মিঃ আহম্মদ বন্দীদের নিয়ে পুলিশ ভ্যানে উঠে বসলেন।
নানা ব্যস্ততার মধ্যে এতোক্ষণ মিঃ আহম্মদ ও তাঁর অন্যান্য সহকারীগণ ঐ ব্যক্তিটির প্রতি নজর রাখতে পারেননি বা নজর রাখার প্রয়োজনও বোধ করেননি। কারণ তার কথা মিথ্যা নয়। এর পূর্বে অনেক অনুসন্ধান করেও এই ভেজাল ঔষধ কোথা হতে শহরে আমদানী হয় এর খোঁজ পায়নি পুলিশ মহল! আজ সেই ভেজাল ঔষধের পরিবেশক মহব্বৎ আলীকে এবং তার সমস্ত ঔষধ আবিস্কার করায় দেশ ও দশের একটা মহান উপকার সাধিত হলো।
মিঃ আহম্মদ গাড়িতে বসে বললেন–উনি কই, যিনি আজ আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে এলেন, সেই অজ্ঞাত ব্যক্তি কই?
কিন্তু কোথায় সেই ব্যক্তি! অনেক সন্ধান করেও আর তাকে দেখা গেলো না।
*
নির্জন বনপথ দিয়ে মন্থর গতিতে এগিয়ে চলেছে দু’জন অশ্বারোহী। উভয়েরই শরীরে একই ড্রেস। কালো পোশাক মাথায় কালো পাগড়ি, গালপাট্টা বাঁধা, পিঠে রাইফেল ঝুলছে।
অসংখ্য বৃক্ষের পাতার ফাঁকে নীল আকাশের কিছু কিছু অংশ নজরে পড়ছে।
হাল্কা মেঘের ফাঁকে দ্বাদশীর চাঁদ লুকোচুরি খেলছে। মৃদু-মন্দা বাতাস দোলা দিয়ে যাচ্ছে। শাখায় শাখায়। মাঝে মাঝে রাতজাগা পাখিগুলো পাখা ঝাপটা দিয়ে উঠছে।
রাত খুব বেশি না হলেও নির্জন বনাঞ্চলে গভীর রাত বলেই মনে হচ্ছিলো।
অশ্বরোহীদ্বয় আপন মনে কথা বলতে বলতে চলেছে।
প্রথম জন দ্বিতীয় ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে বললো–রহমান পুলিশ অফিসের কেউ চিনতে পারেনি শেষ পর্যন্ত?
বললো দ্বিতীয় জন–না সর্দার, আমাকে পুলিশ অফিসের কেউ চিনতে পারেনি, মিঃ আহম্মদও নয়।
তোমার বুদ্ধি কৌশলে আমি খুশি হয়েছি রহমান।
সর্দার, আমাকে ইতিপূর্বে মিঃ আহম্মদ কিংবা পুলিশ অফিসারগণ কেউ দেখেননি, সেই কারণেই আমি এতো সহজে কাজ উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছি। তাছাড়াও আমার মুখে ছিলো ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি আর মুখ ভরা বসন্তের দাগ। আমার শরীরের রঙও পাল্টে নিয়েছিলাম নিখুঁতভাবে।
মহব্বৎ আলী ও তার দলবলকে গ্রেপ্তারের পরেই তুমি সরে পড়েছিলে?
হাঁ সর্দার, আপনি যে ভাবে বলে দিয়েছিলেন সে ভাবেই কাজ করেছি। আচ্ছা সর্দার, আপনি কি ঐ সময়–
হাঁ, আমি ঐ সময় মহব্বৎ আলীর লৌহ সিন্দুকের পাশে ছিলাম। পুলিশ সমস্ত হোটেল হস্তগত করার পূর্বেই সম্পূর্ণ অর্থ আমার হস্তগত হয়েছিলো। আমি যখন হোটেলের বাইরে এসে পৌঁছেছিলাম ঠিক তখন মিঃ আহম্মদ ও পুলিশ ফোর্স মহব্বৎ আলী আর তার বিশ্বস্ত অনুচরদের পাকড়াও করে নিয়ে পুলিশ ভ্যানে উঠে বসেছিলো। তখন আমি তোমাকে লক্ষ্য করেছিলাম, কিন্তু দেখতে পাইনি।
তার পূর্বেই আমি সরে পড়তে সক্ষম হয়েছিলাম সর্দার।
আফগানীর মুক্তি দিয়েছে কি? প্রশ্ন করলো বনহুর।
রহমান বললো–কায়েস এখন পুলিশের হেড অফিসে, আফগানী সাহেব ছাড়া পেলে নিশ্চয়ই সে বিলম্ব না করে সংবাদ দিতো।
দস্যু বনহুর আর রহমান এবার ঘোড়া ছুটিয়ে আস্তানার পথে অগ্রসর হলো।
আস্তানায় পৌঁছতেই দু’জন মশালধারী অনুচর এসে বনহুর আর রহমান-এর দুই পাশে দাঁড়ালো।
বনহুর আর রহমান অশ্বপৃষ্ঠ থেকে নেমে দাঁড়ালো। সম্মুখে এসে দাঁড়ালো কায়েস।
বনহুর আর রহমান–তাকালো কায়েসের দিকে।
বললো রহমান–কায়েস, তুমি কখন এলে?
কায়েস বললো–সন্ধ্যার কিছু পর আস্তানায় এসে পৌঁছেছি।
কি সংবাদ কায়েস? বললো বনহুর।
সর্দার আফগানী সাহেবকে হাজত থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
আফগানী সাহেব মুক্তি লাভ করেছে তাহলে?
হাঁ সর্দার।
এবার তাহলে মিঃ জাফরী আর মিঃ হোসেনকে মুক্তি দিতে হয়। বললো রহমান।
বনহুর আস্তানার দিকে এগুতে এগুতে বললো–মিঃ আহম্মদ অতি বুদ্ধিমান লোক। সহজাত ভাই এর জন্য তিনি মস্ত চাল চাললেন।
দু’জন অনুচর একজন তাজকে অন্যজন দুলকীকে নিয়ে চলে গেলো ওদিকে।
রহমান আর বনহুর পাশাপাশি এগুচ্ছিলো। পিছনে চলেছিলো কায়েস।
বনহুরের কথায় রহমান বললো “সর্দার, আপনার কথা ঠিক বুঝতে পারলাম না?
ও, আচ্ছা চলো, বিশ্রাম কক্ষে বসে কথাটা তোমাকে বুঝিয়ে দিচ্ছি।
বনহুর রহমান আর কায়েম এসে হাজির হলো বনহুরের বিশ্রাম কক্ষে।
বনহুর পিঠে ঝোলানো রাইফেলটা খুলে দেয়ালে ঠেস দিয়ে রাখলো। মাথার পাগড়িটা খুলে রাখলো সামনের টেবিলে। তারপর শয্যায় ঠেস দিয়ে বসলো –বসে রহমান।
রহমান পিঠের রাইফেলটা খুলে দক্ষিণ হস্তে ধরে বসে পড়লো পাশের একটা পাথরখন্ডে।
বনহুরের আস্তানাটা ছিলো সম্পূর্ণ পাথরের তৈরি কাজেই পাথরের কোন অভাব ছিলোনা তার আস্তানার কোন স্থানে। কক্ষমধ্যে এবং আনাচে কানাচে বিক্ষিপ্ত ছড়ানো ছিলো অসংখ্য পাথরকালো সাদা ছোট বড় নানাধরনের।
রহমান এরই একটিতে বসলো।
কায়েস দাঁড়িয়ে রইলো তাদের সামনে।
বনহুর বললো–আহম্মদ সাহেব মিঃ জাফরী ও হোসেনের মুক্তির জন্যই আফগানীকে মুক্তি দিয়েছে, তাই না?
হাঁ সর্দার, মিঃ জাফরীর চিঠি পেলেই তিনি এই মত কাজ করেছেন।
বললো বনহুর–কিন্তু এর পিছনে রয়েছে বিরাট একটা অভিসন্ধি। মিঃ আহম্মদ মিঃ জাফরী ও তার সহকারীকে ফিরে পেলেই আবার আফগানীর উপর হামলা চালাবে।
ঐরকম আমারও মনে হয় সর্দার। বললো কায়েস।
রহমান তাকলো কায়েসের দিকে।
বনহুর বললো–শুধু আফগানী নয়, ঐ মিঃ জাফরীকে পেলে মিঃ আহম্মদ নবোদ্যমে আবার আমার পিছু লাগবে।
তাহলে–কথা শেষ না করে চুপ হয় রহমান।
