বৃদ্ধ হেসে বললো– বেটা হাম্ জানতা তুম্হারা কোই খায়েস নেহি। একঠো দুঃখ হ্যায়, জো তুমলোক কো হরওয়াক্ত বহুৎ পেরেশান রাখতা।
হাঁ, এবার মনে পড়েছে, আমার মনিবের বড় দুঃখ, বড় ব্যথা হয়েছে। আমাদের নূর হারিয়ে গেছে, কাজেই বাড়ীর সবাই এর জন্য দুঃখ অনুভব করছে।
বেটা, ঠিক বাত তুম বলা। নূর হ নূর চোরী হুয়া হায়। বেটা, নূর মিল জায়েগা—
আনন্দে অস্কুট ধ্বনি করে উঠে নকীবনূর মিল জায়েগা।
হাঁ বেটা হাম তসবী তেলায়েৎ করনেসে দেখ্যা–নূর মিল জায়েগা।
নকীব এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে ছুটলো সিঁড়ি বেয়ে উপরে।
মনিরা পদশব্দে নূরের জামাজুতো তাড়াতাড়ি সরিয়ে রেখে উঠে দাঁড়ালো, চোখ মুছে তাকাতেই নকীবকে দেখতে পেলো।
নকীব হাঁপাতে হাঁপাতে বললো–আপামনি, নূরকে পাওয়া গেছে। নূরকে পাওয়া গেছে–
নূরকে পাওয়া গেছে। মনিরার চোখে মুখে খুশির উচ্ছ্বাস ঝরে পড়লো কোথায়? কোথায় সে?
নকীব বললো তখন আপামনি, একটা ভিখারি এসেছে দরবেশ বলে মনে হলো, তিনি বললেন–নূরকে পাওয়া যাবে।
কোথায় সে দরবেশ নকীব?
নিচে-গেটের বাইরে।
তাকে বৈঠকখানায় নিয়ে এসো, আমি তার সঙ্গে দেখা করবো। যাও নকীব, যাও।
নকীব খুশি মনে চলে গেলো।
মনিরা তাড়াহুড়ো করে নেমে এলো নিচে। বৈঠকখানায় এসে দাঁড়াতেই নকীব এক দরবেশসহ কক্ষে প্রবেশ করলো।
মনিরা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। বৃদ্ধের চেহারার মধ্যে এক জোতির্ময় ভাব ফুটে রয়েছে। বললো মনিরা বসুন।
বৃদ্ধা মাথা নাড়লো–নেহি বেটি হাম্ বৈঠেগা–নেহি। এক বাত বোলনে আয়া। তুম বহুতহি দুঃখী হ্যায়।
হাঁ বাবাজী, আমি বহুত দুঃখী। বাষ্পরুদ্ধ হলো মনিরার কণ্ঠ।
বৃদ্ধ বললো–হ্যাম তসবী তেলায়েৎ সে দেখ্যা তোমহারা বেটা চোরী হুয়ে।
হাঁ, আমার নুর চুরি গেছে—
রোনা মাত বেটি। রোনা মাত। হাম ঐ কামছে আয়া বেটি। তোমহারা নূর মিল জায়েগা—
নূরকে পাবো? ফিরে পাবো আমার নূরকে?
হাঁ বেটি, তুম্হারা নূর মিল জায়েগা। দরবেশ বাবাজী চোখ বন্ধ করে তস্বী তেলায়েৎ করতে শুরু করলো।
তসবীটা কয়েক পাক ঘুরিয়ে নিয়ে চোখ খুলে বললো–বেটি, তোমহারা নূর বহু দূর হ্যায়।
তাহলে কি পাবোনা আমার নূরকে?
হাঁ মিল জায়েগা, আগার তোমহারা শওহরকো লেকর তুম্ যা সেতি তব মিল জায়েগা।
কোথায় যাবো বলুন বাবাজী? আমি যাবো ওকে সঙ্গে করে।
হাঁ, তোমহারা শাওহরকো ছোড় না যানা। আওর এক বাত শুনো বেটি।
বলো বাবাজী?
ও বাত তোমহারা শাওহর কেন নেনি বেলা, তব নেহি মিলেগা তোমূহরা বেটা।
না না, আমি বলবো না বলবোনা ওকে। কিন্তু কোথায় যাবো?
বেটি হিয়াসে বহু দূর নাহার মঞ্জিল নাম সে একঠো ঘর হায়, তোহারা শাওহর কো লেকর ঐ নাহার মঞ্জিল মে জায়োগি ওয়াহাঁ তোমহারা বেটা রহেগা। আভি হাম যা সেকতা?
আচ্ছা বাবাজী। মনিরা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।
দরবেশ বাবাজী ধীর মন্থর গতিতে বেরিয়ে গেলো সেখান থেকে।
কথাটা মনিরা তার মামীমাকেও বললো না। একমাত্র নকীব ছাড়া আর কেউ জানলোনা।
মনিরা সব সময় ঐ এক চিন্তা নিয়েই সারাটা দিন কাটিয়ে দিলো। দরবেশ বাবাজীর কথাগুলো এখনও যেন তার কানে মধু বর্ষণ করছে। নাহার মঞ্জিল মে তোহারা নূর মিল জায়েগা– নাহার মঞ্জিল নাহার মঞ্জিল মনিরার চোখের সম্মুখে ভাসছে অজানা অচেনা একটি বাড়ি। সেখানে নূর তার হৃদয়ের ধন রয়েছে।
মনের মধ্যে একটা অস্থিরতা নিয়ে ছটফট করতে লাগলো মনিরা কবে কখন আসবে তার স্বামী তাকে নিয়ে যাবে সে পুত্রের সন্ধানে। নাহার মঞ্জিলের কোন চোর তার সন্তানকে চুরি করে রেখেছে। দরবেশ ঠিকই বলেছে খোদার ইবাদত করা লোক সব জানতে পারে ওরা। দরবেশ যদি সত্য জানতেই না পারে তাহলে তার স্বামীকে নিয়ে যাবার ইংগিত করবে কেনো? তিনি একথাও হয়তো জানতে পেরেছেন–তার স্বামী একজন শক্তিশালী পুরুষ।
*
একদিন দু’দিন করে কয়েক দিন কেটে গেলো। মনিরার সারাটা রাত্রি কাটে অনিদ্রায় প্রতি মুহূর্ত প্রতীক্ষা করে সে স্বামীর।
সেদিন একটু তন্দ্রার মত হয়ে পড়েছে মনিরা–হঠাৎ পাশে কারো অস্তিত্ব অনুভব করে চমকে পাশ ফিরে, তাকালো, ভাগ্যিস চিৎকার করে মনিরা।
পাশ ফিরে তাকাতেই আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো মনিরার চোখ দুটো। খুশি ভরা কণ্ঠে বললো–তুমি!
বনহুর খাটে বসে পড়ে বললো–না, দস্যু বনহুর।
কি নেবে আমার?
তোমাকে!
হেসে উঠলো মনিরা খিল খিল করে।
বনহুর মনিরার চিবুক ধরে উঁচু করে বললো–আজ যে বড় খুশি খুশি লাগছে।
হাঁ, তোমাকে পাশে পেলে আমার সব দুঃখ, সব ব্যথা দূর হয়ে যায়।
সব ব্যথা ভুলে যেতে পারো? মিথ্যে কথা।
না, সত্যি করে বলছি?
ভুলতে পারো তোমার নূরকে?
হাঁ, তাই ভুলছি। তোমাকে পাশে পাবো বলে আমি নূরকে ভুলেছি।
বনহুর মনিরাকে টেনে নিলো কাছে।
স্বামীর বুকে মাথা রেখে বললো মনিরা–একটা কথা রাখবে আমার?
মনিরা, তুমি আমার সঙ্গে ‘কুন্তিবাঈ’ ছবি দেখতে চেয়েছিলে কথা দিয়েও কথা রাখতে পারনি।
এবার রাখবে বলো?
যদি রাখবার মত হয় রাখবো। বলো?
না–রাখবার মত কিছু নয়। আচ্ছা বলোতো কান্দাই শহরে নাহার মঞ্জিল কোথায়?
নাহার মঞ্জিল?
হাঁ, নাহার মঞ্জিল।
বনহুর একটু ভাবাপন্ন হয়ে পড়লো, বললো–নাহার মঞ্জিলের নাম তুমি কার কাছে শুনলে মনিরা?
শুনেছি, কিন্তু কোথায় জানিনা।
