দরবার কক্ষের মধ্যে কয়েকটা মশাল দপ দপ করে জ্বলছে। গোটা কক্ষটা জমকালো পাথরে তৈরি। মশালের আলোতে কালো পাথরগুলো কেমন যেন ভয়াবহ লাগছিলো। লৌহ শিকলে বন্ধন অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছেন মিঃ জাফরী আর মিঃ হোসেন।
একটা সূচ পড়ার শব্দও হচ্ছে না দরবার কক্ষে।
বনহুর আবার বললো–অতোখানি পিশাচ আমি নই।
মিঃ জাফরী, বললেন এবার–তা আমরা জানি দস্যু হলেও তোমার মহৎ হৃদয়ের পরিচয় আরও অনেকেই জানে।
মিঃ হোসেন বলে উঠলেন–তোমাকে গ্রেপ্তারের ইচ্ছা থাকলেও তোমার প্রতি পুলিশ মহলেরও একটা আন্তরিকতা আছে!
এ কথা আপনারা প্রকাশ না করলেও আমি জানি। আর জানি বলেই আজ আমি আপনাদের প্রতি অসৎ ব্যবহার করিনি। মিঃ জাফরী আমি আপনাকে এবং আপনার সহকারী মিঃ হোসেনকে কথা দিচ্ছি–কোন ক্ষতি আপনাদের হবেনা।
এবার রহমানকে লক্ষ্য করে বললো বনহুর–এদের সসম্মানে নিয়ে যাও, বন্দী করে রাখো। কোন অসুবিধা যেন না হয় সেদিকে লক্ষ্য রেখো।
রহমান মাথা নত করে বললো–আচ্ছা সর্দার।
রহমানের ইংগিতে দুজন অনুচর মিঃ জাফরী ও মিঃ হোসেনকে নিয়ে গেলো সেখান থেকে।
মিঃ জাফরী এবং মিঃ হোসেনকে নিয়ে যাবার পর বনহুর রহমানকে বললো–এই চিঠিখানা পুলিশ অফিসে পৌঁছে দেবার চেষ্টা করো।
আচ্ছা সর্দার।
তারপর অন্যান্য খবরের জন্য কায়েসকে ছদ্মবেশে পুলিশ অফিসেই অপেক্ষা করতে বলো। আফগানী সাহেবকে মুক্তি না দেওয়া পর্যন্ত কোন কথা নয়।
বনহুর দবার কক্ষ ত্যাগ করতে যাচ্ছিলো, বললো রহমান–সর্দার, ডক্টর হংকিং ও ডক্টর মংলাও–এদের কি এখন মুক্তি দেওয়া হবে?
দাঁড়িয়ে একটু করে বললো বনহুর–হাঁ, ওদের এবার মুক্তি দেওয়া যায়, কিন্তু আর যেন ঐ ধরনের কাজে লিপ্ত না হয় তার জন্য সায়েস্তাও করে দিতে হবে।
কথা শেষ করে বেরিয়ে যায় বনহুর।
*
ডক্টর হংকিং আর মংলাওকে মুক্তি দিলো বনহুর কিন্তু তাকে সাবধান করে দিলো আর যেন সে এ ব্যবসায়ে লিপ্ত না হয়।
প্রায় পনেরো বিশ দিন পর ছাড়া পেলো ডক্টর হংকিং ও মংলাও।
হংকিং ও মংলাও ছাড়া পেয়েই চললো হোটেল গুলবাগে মোটা অঙ্কের টাকা পাওনাদার আছে এখন তারা।
হংকিং ও মংলাও হোটেল গুলবাগে প্রবেশ করতেই মহব্বৎ আলী বিষ্ময়ে স্তম্ভিত হলো, সশব্যস্তে উঠে এগিয়ে এলো–আপনারা?
হংকিং বললো–ভিতরে আসুন, বলছি সব।
হংকিং আর মংলাও এর বিবর্ণ ফ্যাকাশে মুখভাব লক্ষ্য করে আরও হতভম্ব হয়ে পড়েছে। মহব্বৎ আলী; ব্যাপার কি? সেদিন ওভাবে এলো, টাকা নিয়ে চলে গেলো। আর কোন দিন কান্দাই-এ পা রাখবেনা বলে গেলো, কিন্তু–
হংকিং আর মংলাও মহব্বৎ আলীকে ভাববার সময় না দিয়ে এগিয়ে গেলো মালখানার দিকে।
মহব্বৎ আলীও তাদের অনুসরণ করলো।
মালখানায় মালপত্র রাখছিলো দুই জন লোক।
মহব্বৎ আলী, হংকিং ও মংলাও এসে বসলো গোল টেবিলটার পাশে।
মহব্বৎ আলী আর মংলাও এর মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি জন্মেছে। চোখে মুখে বেশ একটা উকুণ্ঠার ভাব ফুটে উঠেছে।
লোক দু’টো গুদাম ঘরে ঔষধের বাক্সগুলো ঠিকভাবে সাজিয়ে রাখছিলো বাক্সের সম্মুখে সাজিয়ে রাখছিলো হোটেলের প্রয়োজনীয় জিনিষপত্র, আর পিছন দিকে ভেজাল মিশানো ঔষধের বাক্স।
মহব্বৎ আলী স্বয়ং এদের দিয়ে কাজ করাচ্ছিলেন, চোরা কারবারীদের সদা আশঙ্কা–কখন কোন বিপদ এসে পড়ে। বিশেষ করে পুলিশের ভয়তো আছেই, তারপর দস্যু বনহুরের ভয়ও কম নয়। সেদিন মংলাও আর হংকিং এর মুখে যখন জানতে পেরেছিলো দস্যু বনহুরের কবলে তারা পড়েছিলো কোন রকমে প্রাণ বাঁচিয়ে ফিরে এসেছে সেই দিন হতে মহব্বৎ আলীর বুকটাও ধক ধ করছিলো। না জানি কখন হামলা দিয়ে তার সব লুটে নেবে।
আজ কদিন হলো তাই মহব্বৎ আলীর মনে স্বস্তি নেই। কোথায় কেমন ভাবে তার ভেজাল ঔষধের বাক্সগুলি লুকিয়ে রাখবে সেই চেষ্টা করছে।
এমন সময় পুনরায় হংকিং আর মংলাকে দেখে বিস্ময় জেগেছিলো মহব্বৎ আলীর কারণ টাকাপয়সা সম্পূর্ণ সেদিন নিয়েই বিদায় হয়েছিলো ওরা।
আজ আবার হংকিং আর মংলাও এসে হাজির হলো দেখে মহব্বৎ আলী স্তম্ভিত হয়ে পড়লো।
গোল টেবিলের পাশে বসে পড়লো মংলাও আর হংকিং। মহব্বৎ আলীর চোখমুখে বিস্ময় ঝরে পড়ছে। বললো মহব্বৎ আলী–কি ব্যাপার, আবার যে আপনারা ফিরে এলেন?
ডক্টর হংকিং রাগত কণ্ঠে বললেন–তার মানে? আপনি কি চান আমরা আর ফিরে না আসি?
মংলাও বলে উঠলো–আমরা না এলেই খুশি হতেন আপনি?
মহব্বৎ আলী কেমন যেন অবাক হয়ে পড়লো। ডক্টর হংকিং আর মংলাও এর কথাবার্তা যেন বুঝতে পারছেনা সে। বললো মহব্বৎ আলী–আপনারা সেদিন আমার নিকট থেকে টাকা নিয়ে যাবার সময় তো সেই কথাই বলেছিলেন, কান্দাই আর আপনারা আসবেন না।
বিস্ময়ভরা কন্ঠে বলে উঠলো হংকিং–কি বললেন মহব্বৎ আলী খাঁ! আমরা টাকা নিয়ে গেছি?
হাঁ সেদিন পঁচিশে আগষ্ট রাত্রি এগারোটায় এরই মধ্যে ভুলে গেছেন সব?।
মহব্বৎ আলীর কথা শুনে ফ্যাকাসে হয়ে উঠলো হংকিং রাও আর মংলাও এর মুখমন্ডল। বললো উভয়ে এক সঙ্গে–কি বললেন আপনি!
হংকিং ললো আবার–আমরা টাকা নিয়েছি।
হাঁ নিয়েছেন।
যে লোক দু’জন ঔষধের বাক্স গুছিয়ে রাখছিলো, তারা উভয়ে মুখ চাওয়া চাওয়ি করে নিলো।
প্রথম মজুর বললো–হুঁজুর, কাজ হয়ে গেছে।
বেশ এখন বাইরে যাও। আমি এসে তোমাদের মজুরীর দাম দেবো বেরিয়ে গেলো মজুরদ্বয়।
