আশ্চর্য এই দস্যু বনহুর!
শুধু আশ্চর্যই নয় চিস্তি সাহেব, আজাকের ছবি দেখুন–সব বুঝতে পারবেন। এমন নিখুঁত অভিনয় করেছে, যেন সত্যি একজন অভিজ্ঞ শিল্পী। দর্শক মনে সে আসন গড়ে নেবার এটা একটা নতুন পন্থা অবলম্বন করেছে–
শো শুরু হবার পূর্বে গোটা হল ঘরের আলো নিভে গেলো।
বৃদ্ধ চিস্তি সাহেব চোখের চশমাটা রুমালে মুছে পুনরায় চোখে পরে নিলেন।
পর্দায় টাইটেল চলছে। সঙ্গে মিউজিকের সুন্দর একটা সুর একটানা বেজে চলেছে।
শো আরম্ভ হবার পূর্ব মুহূর্তে হঠাৎ চিস্তি সাহেব বলে উঠলেন–বুকের মধ্যে কেমন ব্যথা অনুভব করছি।
মিঃ জাফরী বলে উঠেন–খুব কি অসুস্থ বোধ করছেন।
হাঁ, অত্যন্ত বেশি। বুকের মধ্যে কেমন যেন হচ্ছে, নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম– চিস্তি সাহেব ঢলে পড়ে যাচ্ছিলেন, ধরে ফেললেন মিঃ হোসেন।
চিস্তি সাহেব কোঁকিয়ে বললেন–মাঝে মাঝে আমার এই রকম হয়। কিন্তু আজ যেন অত্যন্ত বেশি–মনে করছি–
ওদিকে তখন শো শুরু হয়ে গেছে।
হঠাৎ এই দুর্ঘটনার জন্য মিঃ জাফরী ও মিঃ হোসেন চিন্তিত হলেন। কিন্তু হলের মধ্যে কোন উপায় নেই। চিস্তি সাহেবকে ধরে অতি কষ্টে হলের বাইরে নিয়ে এলেন মিঃ জাফরী এবং মিঃ হোসেন।
আহম্মদ সাহেব একজন সুদক্ষ পুলিশ ইন্সপেক্টার, তাছাড়া মিঃ জাফরীর বন্ধুলোক। এ অবস্থায় তার বৃদ্ধ শ্বশুরকে একা ছেড়ে দেওয়া সম্ভব নয়। আহম্মদ সাহেব কান্দাই এ নাই, তিনি কোন এক কাজে কান্দাই এর বাইরে গেছেন। কাজেই বাসায় ফোন করে কোন ফল হবে না।
ড্রাইভার গাড়ির হ্যান্ডেলে মাথা রেখে ঝিমোচ্ছিলো। মিঃ জাফরী এবং মিঃ হেসেন চিস্তি সাহেবকে নিয়ে গাড়ির পাশে এসে দাঁড়ালেন পাহারারত কয়েকজন পুলিশ এগিয়ে এসেছে। ইন্সপেক্টার সাহেবদ্বয়কে সহায়তা করতে।
ড্রাইভারও নেমে পড়লো গাড়ি থেকে, হঠাৎ কিছু বুঝে উঠতে পারলোনা সে।
মিঃ জাফরী এবং মিঃ হোসেন মিঃ চিস্তি সাহেবকে পুলিশদের সহায়তায় গাড়িতে উঠিয়ে নিলেন।
অতি সাবধানে পিছনের আসনে চিস্তি সাহেবকে শুইয়ে দিয়ে মিঃ জাফরী এবং মিঃ হোসেন উঠে বসলেন।
মিঃ জাফরী চিস্তি সাহেবের মাথার নিকটে বসে বললেন– এখন কি খুব অসুস্থ বোধ করছেন?
হাত নেড়ে বললেন চিস্তি সাহেব, তিনি কথা বলতে পারছেন না।
কাজেই আর কেউ চিস্তি সাহেবকে বিরক্ত না করে নীরব রইলেন।
মিঃ হোসেন বললেন–ড্রাইভার, কান্দাই হসপিটালে চলো!
গাড়িতে স্টার্ট দিলো ড্রাইভার।
গাড়ির দুই পাশে পুলিশ ফোর্স স্যালুট করে দাঁড়ালো।
মিঃ জাফরীর মনে সদা আশঙ্কা হচ্ছে–বেচারী বুড়ো মানুষ চিস্তি সাহেব হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছেন, হসপিটাল পর্যন্ত পৌঁছতে সক্ষম হবেন কিনা সন্দেহ।
হঠাৎ যদি মন্দ কিছু হয়ে পড়ে তাহলে বন্ধুবর আহম্মদ সাহেবের নিকটে কি জবাব দেবেন। তাদের সম্মুখে তার শ্বশুর এ অবস্থা হয়েছিলো, অথচ ঠিকমত চিকিৎসা হয়নি। কাজেই মিঃ জাফরী স্বয়ং চললেন তার জরুরি কাজ ফেলে।
গাড়ি অত্যন্ত স্পীডে ছুটে চলেছে।
কান্দাই শহরের হসপিটাল শহরের প্রায় শেষপ্রান্তে, একটা নির্জন সুউচ্চ স্থানে। স্থানটা অত্যন্ত মনোরম এবং নীরব-নির্জন শহরের কর্ম-কোলাহলের বাইরে। কোন যানবাহন বা কলকারখানার শব্দ কান্দাই হসপিটালের রোগীদের অসুস্থ মনকে আরও অশান্ত করে তোলেনা।
কাজেই এ পথটা অত্যন্ত নির্জন নিরিবিলি।
মিঃ জাফরী, মিঃ হোসেন ও চিস্তি সাহেবসহ গাড়ির মধ্যে বসে আছেন। ড্রাইভার তাদের অভিজ্ঞ লোক, পুলিশ হাওলাদার সে!
হসপিটাল অভিমুখে উল্কবেগে গাড়ি ছুটে চলেছে। মাঝে মাঝে পাশ কেটে চলে যাচ্ছে দু’একটা প্রাইভেট কার বা ভাড়াটে গাড়ী।
কিছুক্ষণ চলার পর হঠাৎ গাড়িখানা বাঁক ঘুরে দক্ষিণ দিকে এগিয়ে চললো। এ পথ অত্যন্ত নিরিবিলি, শহরের কোন গাড়িই সহসা এ পথে চলেনা।
এতো স্পীডে গাড়িখানাকে চলতে দেখে মিঃ জাফরীর চমক ভাঙলো। মিঃ জাফরী কোন কথা বলবার পূর্বেই গাড়িখানা থেমে পড়লো আশ্চর্যভাবে। সঙ্গে সঙ্গে জনাব চিস্তি সাহেব মিঃ জাফরীর বুকে রিভলভার চেপে ধরেন, চাপা কণ্ঠে বললেন–একটু নড়েছেন অমনি সঙ্গে সঙ্গে মরবেন।
ড্রাইভার নিজের আসনের পাশে মিঃ হোসেনের বুকে আর একটি রিভলভার চেপে ধরেছে।
আচমকা এমন একটা ঘটনা ভাবতেও পারেননি মিঃ জাফরী এবং মিঃ হোসেন।
আজীবন মিঃ জাফরী পুলিশের চাকুরি করে আসছেন–তার মত দক্ষ ইন্সপেক্টর কমই আছেন! কিন্তু আজকের মত এমন অবস্থায় তিনি কখনও পড়েননি।
মিঃ জাফরী কোন দিন কাউকে স্বাভাবিকভাবে বিশ্বাস করতেন না। অপরিচিত এবং আত্মীয়-স্বজন ছাড়া কারো সঙ্গে তিনি কোথাও কোনদিন যেতেন না বা কারো দাওয়াত গ্রহণ করতেন না।
হঠাৎ আহম্মদ সাহেবের শ্বশুর প্রবীণ ব্যক্তি অকস্মাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছেন ভেবে তাঁকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন, ভুলে গিয়েছিলেন অন্য কোন কথা।
মিঃ জাফরী কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লেন যেন। মিঃ হোসেন সাহেবের অবস্থাও অত্যন্ত শোচনীয় হয়ে পড়েছে। ড্রাইভার তার কণ্ঠদেশে রিভলভার চেপে ধরেছে ভীষণভাবে।
এদিকে মিঃ জাফরীর পাঁজরে চিস্তি সাহেব রিভলভার চেপে ধরে একটা বাঁশিতে ফুঁ দিলেন।
সঙ্গে সঙ্গে কয়েজন বলিষ্ঠ লোক বেরিয়ে এলো পথপার্শ্বের ঝোপ-ঝাড়ের মধ্য থেকে।
চিস্তি সাহেবের ইংগিতে লোকগুলি মজবুত দড়ি দিয়ে পিছমোড়া করে বেঁধে ফেললো মিঃ জাফরী এবং মিঃ হোসেনকে।
