হাঁ সর্দার, কিন্তু আজও চলবে। কারণ আজ মিঃ জাফরী তার দলবল নিয়ে ছবি দেখবেন। এবং সমস্ত দর্শক মন্ডলির সম্মুখে ছবিটা বিনষ্ট করা হবে।
এতো খবর সংগ্রহ করলে কেমন করে তোমরা?
সর্দার, মহসীন কৌশলে এ সব সংবাদ সংগ্রহ করেছে।
বেশ, আজ আমিও যাবো মতি মহল হলে ছবি দেখতে।
মহসীন, তুমি অগ্রিম টিকিট ক্রয় করে রাখবে, এবং ঠিক্ মিঃ জাফরীর পাশেই যেন আমার সিট হয়।
জী সর্দার।
এবার বনহুর নিজ মনে বলে উঠলো–মিঃ জাফরীর সঙ্গে আমার মোকাবেলা হবে। শোন রহমান, তুমি আর কায়েস আমার কুইন গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করবে পুলিশ অফিসের অদূরে পথে। আজই আফগানী সাহেবকেও মুক্ত করে আনবো।
বনহুর আসন ত্যাগ করে উঠে দাঁড়ালো।
অন্যান্য অনুচরগণ কুর্ণিশ জানালো নত মস্তকে।
বনহুর দরবার কক্ষ ত্যাগ করলো।
*
পুলিশ অফিসের হাজত কক্ষে বন্দী আফগানী সাহেব। ভদ্রলোক অত্যন্ত অমায়িক এবং মহৎ লোক। দেশবাসীগণ তাঁর নিকটে যথেষ্ট উপকৃত। দস্যু বনহুরও অনেক সময় এর নিকটে অনেক ব্যাপারে সাহায্য পেয়েছে–অবশ্য দস্যু হিসাবে নয়, বন্ধু হিসাবে।
বনহুর যখন সর্বপ্রথম মনিরার সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলো তখন একদিন নাথুরামের সঙ্গে সংঘর্ষ ব্যাপারে কয়েকখানা গাড়ির প্রয়োজন হয়েছিলো; তখন আফগানী সাহেব বিনা দ্বিধায় কয়টি গাড়ি দিয়েছিলেন তাকে।
বহু দিনের কথা হলেও আজও বনহুর ভোলেনি তার উপকারের কথা।
সেদিন বনহুর এক ভদ্র নাগরিকের বেশেই আফগানী সাহেবের নিকটে গমন করেছিলো মিথ্যা এক পরিচয় দিয়ে তার কাছে কয়েকটা গাড়ি সাহায্য চেয়েছিলো। আফগানী সাহেব সেদিন বনহুরকে গাড়ি না দিলেও বলবার কিছু ছিলনা। কারণ, ইতিপূর্বে আফগানী সাহেব কোনদিন তাকে দেখেন নাই বা তার সঙ্গে কোন রকম আলাপ ছিলো না।
আফগানী সাহেবের মহৎ হৃদয়ের পরিচয় পেয়ে সেদিন দস্যু বনহুর শুধু মুগ্ধই হয়েছিলো না, কৃতজ্ঞও হয়েছিলো সেদিন সে।
আজ সেই আফগানী সাহেব বিনা অপরাধে হজত কক্ষে পচে মরছেন।
কথাটা বনহুরের মনে দারুণ আঘাত করেছিলো। একটা ব্যথার ছোঁয়া খোঁচা দিয়েছিলো তার মনের কোণে।
অগণিত দর্শক মতিমহল হলের সম্মুখে ভীড় জমিয়ে দিয়েছে। অসংখ্য গাড়ি থেমে আছে হলের পাশে। আজ শহর এবং দূর অঞ্চলের জনগণ অনেকেই এসেছে কারণ আজ কুন্তি বাঈ ছবির শেষ শো। তাছাড়া বিজ্ঞপ্তির মধ্যে একথাও প্রচার করা হয়েছে আজকের শো শেষ হবার পর এ ফিলম নষ্ট করে ফেলা হবে।
এ কারণেই দর্শক মহলে একটা বিপুল আগ্রহ জেগেছে।
থেমে থাকা অসংখ্য গাড়ির পাশে এসে দাঁড়ালো একটা নতুন ঝকঝকে কুইন গাড়ি।
একটু আগে যে গাড়িখানা এসে দাঁড়িয়েছে, সে গাড়ি থেকে নামলেন পুলিশ ইন্সপেক্টার মিঃ জাফরী ও তার সহকারী মিঃ হোসেন। মিঃ জাফরী এবং মিঃ হোসেন যখন হলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন; ঠিক সেই মুহূর্তে কুইন গাড়ি এসে থামলো। গাড়ির মধ্যে থেকে নেমে এলেন শুভ্রকেশ, মুখে শুভ্র দাড়ি, চোখে চশমা, দেহটা অর্ধ নূয়ে পড়া এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক। লোকটিকে দেখলেই শ্রদ্ধা করতে ইচ্ছা হয়। কোন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি–আভিজাত্যের ছাপ স্পষ্ট ফুটে রয়েছে তার চোখে-মুখে।
দক্ষিণ হস্তে মূল্যবান একখানা ছড়ি।
ছড়ির বাটে রূপার কারুকার্য করা। বাটের মাথাটা ব্যাঘ্ৰ মুখাকারে তৈরি। ব্যাঘের চোখ দুটিতে উজ্জ্বল পাথর বসানো।
প্রবীণ ব্যক্তি ছড়িতে ভর দিয়ে এগুলেন, দক্ষিণ হাতখানা মৃদু মৃদু কাঁপছে।
হলে প্রবেশ করে মিঃ জাফরীর আসনের পাশে এসে বসলেন। মিঃ জাফরীর অপর পাশে মিঃ হোসেন বসেছেন।
শো শুরু হবার এখনও কিছু বাকি আছে।
গোটা হলঘর নীলাভ আলোতে আলোকিত।
মিঃ জাফরীকে লক্ষ্য করে বললেন বৃদ্ধ ভদ্রলোক–আদাব ইন্সপেক্টার সাহেব।
মিঃ জাফরী একটু আশ্চর্য হলেন, স্মরণ করতে চেষ্টা করলেন–কে এই বৃদ্ধ ভদ্রলোক। কোথায় যেন দেখেছেন, কিন্তু মনে করতে পারছেন না।
হাসলেন বৃদ্ধ ভদ্রলোক আমাকে চিনতে পারছেন না ইন্সপেক্টর!
এমন সময় মিঃ হোসেন বলে উঠলেন–উনি ইন্সপেক্টার আহম্মদ সাহেবের শ্বশুর সাহেব–
মিঃ হোসেন বৃদ্ধ ভদ্রলোকের নাম বলতে ইতস্ততঃ করছেন দেখে উনি নিজেই বললেন– আমার নাম, আবুল কাসেম মোহাম্মদ চিস্তি।
ওঃ এবার মনে পড়েছে। মিঃ জাফরী উঠে তার সঙ্গে হ্যান্ডসেক করলেন।
মিঃ হোসেনও হ্যান্ডসেক করলেন চিস্তি সাহেবের সঙ্গে।
মিঃ জাফরী আসন গ্রহণ করে বললেন–বহুকাল আগের দেখা তো, কেমন যে ভুলে গিয়েছিলাম–মাফ করবেন।
না না, এটা এমন কি ব্যাপার, অমন হয়েই থাকে।
মিঃ জাফরী ঠিক হয়ে বসে বললেন–আপনি কবে এসেছেন কান্দাই শহরে?
গত পরশু সন্ধ্যার ট্রেনে।
আজও আপনার দেশের কথা ভুলতে পারিনি চিস্তি সাহেব, সত্যি বড় মনোরম দেশ–মন্দরা নামের ঠিক উল্টো। ওখান থেকে ফিরেই চলে এসেছি কান্দাই এ।
হাঁ, আমি আহম্মদের মুখে শুনেছিলাম, কান্দাই এ আপনি স্ব ইচ্ছায় আগমন করেছেন। দস্যু বনহুরকে গ্রেপ্তারের জন্যই নাকি আপনার কান্দাই আগমন হয়েছিলো।
জি হাঁ, দস্যু বনহুরই আমার কান্দাই আগমনের মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু আজও আমি সাফল্য লাভে সক্ষম হইনি। একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করেন মিঃ জাফরী।
প্রবীণ ব্যক্তি একটু হেসে বললেন–সুচতুর দস্যু তাহলে আপনাকে বেশ নাজেহাল করে ছাড়ছে?
হাঁ, বলতে লজ্জা নাই–শয়তান শুধু আমাকেই নয় সমস্ত পুলিশ মহলের চোখে ঘুলি লাগিয়ে ছেড়েছে। আজকের ছবি দেখলেই বুঝতে পারবেন দস্যু এখন লোক সমাজে মিশে চিত্রনায়ক হয়েছে।
