বনহুর বললো–ইন্সপেক্টার, এটা আমার অস্ত্র তৈরির কারখানা। এখানে নানা রকম অস্ত্র তৈরি হয়ে থাকে।
মিঃ জাফরী ও মিঃ হোসেনের চোখে-মুখে বিস্ময় ফুটে উঠলো, মিঃ জাফরীর ধমনীর রক্ত উষ্ণ হয়ে উঠলো সঙ্গে সঙ্গে, কিন্তু এই মুহূর্তে নীরব থাকা ছাড়া কোন উপায় নেই। মিঃ জাফরী একবার সহকারী হোসেনের দিকে তাকিয়ে নিলেন বনহুরের অজ্ঞাতে।
বনহুর এবার দ্বিতীয় কক্ষে প্রবেশ করলো। রহমান, মিঃ জাফরী ও মিঃ হোসেন তাকে অনুসরণ করলো!
দ্বিতীয় কক্ষে প্রবেশ করে বিস্ময়ে স্তব্ধ হলেন পুলিশ ইন্সপেক্টারদ্বয়! কক্ষটায় অসংখ্য অস্ত্র স্তূপীকৃত রয়েছে।
মিঃ জাফরী ও মিঃ হোসেন আবার দৃষ্টি বিনিময় করলেন। উভয়েরই চোখ ছানাবড়া হয়ে উঠেছে।
বনহুর বললো–এটা আমার অস্ত্রাগার।
ইন্সপেক্টারদ্বয় স্তম্ভিত হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন কক্ষমধ্যে স্তূপাকৃত ছোরা তলোয়ার, বর্শা, তীর-ধনু এমন কি বন্দুক-রাইফেল অসংখ্য রয়েছে। কান্দাই এর কোন গোপন অঞ্চলে এমন একটা অস্ত্রাগার আছে কেউ আজও কল্পনা করতে পারবে না।
বনহুর রহমানকে ইংগিৎ করলো কিছু।
রহমান অস্ত্রগারের মেঝেতে পা দিয়ে এক স্থানে চাপ দিলো সঙ্গে সঙ্গে মেঝের এক পাশের কিছুটা অংশ ফাঁক হয়ে একটা সিঁড়ি মুখ বেরিয়ে এলো।
বনহুর বললো–ইন্সপেক্টার, আসুন। সর্বাগ্রে বনহুর সিঁড়ির ধাপে পা রাখলো।
সিঁড়ি বেয়ে অগ্রসর হলো সে। মিঃ জাফরী ও মিঃ হোসেন ইতস্তত করছিলেন দেখে বললো বনহুর –আসুন, কোন ভয় নেই।
মিঃ জাফরী, মিঃ হোসেন ও রহমান সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করলো।
পাতাল গহ্বরে সিঁড়ির ধাপ বেয়ে আরও নিচে নামতে লাগলো তারা।
কিছুদূর অগ্রসর হয়ে বনহুর দাঁড়িয়ে পড়লো। একটা মাঝারি ধরনের কক্ষ এ কক্ষে নানা রকম গোলা বারুদ থরে থরে সাজানো রয়েছে।
কক্ষটার মধ্যে বারুদের গন্ধ নাকে এসে লাগছিলো।
বললো বনহুর–এটা আমার গোলা-বারুদ মজুদ কক্ষ। ইন্সপেক্টার, গোটা কান্দাই শহর ধ্বংস হবে, এতো গোলা বারুদ মজুত রয়েছে আমার।
মিঃ জাফরী কোন জবাব না দিয়ে একবার মিঃ হোসেনের দিকে তাকিয়ে নিলেন। দক্ষ পুলিশ ইন্সপেক্টার তিনি, একজন দস্যুর এতোখানি আধিপত্য লক্ষ্য করে ভিতরে ভিতরে ভীষণ ক্রুদ্ধ হচ্ছিলেন। এই মুহূর্তে ইচ্ছা হচ্ছিলো বনহুরকে তিনি বন্দী করেন। কিন্তু তিনি নিজেই এখন দস্যু হস্তে বন্দী, কাজেই মনের রাগ মনেই চেপে গেলেন।
বনহুর তার সমস্ত আস্তানায় গোপন স্থানগুলি এক এক করে দেখালো পুলিশ ইন্সেপেক্টার মিঃ জাফরী ও মিঃ হোসেনকে।
এমনকি তার বিশ্রামকক্ষ ও তার দরবারকক্ষও দেখালো।
মিঃ জাফরীর চোখে-মুখে রাজ্যের বিস্ময়। দস্যু বনহুরকে যতই ঘৃণা করুক যতই তার উপর রাগ থাক তবু অন্তরে অন্তরে দস্যু বনহুরের বীরত্বের প্রশংসা না করে পারলেন না। ভূগর্ভে এতো থাকতে পারে কল্পনা করতে পারেন না তাঁরা। মিঃ জাফরীর পুলিশ জীবনে এই তিনি প্রথম দেখলেন একজন দস্যু ভূগর্ভে কতখানি নিজের আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে। কবে কখন কি উপায়ে যে এতো করতে পেরেছে, ভেবে অবাক না হয়ে পারলেন না মিঃ জাফরী।
এতোক্ষণ নীরবে সব দেখে গেলেন, মনে মনে বিস্ময়ের শেষ সীমায় পৌঁছলেও এতোক্ষণ একটি কথাও তিনি উচ্চারণ করেননি।
মিঃ হোসেনও নির্বাক নয়নে সব দেখে যাচ্ছিলেন মনে প্রশ্ন জাগলেও একটি কথা তার মুখেও সরছিলো না।
বনহুর ইন্সপেক্টারদ্বয়ের মনোভাব বুঝতে পারছিলো। মৃদু মৃদু হাসছিলো সে, বললো এবার –আমার সব কিছুই বন্ধু বলে আপনাকে দেখালাম ইন্সপেক্টার, কিন্তু মনে রাখবেন আমার সঙ্গে কোন রকম চাতুরী খেলতে যাবেন না।
মিঃ জাফরী ও মিঃ হোসেন কোন কথা বললেন না।
বনহুর বললো আবার –ইন্সপেক্টার আপনারা বড় ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন বসুন কিছু পান– আহার করা যাক। বসুন।
অগত্যা বনহুরের কথা রাখতে হলো ইন্সপেক্টরদ্বয়কে।
একটা টেবিলের পাশে এসে বসলো বনহুর ও মিঃ জাফরী এবং মিঃ হোসেন।
নানাবিধ ফলমূল আর পানীয় সাজিয়ে রেখে গেলো একজন অনুচর।
রহমান পরিবেশন করে খাওয়াতে লাগলো।
খেয়ে তো কোন উপায় নেই, আজ কত দিন দস্যু বনহুরের আস্তানায় তারা বন্দী হয়ে। আছেন জীবন রক্ষার্থে খাদ্যগ্রহণ করতেই হয়েছে। মিঃ জাফরী, মিঃ হোসেন তাদের রুচিমত খাদ্যই বনহুর তাঁদের জন্য ব্যবস্থা করে দিয়েছিলো। বরং আরও ভাল পুষ্টিকর খাদ্য পরিবেশন করা হতো তাদের জন্য।
কাজেই আজ খেতে তাঁদের কোন আপত্তি থাকতে পারে না। বনহুর স্বয়ং মিঃ জাফরী ও মিঃ হোসেনের সঙ্গে খেতে শুরু করলো।
পরিচ্ছন্ন সুন্দর, খাবার, টাটকা ফলমূল, গরম দুধ সব ছিলো টেবিলে। একটা বড় রেকাবীতে থরে থরে সাজানো ছিলো থোকা থোকা আঙ্গুর ফল।
বনহুর রেকাবী থেকে আঙ্গুরের একটা থোকা তুলে নিয়ে মুখে ধরলো, কয়েকটা আঙ্গুর এক সঙ্গে চিবুতে চিবুতে বললো–আজ রাতেই আপনারা ফিরে যাবেন ইন্সপেক্টার। আপনাদের আদর যত্ন ঠিকভাবে করতে পারলাম না এজন্য মাফ করবেন না?
মিঃ জাফরী ও মিঃ হোসেন বনহুরের কথায় খুশি হলেন না। বরং রাগ হলো তাদের অন্তরে। কারণ তাঁদের আদরযত্নের কোন ত্রুটি হয়নি এখানে। দস্যুর হস্তে বন্দী হয়ে এতো লৌকিকতা ভাল লাগছিলো না এর চেয়ে নির্মম আচরণই তাদের মনে একটা শান্তি দিতো।
মিঃ জাফরী ও মিঃ হোসেন দুধপান শেষ করে রুমালে মুখ মুছলেন।
