মনিকে নিয়ে আস্তনার সবাই খুশিতে আত্মহারা।
কিন্তু সবাই জানে–শিশুটিকে তাদের সর্দার একদিন কোন গহন বন থেকে কুড়িয়ে এনে নূরীকে দিয়েছিলো, সেই থেকে নূরী তাকে নিজ সন্তানের মত লালন করছিলো, তারপর একদিন সেই শিশু মনি কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলো। নূরী সদা-সর্বদা কাদা-কাটা করতো মনির জন্য। কিন্তু হঠাৎ তাদের সর্দার আবার একদিন সেই মনিকে কোথা থেকে এনে দিলো নূরীর কোলে।
কেউ না জানলেও জানে রহমান-মনি কে? কি তার আসল পরিচয়।
সময় সময় বনহুর মনিকে নিয়ে আদর করতো। নরম তুলতুলে গালে মৃদু চাপ দিয়ে বলতো…বাপি…
কোন কোন দিন তুলে নিতো কোলে, সকলের অলক্ষ্যে ছোট্ট একটি চুমু এঁকে দিতো ওর গালে।
এমনি একদিন মনি খেলা করছিলো একটা গাছের তলায় একটা ছোট্ট হরিণ শিশু নিয়ে। বার বার তার গলায় জড়িয়ে ধরে মাটিতে ফেলে দিচ্ছিলো।
বনহুর দূর থেকে দেখতে পেলো, এগিয়ে এলো মনির পাশে।
মনি তখনও বনহুরকে দেখতে পায়নি, সে আপন মনে খেলা করছিলো।
বনহুর তস্ময় হয়ে দেখছিলো মনি আর হরিণ শিশুর অদ্ভুত খেলা।
হরিণ শিশুর পিঠে চেপে বসতে গিয়ে হঠাৎ ভূতলে পড়ে গেলো মনি।
সঙ্গে সঙ্গে বনহুর তুলে নিলো মনিকে হাতের উপর।
মনি কেঁদে উঠেই বনহুরকে দেখে চুপ হয়ে গেলো।
বনহুর আদর দিয়ে বললো–একটুও লাগেনি, তাই না বাপি…চুমু দিলো মনির ছোট্ট মুখে।
মনি খুব খুশি না হলেও বনহুরের কোলে গিয়ে চুপ হয়ে গিয়েছিলো।
বনহুর যখন মনিকে আদর দিচ্ছিলো তখন নূরী পা টিপে টিপে এসে দাঁড়ালো একটা গাছের আড়ালে। উঁকি দিয়ে দেখতে লাগলো সে। বনহুর কোন দিন স্ব-ইচ্ছায় মনিকে আদর করেনি নূরীর সম্মুখে। কতদিন এ নিয়ে বনহুরের সঙ্গে রাগারাগি করেছে, আর আজ বনহুরকে মনির সঙ্গে দেখে শুধু খুশিই হলোনা, আনন্দে আত্মহারা হলো।
বনহুর মনির ললাটে চুমু দিয়ে বললো–আমি তোমার কে বলো মনি?
মনি হঠাৎ দেখে ফেলে নূরীকে। বনহুরের কোলে গিয়ে একটু বিব্রত বোধ করছিলো, নূরীকে দেখে মুখখানা হাসিতে ভরে উঠলো।
বনহুর তখন পুনরায় বললো–আমি তোমার কে বললা–বলো….বলো আমি তোমার বাপি!
বনহুর মনিকে চেপে ধরলো বুকে।
নূরী আড়াল থেকে সব দেখলো, খুশিতে ভরে উঠলো ওর মন। চঞ্চল পদক্ষেপে এগিয়ে এলো বনহুর আর মনির পাশে। খিল খিল করে হেসে লুটোপুটি খেতে লাগলো।
বনহুর হঠাৎ নূরীর আগমনে একটু হতভম্ব হয়ে পড়েছিলো। মনিকে কোল থেকে নামিয়ে দিয়ে বললো–যাও মনি।
নূরী বললো–তুমি যদি বাপি হও, আমি কে?
বনহুর মনির মুখের কাছে মুখ নিয়ে বললো–বলোতো মনি, ও তোমার কে?
মনি এক গাল হেসে বলে উঠলো–মাম্মি…
বনহুর হঠাৎ গম্ভীর হয়ে পড়লো।
নূরী মনিকে বুকে তুলে নিয়ে হাসিতে ফেটে পড়লো–দেখো মনি ঠিক বলেছে।
বনহুর আর নূরী যখন মনিকে নিয়ে আনন্দে আত্মহারা–এ কথা সে কথা নিয়ে খুশির ফুলঝুরি ঝরে পড়েছিলো তাদের মনে, ঠিক সেই সময় রহমান আর মহসীন এসে কুর্নিশ জানালো।
বনহুর ফিরে তাকালো রহমানের মুখে–কি খবর রহমান?
রহমান বললো–সর্দার, একবার দরবার কক্ষে আসুন, কথা আছে।
চলো। বনহুর দরবার কক্ষের দিকে এগুলো।
রহমান আর মহসীন অনুসরণ করলো তাকে।
ভূগর্ভে পাথর খোদাই করা একটা বৃহৎ কক্ষ। গভীর অন্ধকারে কক্ষটা সদা অন্ধকার। কিন্তু মশালের আলোতে আলোকিত করা হয়েছে কক্ষটাকে। কক্ষের দেয়ালে অসংখ্য অস্ত্র-সস্ত্র ঝোলানো রয়েছে।
কক্ষের দরজায় দু’জন পাহারাদার দন্ডায়মান। তাদের শরীরে জমকালো পোশাক, মাথায়। জমকালো পাগড়ি। ভয়ঙ্কর চেহারা, হাতে রাইফেল।
বনহুর কক্ষে প্রবেশ করতেই অন্যান্য দস্যুগণ কুর্ণিশ জানালো।
বনহুর এসে বসলো তার পাথরাসনে।
রহমান আর মহসীন দাঁড়ালো সম্মুখে।
বনহুর গম্ভীর কণ্ঠে বললো–কি খবর বলো?
রহমান ইংগিত করলো মহসীনকে বলতে।
মহসীন একটু কেশে গলাটা পরিস্কার করে নিলো। যত সাহসীই হোকনা কেনো সর্দারের সম্মুখে দাঁড়িয়ে কথা বলতে তাদের একটু কেমন যেন লাগতো।
বললো মহসীন–সর্দার, মতি মহল হলের মালিককে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।
মতি মহল হলের মালিক আফগানী সাহেবকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে?
হাঁ, সর্দার।
তার অপরাধ?
অপরাধ ‘কুন্তিবাঈ’ ছবি তার হলে চালানোর দরুণ–
‘কুন্তিবাঈ’ ছবি।
হাঁ সর্দার। ‘কুন্তিবাঈ’ ছবির ফিলম সম্পূর্ণ আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলার আদেশ দেওয়া সত্বেও আফগানী সাহেব তার হলে ছবি চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কারণ এ ছবিতে দর্শকের এতো ভীড় জীবনে। তার হলে কোন ছবিতে হয়নি।
রহমান বললো এবার দর্শক মহলে ছবিটা যেমন সুখ্যাতি অর্জন করেছিলো, তেমনি পুলিশ মহলে সৃষ্টি করেছিলো আলোড়ন। শুধু আলোড়নই নয়–তাদের মনে জাগিয়েছিলো ভীষণ চাঞ্চল্য।
হুঁ, তারপর?
সর্দার, এ ছবির হিরো দস্যু বনহুর–এটাই ছিলো দর্শক মনে এক প্রচন্ড উন্মাদনা। মিঃ জাফরী এটা আবিস্কার করেছিলেন সর্বপ্রথম এবং তিনিই সমস্ত শহর অঞ্চলে ও বিভিন্ন নগরে দস্যু বনহুরের আগমন ঘোষণা করে তাকে গ্রেপ্তারের জন্য তোড়জোড় শুরু করে দিয়েছিলেন। কিন্তু এতে মতিমহল হলে দর্শকের ভীড় বেড়ে গিয়েছিল চরম আকারে। দেশের জনগণ সবাই চায় অন্ততঃ দস্যু বনহুরকে একটিবার দেখতে। কাজেই মালিক আফগানী সাহেব ছবিটা চট করে বন্ধ করতে পারেননি–এটাই হলো তাঁর অপরাধ।
বনহুর বললো–ছবিটা কি বন্ধ হয়ে গেছে?
