জানালাটা খুলে দিতেই এক ঝলক আলো ছড়িয়ে পড়লো। কক্ষমধ্যে। মনিরা নির্বাক পুতুলের মত স্তব্ধ হয়ে কিছুক্ষণ শূন্য বিছানার দিকে তাকিয়ে রইলো। বুকের মধ্যে একটা ব্যথা হাহাকার করে উঠলো কি যেন ছিলো এই মুহূর্তে তা যেন নেই। একটা হাস্য-উজ্জ্বল বলিষ্ঠ মুখ ফুটে উঠলো তার চোখের সামনে।
স্বামীর স্মৃতি চিন্তা করে অনাবিল এক আনন্দ উপভোগ করলো মনিরা হৃদয়ে। আজ আবার আসবে, দেখা হবে মিলিত হবে তারা দুজনে। মনিরার মনঃকষ্ট দূর হয়ে গেলো নিমিষে। শুধু স্বামী সঙ্গই সে লাভ করবেনা, ফিরে পাবে সে তার একমাত্র সন্তান, তার নূরকে। দরবেশ বাবাজীর কথাগুলো কানের কাছে ভেসে বেড়াচ্ছে নাহার মঞ্জিল মে তোমহারা বেটা মিল যায়েগা। নাহার মঞ্জিল–নাহার মঞ্জিলে যাবে আজ তারা।
হঠাৎ চমক ভাঙে মনিরার–এখানে এভাবে দাঁড়িয়ে আছে কেনো সে! আজ কি তার দাঁড়িয়ে থাকবার সময় আছে। এই তো দিনটা চলে যাবে কোন ফাঁকে সন্ধ্যায় আসবে ও নিয়ে যাবে তাকে।
কিন্তু রোজ এমন খালি মুখে ওকে ছেড়ে দেবে কি করে। স্ত্রী হয়ে স্বামীকে সে কোনদিন পাশে বসে খাওয়াতে পারলোনা এটা কি তার কম দুঃখ। ধীরে ধীরে আনমনা হয়ে যায় মনিরা, সকাল বেলা বিছানায় স্বামী ঘুমিয়ে থাকবে, পাশে বসে গায়ে মৃদু চাপ দিয়ে ডাকবে ওগো ওঠো
–ও বলবে–উঁহু আর একটু ঘুমাতে দাও।
— বলবে মনিরা –বেলা কত হলো দেখছো?
–হতে দাও। বলে পাশ ফিরে শোবে ও।
–বলবে মনিরা চা নাস্তা সব ঠান্ডা হয়ে গেলো যে।
–লক্ষীটি বিরক্ত করোনা–সেই ফাঁকে ও টেনে নেবে তাকে নিবিড় আলিঙ্গনে। স্বামীর বুকে মাথা রেখে বলবে সে–ছিঃ ছেড়ে দাও, কেউ দেখে ফেলবে যে–
–ফেলুক, ক্ষতি নেই–বলবে ও–চমক ভাঙে মনিরার কি ভাবছে সে আবোল তাবোল, তাড়াতাড়ি বিছানাটা ঠিক করে বাথরুমে গিয়ে ঢুকে। আজ তার হৃদয়ে অফুরন্ত আনন্দ সন্ধ্যায় আসবে সে।
এখানে যখন মনিরা স্বামীর চিন্তায় মগ্ন, ওদিকে তখন বনহুর তার আস্তানার পথে ছুটে চলেছে। বনপথ মুখর হয়ে উঠেছে তাজের খুরের শব্দে। উলকা বেগে ছুটে চলেছে তাজ।
আস্তানায় পৌঁছতেই দু’জন অনুচর এসে তাজের পাশে দাঁড়ালো।
বনহুর লাফ দিয়ে নেমে পড়তেই অনুচরদ্বয় তাজের লাগাম টেনে ধরলো।
বনহুর যখন তাজের পিঠের দূর হতে আগমন করতো তখন তাজ এক নতুন উদ্যমে পথ চলতো। বনহুর নেমে পড়লেও তাজের চলার সে উন্মাদনা মিটতোনা যেন। চুপ করে দাঁড়িয়ে পড়লেও সম্মুখের পা দিয়ে মাটিতে ক্রমাগত আঘাত করতো।
যতক্ষণ না তাজকে ধরতো ততক্ষণ তাজ অস্থিরভাবে এই রকম মাটিতে আঘাত করতো।
বনহুর তাজের পিঠ থেকে নেমে আস্তানায় প্রবেশ করলো।
অনুচরদ্বয় তাজকে নিয়ে টহল দিতে দিতে চলে গেলো তাজের বিশ্রাম কক্ষে।
বনহুর আস্তানায় প্রবেশ করতেই তার পাহারারত অনুচরগণ কুর্ণিশ জানিয়ে সরে দাঁড়াতে লাগলো।
গহন বনের মধ্যে একটা বিরাট পাথর স্কুপের আড়ালে বনহুরের আস্তানায় প্রবেশের মুখ।
বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই–ঐ পাথর স্তূপের ওপাশে কি আছে।
পাথরটার গায়ে চাপ দেবার একটা যন্ত্র আছে–সেটাতে চাপ দিলেই ধীরে ধীরে পাথরটা সরে যায় এক পাশে। বেরিয়ে পড়ে একটা সুড়ঙ্গ মুখ, এটাই বনহুরের আস্তনার প্রবেশপথ।
