বনহুরও দুধের গেলাসটা হাতে তুলেছিলো, এক নিশ্বাসে দুধ পান করে খালি গেলাসটা নামিয়ে রাখলো টেবিলে।
প্যান্টের পকেট থেকে সিগারেট কেসটা বের করে বাড়িয়ে ধরলো বনহুর মিঃ জাফরী আর মিঃ হোসেনের সামনে।
মিঃ জাফরী আর মিঃ হোসেন সিগারেট না নিয়ে পারলেন না। বনহুর নিজে একটা সিগারেট ঠোঁটে চেপে ধীরে তাতে অগ্নি সংযোগ করলো। সিগারেটের ধোয়ার ফাঁকে বনহুর তাকাচ্ছিলো মাঝে মাঝে ইন্সপেক্টারদ্বয়ের মুখের দিকে।
ধীরে ধীরে মিঃ জাফরী ও মিঃ হোসেনের চোখ বন্ধ হয়ে আসছে বলে মনে হলো। কিছুতেই নিজেদের সংযত রাখতে পারছেন না তারা। একটা গভীর আবেশে মিঃ জাফরী ও মিঃ হোসেন এক সময় ঢলে পড়লেন নিজ নিজ আসনে।
বনহুরের আদেশে ইন্সপেক্টার মিঃ জাফরী আর মিঃ হোসেনের সংজ্ঞাহীন দেহ কাঁধে তুলে নিলো কয়েকজন অনুচর।
রহমান ও বনহুর অশ্বপৃষ্ঠে চেপে বসলো।
মিঃ জাফরীর সংজ্ঞাহীন দেহটা বনহুর নিজের অশ্বে তুলে নিলো। আর মিঃ হোসেনকে তুলে দেওয়া হলো রহমানের অশ্বপৃষ্ঠে।
বনপথে দ্রুত অগ্রসর হলো বনহুর আর রহমান।
উভয়ের অশ্বপৃষ্ঠে দুই জন ইন্সপেক্টার।
*
মিঃ জাফরীর ঘুম ভাঙতেই বিস্ময়ে আরষ্ট হলেন তিনি। একি! তার বিছানার চারপাশে এতো লোকজন কেননা! সবার আগে নজর পড়লো পুলিশ ইন্সপেক্টার মিঃ আহম্মদের মুখে।
মিঃ জাফরীকে চোখ মেলতে দেখেই বললেন মিঃ আহম্মদ –মিঃ জাফরী, আপনি কি সুস্থ বোধ করছেন?
হাঁ, আমি সম্পূর্ণ সুস্থ রয়েছি। কিন্তু আমি এখন কোথায় ঠিক স্মরণ করতে পারছি না।
আপনি আপনার নিজ বাসায় এবং নিজ বিছানায়।
এখানে কি করে এলাম আমি?
এখন নয়, পরে সব জানতে পারবেন।
না; আপনারা সব খোলাসা বলুন? আমি বললাম তো, কোনরূপ অসুস্থই আমি নই। মিঃ জাফরী শয্যায় উঠে বসলেন।
মিঃ আহম্মদ বললেন–আপনি এখন যে ভাবে শুয়ে ছিলেন ঠিক সেই ভাবেই আপনার স্ত্রী আপনাকে আপনার শয্যায় দেখতে পেয়েছিলেন।
আমার শয্যায়?
হাঁ।
আশ্চর্য। মিঃ জাফরী গভীরভাবে কিছু চিন্তা করতে লাগলেন। একটু পরে বললেন–মিঃ হোসেন কোথায়?
তাঁকে তো এখনও পাওয়া যায়নি– মিঃ আহাম্মদের কথা শেষ হয়না, টেবিলে ফোনটা সশব্দে বেজে উঠে ক্রিং ক্রিং করে।
অন্য একজন ভদ্রলোক রিসিভার হাতে তুলে নিয়ে কানে ধরলেন–হ্যালো! হাঁ কি বললেন, মিঃ হোসেনকে পাওয়া গেছে! কোথায় বললেন? হ্যালো–হ্যালো কি? তাঁর গ্যারেজে রাখা গাড়ির মধ্যে? আশ্চর্য–রিসিভার রেখে বললেন ভদ্রলোক।
মিঃ আহম্মদ বললেন–আশ্চর্য নয়, তাকে যে এমনভাবে পাওয়া যাবে, বোঝাই যাচ্ছিলো।
মিঃ জাফরী এতক্ষণে যেন আস্বস্ত হলেন, বললেন তিনি–দস্যু বনহুর তাহলে তার কথা এ ভাবেই রাখলো।
মিঃ আহম্মদ বললেন না রেখে কি উপায় আছে। সে জানে–মিঃ জাফরী ও তার সহকারীর কোন অমঙ্গল হলে আবার আফগানী সাহেবের উপর আমাদের আক্রমণ চলবে।
অন্য একজন অফিসার বললেন–কাজেই সে পুলিশ ইন্সপেক্টারদ্বয়কে নিরাপদে স্বস্থানে পৌঁছে দিতে বাধ্য হয়েছে।
মিঃ আহম্মদ বললেন–মিঃ জাফরী, বনহুর আপনাদের সজ্ঞানে এখানে পৌঁছে দেয়নি বুঝতে পারছি।
হাঁ, আমরা জানিনা, কি ভাবে সে আমাদের এখানে পৌঁছে দিয়েছে। মিঃ আহম্মদ অনেক কথা আছে আপনার সঙ্গে। এখন চলুন মিঃ হোসেন কেমন আছেন তাকে দেখে আসি।
ব্যস্তভাবে বললেন মিঃ আহম্মদ –এখন আপনার শয্যা ত্যাগ করা ঠিক হবে না মিঃ জাফরী।
না না, আমি সম্পূর্ণ সুস্থ রয়েছি।
মিঃ জাফরী শয্যা ত্যাগ করে উঠে দাঁড়ালেন।
মিঃ হোসেনের বাড়ি পৌঁছে তারা দেখলেন–হোসেন সাহেবের শারীরিক অবস্থার কোন পরিবর্তন ঘটেনি। মিঃ হোসেনও সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন।
তিনি কি ভাবে গ্যারেজে গাড়ির পিছন আসনে শুয়েছিলেন জানেন না। ড্রাইভার গাড়ি বের। করতে গ্যারেজে প্রবেশ করে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছিলো। ছুটে এসে সংবাদ দিয়েছিলো সে বাড়ির মধ্যে।
মিঃ আহম্মদ ড্রাইভারকে ডেকে আবার সমস্ত ব্যাপারটা শুনলেন আগাগোড়া।
*
শুধু পুলিশ মহলই নয়, সমস্ত শহরে কথাটা ছড়িয়ে পড়লো বিদ্যুৎ গতিতে। বিস্ময়ের উপরে বিস্ময় জাগালো সকলের মনে। প্রত্যেকটা অফিসার এসে মিঃ জাফরী ও মিঃ হোসেনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে লাগছেন। সবাই নানা রকম সহানুভূতি দেখাতে লাগলেন ইন্সপেক্টারদ্বয়কে। দস্যু বনহুর তাদের প্রতি কি ধরণের আচরণ করেছে সেখানে তারা কেমন ছিলেন তাদের কি খেতে। দিতো–কি ভাবে কি করতো–সব জানার জন্য উদগ্রীব সবাই।
মিঃ জাফরী এবং মিঃ হোসেন সত্য কথাই বললেন।
দস্যু বনহুর তাঁদের প্রতি কোন রকম অসৎ ব্যবহার করেনি, এ কথা জানালেন তারা।
কিন্তু দস্যুর আতিথ্য সেবায় সন্তুষ্ট হয়ে খুশি হবার বান্দা নন মিঃ জাফরী, ছাড়া পেয়ে ক্রুদ্ধ সিংহের ন্যায় হয়ে উঠলেন তিনি। শপথ গ্রহণ করলেন যেমন করে হোক বনহুরকে গ্রেপ্তার না করা অবধি তিনি বিশ্রাম গ্রহণ করবেন না। মিঃ জাফরী আর মিঃ আহম্মদের মধ্যে সব সময় এ বিষয় নিয়ে আলাপ আলোচনা চলতে লাগলো।
বনহুরের আস্তানা সম্বন্ধে যা মিঃ জাফরী জানতে পেরেছিলেন এবং স্বচক্ষে দেখেছিলেন সব বললেন মিঃ আহম্মদ সাহেবের নিকটে।
মিঃ আহম্মদের দু’চোখে যেন আগুন ঝরে পড়তে লাগলো। তিনি বললেন–একটা দস্যু কান্দাই এর বুকে এতোখানি আধিপত্য বিস্তার লাভে সক্ষম হয়েছে আর আমরা পুলিশ বাহিনী তার এতোটুকু টিকি আবিস্কার করতে পারলামনা। মিঃ জাফরী,আপনি কি কিছুই অনুমান করতে পারেন না? কান্দাই এর কোথায় কোন স্থানে এই আস্তানা রয়েছে?
