মিঃ জাফরী গম্ভীর কণ্ঠে বললেন কি–তুমি–চিস্তি সাহেবের ছদ্মবেশে আমাকে–রাগে, ক্ষোভে মিঃ জাফরীর কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে গেলো।
মিঃ হোসেনও ভীষণভাবে ক্রুদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন, দু’চোখ দিয়ে যেন আগুন ঝরে পড়েছিলো।
এবার চিস্তি সাহেব ড্রাইভারকে আদেশ করলেন গাড়ি ছাড়তে। ঝোপের আড়াল থেকে যেসব ভীষণ চেহারার লোক বেরিয়ে এসেছিলো তারা পুনরায় অদৃশ্য হলো ঝোপের আড়ালে।
গাড়িখানা আবার ছুটতে শুরু করলো।
*
বনহুরের দরবার কক্ষ।
সুউচ্চ আসনে উপবিষ্ট স্বয়ং দস্যু বনহুর।
সম্মুখে হস্তপদ বন্ধন অবস্থায় মিঃ জাফরী ও হোসেন সাহেব দন্ডায়মান।
সূতীক্ষ্ণ বর্শা হস্তে কয়েকজন দস্যু মিঃ জাফরী ও মিঃ হোসেনের আশে-পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
বনহুরের আদেশে রহমান মিঃ জাফরী আর মিঃ হোসেনের কোমরের বেল্ট থেকে রিভলভার। খুলে নিলো।
ক্রুদ্ধ অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করে তাকিয়ে আছেন মিঃ জাফরী দস্যু বনহুরের মুখের দিকে।
হেসে বললো বনহুর–কি দেখছেন অমন করে?
কে তুমি?
হাঃ হাঃ হাঃ এখনও আপনার বন্ধুকে চিনতে পারেন নি?
তুমিই কি–
হাঁ, আমিই গত রাতের চিস্তি সাহেব।
তুমি! তুমিই—
শুধু চিস্তি সাহেবই নই, তোমার বন্ধু দস্যু বনহুর।
তুমি! তুমি দস্যু বনহুর?
হাঁ আমি–বন্ধু, তোমার কোন ক্ষতি করবো না। কিন্তু একটা কথা তোমাকে লিখে দিতে হবে, তাহলে মুক্তি দেবো।
মিঃ জাফরী ও মিঃ হোসেন একযোগে তাকালেন বনহুরের মুখের দিকে।
মুক্তি শব্দটা যেন তাদের কানে আজ মধু বর্ষণ করলো। জীবনে কত চোর-ডাকু-দুষ্ট লোককে মিঃ জাফরী এবং হোসেন সাহেব কারা কক্ষে বন্দী করেছেন, তার কোন হিসাব নেই। কোনদিন তাদের মনে উঁকি দেয়নি বন্দী হলে তাদের অবস্থা কি হয়। আজ পুলিশ ইন্সপেক্টারদ্বয় নিজেদের চরম অবস্থায় উপনীত হয়ে মুক্তি কথাটার আস্বাদ পেলেন।
বললেন মিঃ জাফরী–কি লেখা চাও তুমি?
একটা চিঠি।
চিঠি?
হাঁ, আফগানী সাহেবকে মুক্তি দেবার জন্য একটা চিঠি দেবেন, পুলিশ কমিশনারের কাছে। আফগানী সাহেবের মুক্তির পর মুক্তি পাবেন আপনারা।
এবার বনহুর রহমানকে বললো–একটা কাগজ-কলম এনে দাও।
অতি অল্প সময়ের মধ্যেই রহমান কাগজ আর কলম এনে মিঃ জাফরীর সম্মুখে পাথরের টেবিলের উপর রাখলো।
বনহুর আসন ত্যাগ করে উঠে এলো মিঃ জাফরী আর হোসেন সাহেবের সম্মুখে। কঠিন কণ্ঠে বললো বনহুর –লিখুন।
না। মিঃ জাফরীও কঠিন গলায় বললেন–আমি লিখবো না।
কেনো?
আইনে সে অপরাধী।
যত অপরাধই সে করে থাকুক তবু তার যতক্ষণ মুক্তি না হবে ততক্ষণ মুক্তি নাই। আপনাদের।
তাই বলে আইনের বিরুদ্ধে কাজ করবো!
করতে বাধ্য করবো মিঃ জাফরী। রহমান–
সঙ্গে সঙ্গে রহমান রিভলভার চেপে ধরলো মিঃ জাফরীর পাঁজরে।
বনহুর দাঁতে-দাঁত পিষে বললো–মৃত্যু চান না আফগানী সাহেবকে মুক্তি দিতে চান বলুন?
বনহুর কখনও মিঃ জাফরীকে তুমি কখনও ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করছিলো। অবশ্য বিশেষ কোন সময়ে বনহুর তুমি’ শব্দই উচ্চারণ করতো।
বনহুরের কথায় বললেন মিঃ জাফরী–আইনের বিরুদ্ধে কিছুই করবো না আমি।
মরতে তাহলে আপত্তি নেই?
রহমান রিভলভার সরিয়ে নিলো। বনহুর মিঃ জাফরীর কণ্ঠদেশে চেপে ধরলো সূতীক্ষ্ণধার একখানা ছোরা।
একটু চাপ পড়তেই গলাটা চিড় চিড় করে উঠলো। মিঃ জাফরীর বুকের মধ্যে ধক ধক করছে। একবার মিঃ জাফরী তাকালেন মিঃ হোসেনের মুখে।
মিঃ হোসেন চোখের ইংগিতে তাঁকে চিঠিখানা লিখে দিতে বললেন।
মিঃ জাফরী কলমটা তুলে নিলেন হতের মুঠায়। বনহুর স্বয়ং মিঃ জাফরীর হাতের বন্ধন মুক্ত করে দিলো–লিখুন।
মিঃ জাফরী কাগজটা এগিয়ে নিলেন।
বনহুর বলতে লাগলো–লিখুন, আমি এবং মিঃ হোসেন দস্যু বনহুরের হস্তে বন্দী! আমাদের মুক্তির জন্য আফগানী সাহেবের মুক্তি দিতে হবে। আপনি তাকে অচিরে মুক্তি দেবার ব্যবস্থা করুন। একটু থেমে বললো সে–কার কাছে লিখলে আপনার কথা ঠিক থাকবে তারই কাছে লিখুন। পঞ্চাশ হাজার টাকা নয়, বা এক লক্ষ নয়–শুধু আফগানী সাহেবের মুক্তি–
মিঃ জাফরী কিছুক্ষণ চিন্তা করে ঘন ঘন করে লেখলেন, তারপর কাগজটা সরিয়ে রাখলেন এক পাশে। কলমটা এক রকম ছুঁড়েই ফেলে দিলেন টেবিলে।
বনহুর কাগজখানা তুলে নিলো হাতে; চোখের সম্মুখে মেলে ধরলো। হাঁ, বনহুর যা বলেছেন, তাই লিখেছেন মিঃ জাফরী। পুলিশ ইন্সপেক্টার আহম্মদ সাহেবের কাছে লিখেছেন তিনি।
বনহুর চিঠিখানা ভাঁজ করতে করতে বললো–মনে রাখবেন এর মধ্যে কোন চাতুরী খেলবার চেষ্টা করেছেন, কি মরেছেন। যতক্ষণ না আফগানী সাহেব হাজত থেকে মুক্তি লাভ করছেন ততক্ষণ আপনারা আমার বন্দী। মিঃ জাফরী, আপনি আমাকে গ্রেপ্তারের জন্য লক্ষ টাকা ঘোষণা করতেও দ্বিধা বোধ করেননি, জীবিত কিংবা মৃত–যে কোন অবস্থায় আমাকে পেলে, আপনার পুলিশ চাকুরি জীবন আজ সার্থক হতো। কিন্তু সে আশা আপনার সফল হয়নি, গত রাতেই আপনি মতিমহল হলে বসে এ কথা চিস্তি সাহেবের নিকট দুঃখ করে বলেছেন।
একটু থেমে বললো বনহুর–মিঃ জাফরী, আপনি আমাকে যতই শত্রু মনে করেন, আসলে আমি আপনার বন্ধু। আজ ইচ্ছা করলে আপনাকে এবং আপনার সহকারীকে এই মুহূর্তে হত্যা করতে পারি কিন্তু করবো না।
এতোগুলো কথা এক সঙ্গে বলে বনহুর নীরব হলো। রহমান এবং অন্যান্য দস্যুগণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কারো মুখে কোন শব্দ নেই।
