না, কিছুতেই আমি বুঝতে পারছি না দস্যু বনহুর আমাকে কান্দাই এর কোন পথে কোন দিকে, কোথায় নিয়ে গিয়েছিলো।
আর কোথা হতে কোন পথে রেখেই বা গেলো।
মিঃ জাফরীর কথায় মিঃ আহম্মদের মুখমন্ডল গম্ভীর হয়ে উঠলো, তিনি কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললেন–এর বিহিত ব্যবস্থা না করে ছাড়ছি না।
মিঃ জাফরীর সঙ্গে গোপনে কিছু আলোচনা করতে লাগলেন তিনি।
সিগারেটের পর সিগারেট নিঃশেষ হতে লাগলো, আর চললো কথোপকথন।
দেয়াল ঘড়িটা টিক টিক শব্দে এগিয়ে চলেছে।
রাত বেড়ে আসছে ক্রমেই।
মিঃ জাফরীর বাংলোয় বসে আলাপ করছেন মিঃ আহম্মদ, মিঃ হোসেন আর স্বয়ং মিঃ জাফরী।
হঠাৎ একটা শব্দ ভেসে আসে তাঁদের কানে।
খট খট খট– খট খট খট– খট–খট—
মিঃ জাফরী, মিঃ হোসেন কান পেতে শুনতে লাগলেন। মিঃ আহম্মদ সিগারেটটা মুখ থেকে সরিয়ে নিয়ে স্তব্ধভাবে শুনতে লাগলেন, বললেন তিনি–কিসের শব্দ এটা?
মিঃ জাফরীর চোখেমুখে ক্রুদ্ধ ভাব ফুটে উঠলো, তিনি বললেন– এ শব্দ আমার অতি পরিচিত মিঃ আহম্মদ।
তখনও শব্দটা একেবারে মিশে যায়নি, দূরে সরে গেছে তবু অস্পষ্ট শোনা যাচ্ছে–খট খট খট–শব্দটা।
মিঃ জাফরী বললেন–দস্যু বনহুরের অশ্বপদ শব্দ এটা।
দস্যু বনহুরের?
হাঁ, আমি ইতিপূর্বে আরও অনেক বার শুনেছি এ শব্দ।
মিঃ আহম্মদ বললেন–হুঁ।
শব্দটা কয়েক মিনিটের মধ্যে দূর হতে দূরান্তে মিশে গেলো। কিন্তু তখনও পুলিশ ইন্সপেক্টার এর কানে বনহুরের অশ্বপদ শব্দে প্রতিধ্বনির রেশ লেগে রয়েছে যেন।
মিঃ আহম্মদ হঠাৎ হেসে উঠলেন–হাঃ হাঃ হাঃ দস্যু বনহুর যাদুকর নয় মানুষ। সেই মানুষকেই আমরা পাকড়াও করতে পারিনা।
*
স্বামীর কাছে যতই পুত্রশোক ভুলে থাকতে চেষ্টা করুক, আসলে মনিরা মুহূর্তের জন্য নূরকে ভুলতে পারেনি। মনের মধ্যে সদা সর্বদা একটা ব্যথা গুমড়ে কেঁদে ফিরছিলো তার। সব সময় মলিন মুখ-মন্ডল, চোখ ছলছল–যেন বিষাদের প্রতিচ্ছবি।
একদিকে স্বামীর চিন্তা অন্যদিকে পুত্রশোক। তবু যদি সব সময় স্বামীকে পাশে পেতো তাহলেও মনিরা ভুলতে পারতো সব ব্যথা।
স্বামীর সঙ্গ কোন নারী না কামনা করে! পৃথিবীর সব কিছু ত্যাগ করা যায় কিন্তু কোন নারী পারে কি তার স্বামীকে ত্যাগ করতে। মনিরা স্বামীর কথা স্মরণ করে ভুলতে চেষ্টা করে পুত্র নুরকে।
প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে মনিরা স্বামীর চিন্তায় মগ্ন থাকে, কিন্তু সব চিন্তা ছাপিয়ে ভেসে উঠে নূরের কথা তার হৃদয়ের কোণে তখন মনিরা অস্থির হয়ে পড়ে। নূরের মাধ্যমে সে ভুলতে চেয়েছিলো স্বামীর অভাব। ভুলতে চেয়েছিলো মনিরা জীবনের সব ব্যথা। নূরের কথা মনে হলেই সে আলমারী খুলে বের করে আনে তার জামা কাপড় আর জুতো বুকে চেপে ধরে মুখে মাথায় ঠেকায়। চোখ বন্ধ করে কচি হাতের স্পর্শ অনুভব করে। মনিরার গন্ড বেয়ে গড়িয়ে পড়ে তখন অশ্রুধারা।
সেদিন দ্বিপ্রহরে নির্জন কক্ষে নূরের জামা জুতো বের করে মনিরা নির্বাক নয়নে তাকিয়ে দেখছিলো আর নীরবে অশ্রু বিসর্জন করছিলো।
মরিয়ম বেগম পাশের ঘরে একটু ঘুমিয়েছেন।
দাসদাসীগণ তাদের বিশ্রাম স্থানে বিশ্রাম করছে। সরকার সাহেব বাইরের কোন কাজে বেরিয়ে গেছেন।
নকীব বাইরের গেটটা বন্ধ করে উঠানে প্রবেশ করতে যাচ্ছিলো এমন সময় এক বৃদ্ধ ভিখারি গলায় তসবী হাতে তসবী ঢিলা পায়জামা আর পা পর্যন্ত ঝোলানো পাঞ্জাবী গায়ে এসে দাঁড়ালো গেটের সম্মুখে।
নকীবকে দেখে বললো-বেটা, গোরা পানি দেগা?
ফিরে তাকলো নকীব–বৃদ্ধ ভিখারীর দিকে তাকিয়ে কয়েক পা এগিয়ে এলো বললো– পানি খাবে?
হাঁ, পানি পিয়েগা, বহুৎ পিয়াস হুয়ে।
আচ্ছা এখানে বসো, আমি পানি আনছি। নকীব চলে গেলো ভিতরে। একটু পরে পানি নিয়ে ফিরে এলো নকীব।
বৃদ্ধ পানি পান করে তৃপ্তির নিশ্বাস ত্যাগ করলো।
নকীব অনেকক্ষণ তাকিয়ে দেখলো বৃদ্ধ ভিখারীর চেহারা অতি পবিত্র অতি সৌম্য-সুন্দর। দেখলেই শ্রদ্ধা করতে ইচ্ছা করে, ভক্তি করতে ইচ্ছা হয়।
নকীবকে লক্ষ্য করে বললো বৃদ্ধ ভিখারী–ব্যাটা, তুম মেরা পাশ কই চিজ মাংতা?
নকীব প্রথমে বুঝতে পেরে একটু আশ্চর্য হল, বলে সেতুমি কি বলছো, আমি বুঝতে পারছি না বাবাজী।
তুম্ মেরা বা সমতা নেহি?
নেহি বাবা, নেহি আমি কিছু বুঝতে পারছি না।
বৃদ্ধ হাসলো–তুম কই চিজ লেগা? তোমহারা কোই দুঃখ হ্যায়?
দুঃখ! হাঁ তা আছে বই কি? তুমি কি দেবে–টাকা না পয়সা?
নেহি হাম ভিখারী আদমি, তুমকো রূপেয়া হাম কাহাছে দেংগে বেটা। হাম্ তোমহারা দিল্কা। খায়েস মিটানে চাহতা।
দিকা খায়েস। নকীব এবার একটু বুঝতে পারলো। একবার উর্দু ছবি দেখতে গিয়ে আপামনি তাকে দিকা খায়েস শব্দের মানে বুঝিয়ে বলেছিলো। মানেটা–মনের আশা।
এবার খুশি হলো নকীব, হেসে বললো–তুমি আমার মনের আশা মেটাতে পারবে?
হাঁ বেটা তুম জো চিজ চাহোগে হাম্ দেনে সাতা।
নকীব গালে হাত দিয়ে চিন্তা করতে লাগলো কি চিজ চাইবে সে। কোন অভাবটা এখন তার সব চাইতে বেশি। টাকা পয়সা-না; চৌধুরী বাড়ীতে আজ সে পঁচিশ বছর ধরে আছে টাকা পয়সার তো কোন অভাব হয়নি কোনদিন। যখন যা প্রয়োজন তাই দিয়েছেন মনিব-গৃহিনী। কি চাইবে, কই তার মনের আশা কিছু নেই তো। এ বাড়িতে তার মনের সবসাধই পূরণ হয়েছে। বৌ-ছেলেমেয়ে–এসব তো অনেক দিন শেষ হয়ে গেছে।
