কায়েস বলে উঠে–মিঃ জাফরীকে মুক্তি না দেওয়াই আমি সমীচিত মনে করি।
বনহুর মৃদু হাসলো–মিঃ জাফরীকে আটক করে রাখলে পুলিশ মহল আরও ক্ষেপে যাবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। যদিও তারা আমার আস্তানা খুঁজে বের করতে কোনদিন সক্ষম হবেনা, কিন্তু আফগানী সাহেবকে তারা কঠিন শাস্তি দেবে। আহম্মদ সাহেব জানেন আমি আফগানীকে সমীহ করি।
রহমান আর কায়েস নীরবে শুনে যাচ্ছিলো বনহুরের কথাগুলো।
বনহুর বলতে লাগলো–আজ ভোর হবার পূর্বেই মিঃ জাফরী ও তার সহকারিকে পুলিশ অফিসে পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা করো। হাঁ, তার পূর্বে মিঃ জাফরীর সঙ্গে আমার দেখা করার দরকার। বনহুর দেয়াল ঘড়িটার দিকে তাকালো। রাত দুটো বাজতে কয়েক মিনিট বাকি।
উঠে দাঁড়ালো বনহুর। রহমানকে লক্ষ্য করে বললো–চলো বন্দীখানায় যাবো।
বনহুরের সঙ্গে অগ্রসর হলো রহমান আর কায়েস।
সুদীর্ঘ সুড়ঙ্গ পথ বেয়ে এগিয়ে চললো তারা।
সুড়ঙ্গের মাঝে মাঝে মশাল জ্বলছে। একটানা কিছুদূর অগ্রসর হয়ে, মস্ত বড় একটা চাকার মত জিনিস রয়েছে। রহমান চাকার হ্যান্ডেল ধরে ঘুরাতেই একটা মুখ বেরিয়ে এলো ঠিক কুমীরের মুখের মত দরজাটা। এবার বনহুর আর রহমান সেই পথে অগ্রসর হলো।
বনহুর থমকে দাঁড়িয়ে বললো–কায়েস, তুমি তাজ আর দুলকীকে প্রস্তুত রেখো, আরও দুটো অশ্ব রাখবে।
আচ্ছা সর্দার।
কায়েস দাঁড়িয়ে রইলো, বনহুর আর রহমান প্রবেশ করলো সেই কুমীরের মুখাকৃতির মধ্যে।
ওদিকে কোন আলো ছিলোনা, রহমান এপাশ থেকে একটা মশাল তুলে নিলো হাতে।
আরও অন্ধকার এবং দুর্গম এই সুড়ঙ্গপথ। বহুদিন আগে একদিন বনহুর মনিরাকে মুরাদের হাত থেকে উদ্ধার করে এখানেই এনে রেখেছিলো, এই পথ বেয়ে আসতে গিয়েই সেদিন মনিরা দু’চোখ বন্ধ করে বনহুরকে আকড়ে ধরেছিলো ভয়ে। সুড়ঙ্গপথটা অতি সঙ্কীর্ণ এবং অন্ধকার। নিচে খরস্রোত একটি জলপ্রপাত।
বনহুর আর রহমান এই পথে অগ্রসর হলো।
সঙ্কীর্ণ পথ অতিক্রম করে ওপারে এসে পৌঁছলো। এটাই হলো বনহুরের কারাকক্ষের সীমানা।
ওদিকে একট মস্ত কপাট। ওপাশে কি আছে এপাশ থেকে বুঝবার জো নেই। কপাটের গায়ে বিরাট একটা তালা।
রহমান মশালটা কপাটের এক পাশে গেড়ে রেখে চাবির গোছা বের করলো।
কপাট খুলে ভিতরে প্রবেশ করলো বনহুর আর রহমান।
একটি গোলাকার কক্ষ, কক্ষমধ্যে একটা গোলকার টেবিল। টেবিলে নানা রকমের বাদ্যযন্ত্র এবং নানা রকম আমোদ-প্রমোদের বা খেলাধূলার সরঞ্জাম।
এ কক্ষে বনহুরের অনুচরগণ কখনও কখনও আনন্দ উপভোগ করে।
বনহুর আর রহমান পৌঁছতেই বিশ জন দস্যু বলিষ্ঠ ভয়ঙ্কর চেহারা, হাতে মারাত্মক অস্ত্র — কুর্ণিশ করে দাঁড়ালো।
এরা বনহুরের কারাকক্ষের পাহারাদার। বাইরের আলো বাতাসের সঙ্গে এদের কোন সম্বন্ধ নেই বললেই চলে। এদের সুখ-সুবিধার জন্য বনহুর ভূগর্ভেই সব কিছুর ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। এরা ইচ্ছামত বাইরে যেতে পারে না বা কোন সময় যাবার জন্য আগ্রহ দেখায় না। বছরে পাঁচদিন এরা ছাড়া পায়, তখন এরা ভূপৃষ্ঠে গমন করে যা খুশি তাই করে। বনহুর এদের কাজে তখন বাধা দেয় না।
বনহুর আর রহমান গোলাকার কক্ষ পেরিয়ে এগিয়ে গেলো। ওদিকেও আর একটা কপাট। এটার চাবি ছিলো ভূগর্ভস্থ এক অনুচরের নিকটে। সেই অনুচরটি এ তালা খুলে ফেললো।
সঙ্গে সঙ্গে ওদিকে পাশাপাশি কয়েকখানা কক্ষ নজরে পড়লো। উজ্জ্বল আলোতে কক্ষগুলো। আলোকিত। প্রতি কক্ষে কয়েকজন বন্দী আটক রাখা হয়েছে।
বনহুর আর রহমান এগিয়ে গেলো ওদিকে একটা বড় কক্ষে। এ কক্ষটাও আলোতে উজ্জ্বল।
এ আলোগুলো সূর্যের আলো নয়, বৈদ্যুতিক আলো। ভূগর্ভে খরস্রোত জলপ্রপাত থেকে বৈদ্যুতিক আলো আমদানি করা হয়েছে।
কক্ষে প্রবেশ করতেই মিঃ জাফরী আর মিঃ হোসেন উঠে এগিয়ে এলেন।
বনহুর আর রহমান এসে দাঁড়ালো তাদের সম্মুখে।
বললো বনহুর–মিঃ জাফরী, আপনার চিঠি পেয়ে মিঃ আহম্মদ আফগানী সাহেবকে মুক্তি দিয়েছে এবার আপনারা মুক্তি পাবেন।
বনহুরের কথায় মিঃ জাফরী ও মিঃ হোসেনের চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো।
বললেন মিঃ জাফরী-তাহলে বিলম্ব না করাই শ্রেয় দস্যু সম্রাট।
বনহুর হেসে উঠলো–এক মুহূর্ত আর বিলম্ব সইছেনা ইন্সেপেক্টার, কিন্তু মনে রাখবেন, আবার যদি আফগানীর উপর কোন–
না, আমি কথা দিচ্ছি আফগানীর উপর আর কোন শাস্তি প্রদান করা হবেনা। কিন্তু একটা কথা আমি বলবো দস্যু, রাখবে বলো? বলেন মিঃ জাফরী।
রাখবার মত হলে রাখবো বৈকি। বললো বনহুর।
মিঃ জাফরী বললেন–তোমার এই ভূগর্ভ আস্তানাটা একবার স্বচক্ষে দেখতে চাই।
অট্টহাসি হেসে উঠলো বনহুর–হাঃ হাঃ হাঃ, আমার ভূগর্ভ আস্তানাটা দেখতে চান? বেশ, রহমান, উনাদের নিয়ে এসো আমার সঙ্গে।
বনহুর এগুলো।
রহমান মিঃ জাফরী ও মিঃ হোসেন সহ অনুসরণ করলো বনহুরকে।
বনহুর একটা মস্তবড় লৌহ দরজার পাশে এসে দাঁড়ালো। রহমান দেয়ালের এক পাশে চাপ দিতেই দরজা খুলে গেলো। গাঢ় জমাট অন্ধকারের মধ্যে যেন একটা মরণ বিভীষিকা প্রতীক্ষা করছে।
বনহুরের ইংগিতে একটা মশাল নিয়ে এলো রহমান।
মশাল হস্তে রহমান সর্বাগ্রে প্রবেশ করলো। পিছনে বনহুর মিঃ জাফরী আর মিঃ হোসেন।
এটাও একটা সুড়ঙ্গ পথ।
বনহুর বললো–ইন্সপেক্টার এটা আমার আস্তানায় প্রবেশ পথ।
সুড়ঙ্গ পথে কিছুটা অগ্রসর হওয়ার পর একটা শব্দ শোনা যাচ্ছিলো। কোন যন্ত্র চলার শব্দ বলে মনে হলো যেন। অল্পক্ষণের মধ্যেই নজর পড়লো বিরাট একটা চাকা ঘুরছে। চাকাটার চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছে অসংখ্য আগুনের ফুলকী। চার পাশে আরও অগণিত ছোটবড় মেশিন চলছে। অবাক হয়ে দেখলেন মিঃ জাফরী ও মিঃ হোসেন–শুধু মেশিনই নয়, প্রত্যেকটা মেশিনের পাশে দাঁড়িয়ে কাজ করছে বলিষ্ঠদেহী পুরুষ।
