মহব্বৎ আলী রাগত কণ্ঠে বললো–সেদিন সম্পূর্ণ টাকা আপনারা আমার কাছ থেকে বুঝে নিয়ে গেছেন।
হংকিং দৃঢ় গলায় বললো–আমরা আসি নাই, টাকা কি করে নিলাম?
আমি স্বয়ং আপনাদের হাতে টাকা দিয়ে দিয়েছি।
এতো বড় মিথ্যা কথা বলছেন–হংকিং মহব্বৎ আলীর কলার চেপে ধরেলো।
শুরু হলো প্রচন্ড ধস্তাধস্তি।
অল্পক্ষণের মধ্যে হোটেলের লোকজন সবাই ছুটে এলো সেই কক্ষে।
*
এদিকে যখন মহব্বৎ আলীর সঙ্গে ডক্টর হংকিং ও মংলাও এর তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়েছে তখন পুলিশ অফিসের দরজায় এসে থামলো একটা গাড়ি।
অফিসে তখন অন্য আর একটা ব্যাপার নিয়ে অত্যন্ত চাঞ্চল্য দেখা দিয়েছিলো। পুলিশ ইন্সপেক্টর আহম্মদ সাহেব ও অন্যান্য পুলিশ অফিসারগণের মুখমন্ডল আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে পড়েছে। কারণ কিছু পূর্বেই একখানা চিঠি এসে পৌঁছেছে মিঃ আহম্মদের হস্তে। চিঠিখানা লিখেছেন স্বয়ং মিঃ জাফরী।
আহম্মদ সাহেব গম্ভীর উৎকুণ্ঠা ভাব নিয়ে পায়চারী করছেন। এখনও তার হাতের মুঠায় মিঃ জাফরীর হস্তের চিঠিখানা রয়েছে।
অন্যান্য পুলিশ অফিসারগণ, সকলের মুখেই আতঙ্ক ভাব। সবাই তাকিয়ে আছে মিঃ আহম্মদ সাহেবের মুখের দিকে। এটা একটা ভয়ঙ্কর খবর। মিঃ জাফরীর মত দক্ষ পুলিশ ইন্সপেক্টার বন্দী হবেন দস্যু বনহুরের হস্তে–একথা যেন কেউ বিশ্বাস করতে পারছেন না।
কিন্তু বিশ্বাস না করে উপায় কি! চিঠিখানা যে স্বয়ং মিঃ জাফরী লিখেছেন তাতে কোন সন্দেহ নেই। পায়চারী বন্ধ করে দাঁড়িয়ে পড়লেন আহম্মদ সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন–এখন কি করা কর্তব্য বলুন?
মিঃ আহম্মদ সাহেবের কথায় পুলিশ অফিসারগণ সবাই একবার মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে নিলেন।
এক পাশে বসেছিলেন মিঃ শঙ্কর রাও। তিনি বললেন–ওঃ এবার দস্যু বনহুর দেখছি আচ্ছা চাল চেলেছে। মিঃ জাফরী ও তাঁর সহকারীকে আটক করে আফগানীর মুক্তি চেয়েছে, নাহলে তাদেরও মুক্তি নেই।
মিঃ শঙ্কর রাও এর কথা শেষ হতে না হতে একটা লোক ব্যস্তভাবে পুলিশ অফিসে প্রবেশ করে হাঁপাতে হাঁপাতে বললো– স্যার পুলিশ ফোর্স নিয়ে তাড়াতাড়ি চলুন। গুলবাগ হোটেলের গোপন একটা কক্ষে বহু ভেজাল ঔষধ বেরিয়েছে। বিলম্ব হলে সব লুকিয়ে ফেলতে পারে।
লোকটা অপরিচিত হলেও তার কথা অবিশ্বাস করবার মত কিছু ছিলনা। কারণ, আহম্মদ সাহেব জানেন–মহব্বৎ আলী গোপনে ঔষধের কারবার করছেন। কিন্তু উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে। এতোদিন মহব্বৎ আলীকে গ্রেফতার করতে পারেননি বা তার হোটেলখানা তল্লাশী করতে পারেননি।
পুলিশ অফিসের অন্যান্য অফিসারগণ এক একজন এক এক রকম প্রশ্ন করে চললেন। লোকটিকে।
মিঃ আহম্মদ সবাইকে চুপ থাকতে বলে লোকটিকে জিজ্ঞাসা করলেন–আপনি কে এবং আপনার বাড়ি কোথায়?
লোকটা মাথা চুলকে তাকালো আহম্মদ সাহেবের মুখের দিকে তারপর সবাই এর মুখে তাকিয়ে বললো লোকটা –আমি গুলবাগ হোটেলেই কাজ করি। আপনারা কি আমাকে চেনেন না? আমিই তো বয় সাহাদৎ মিয়া? স্যার, গুলবাগে যারা যান সবাই আমাকে চেনেন।
মিঃ আহম্মদ অত্যন্ত সতর্ক লোক, তিনি একজন পুলিশকে বললেন–একে এরেষ্ট করো।
আমাকে! লোকটা কেঁদেই ফেললো যেন।
মিঃ আহসান থানার বড় দারোগা, তিনি বললেন–স্যার, একে এ্যারেষ্ট করা কি ঠিক হবে। তার চেয়ে ওকে আমাদের সঙ্গে নিয়ে চলুন ঘটনা সত্য হলে মুক্তি পাবে আর যদি মিথ্যা হয়। তাহলে এর উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া হবে।
হাঁ, তাই হোক। বললো লোকটা।
মিঃ আহম্মদ পুলিশ ফোর্স নিয়ে তখনই রওয়ানা দিলেন।
মিঃ আহম্মদ ও আরও একজন পুলিশ ইন্সপেক্টার এবং সশস্ত্র পুলিশ ফোর্স নিয়ে ছুটলেন গুলবাগের উদ্দেশ্যে।
তখনও হোটেল গুলবাগে মহব্বৎ আলী এবং ডক্টর হংকিং আর মংলাও এ তুমুল কলহ চলেছে। এমনকি শেষ পর্যন্ত লড়াই শুরু হয়ে গেছে।
মহব্বৎ আলীর লোক ডক্টর হংকিং আর মংলাওকে খুব করে উত্তম মধ্যম দেওয়া আরম্ভ করে। দিয়েছে।
ঠিক সেই সময় মিঃ আহম্মদ পুলিশ ফোর্স নিয়ে হাজির হলেন হোটেল গুলবাগে।
যে ব্যক্তি মিঃ আহম্মদকে পুলিশ অফিসে গিয়ে সংবাদ দিয়েছিলো। সে মিঃ আহম্মদ ও পুলিশ ফোর্সকে হোটেল পথ দেখিয়ে নিয়ে চললো।
মিঃ আহম্মদ পুলিশ ফোর্স নিয়ে হোটেলকক্ষে প্রবেশ করতেই মহব্বৎ আলী ও ডক্টর হংকিং আর মংলাও চুপ হয়ে পড়লো।
এবার সেই লোকটি মিঃ আহম্মদকে দেখিয়ে দিলো যেখানে থরে থরে সাজিয়ে রাখা হয়েছিলো ভেজাল ঔষধের বাক্সগুলো। সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ অসংখ্য ভেজাল ঔষধের বাক্স আবিস্কার করে ফেললো।
মিঃ আহম্মদের ইংগিতে মহব্বৎ আলী আর ডক্টর হংকিং রাও ও ডক্টর মংলাওকে এরেষ্ট করে ফেললো পুলিশ বাহিনী।
শুধু মহব্বৎ আলী এবং ডক্টর হংকিং রাও আর মংলাওকেই পুলিশ বাহিনী বন্দী করলোনা, সমস্ত হোটেলের কর্মচারীগণকে এরেষ্ট করা হলো।
হংকিং রাও আর মংলাও দস্যু বনহুর হস্তে বন্দী থাকার পর সবেমাত্র মুক্তি পেয়েছিলো আবার তারা বন্দী হয়ে নিজেদের কর্মদোষ মর্মে মর্মে অনুভব করতে লাগলো।
মহব্বৎ আলীর মাথায় সহসা আকাশ ভেঙে পড়লেও সে এতোখানি আঘাত পেতোনা। চোখে অমাবস্যার অন্ধকার দেখতে লাগলো মহব্বৎ আলী। তার এতো পরিশ্রমের উপার্জিত অর্থ আর ঔষধগুলো বিনষ্ট হলো। ইতিপূর্বে অন্যান্য ব্লাকমার্কেট ব্যাপারে কয়েকবার জেল খেটেছে সে। কিন্তু এতেও ভেঙে পড়েনি মহব্বৎ আলী কোনদিন। আজ তার সব গেলো শুধু অর্থই নয়–তার সঙ্গে গুলবাগ হোটেলও বন্ধ হয়ে গেলো।
