সত্যি বলছো?
হাঁ, সত্যি মনিরা।
কিন্তু…
আর কিন্তু নয়। মনিরা, তুমি না বলেছিলে ছবি দেখতে যাবে?
যাবো না।
কেনো?
দেখেছি।
ও!
একটা কথা তুমি আমায় সত্যি করে বলবে?
বলো?
তুমি দস্যুবৃত্তি ছেড়ে অভিনয় শুরু করেছো?
বিস্ময় ভরা চোখে তাকায় বনহুর মনিরার মুখের দিকে–অভিনয়। কে বললো আমি অভিনয় শুরু করেছি?
–আমি নিজের চোখে দেখেছি, তুমি অস্বীকার করতে পারো না। বললো মনিরা।
মনিরার কথায় বনহুর বুঝতে পারলো, কুন্তি বাঈ’ ছবিটাই সে দেখেছে এবং সেই কারণেই মনিরা ভিতরে ভিতরে রাগান্বিত হয়ে পড়ছিলো। মনিরার সঙ্গে বনহুর যত কঠিন ব্যবহার করুক না কেনো, আসলে মনিরাই বনহুরের বাস্তবের রাণী। মনিরার মুখে হাসি ফুটলে এতটুকু শান্তি পায়না বনহুর মনে।
মনিরা বনহুরকে নীরব থাকতে দেখে বললো আবার–আমার কাছে লুকাতে চেষ্ট করোনা, আর কেউ তোমাকে না চিনলেও আমার চোখে ধুলো দিতে পারবে না। বলো–ছবির নায়িকা কে? ওর সঙ্গে তোমার সম্বন্ধ কি? বলো–জবাব দাও?
আজ বনহুরের কাছে সব স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠলো। মনিরার যত রাগ অভিমান সব ঐ কারণেই, এবার বুঝতে পারলো সে। হেসে বললো–তাই বুঝি সেদিন তুমি আমায় বিমুখ করে ফিরিয়ে দিয়েছিলে?
মাথা নত করলো মনিরা।
বনহুর বুঝতে পারলো, তার অনুমান মিথ্যা নয়। মনিরাকে টেনে নিলো কাছে, দক্ষিণ হাত দিয়ে মুখটা তুলে ধরে বললো–তুমি অহেতুক অভিমান করছো মনিরা। অভিনয়, অভিনয়ই…
তাহলে ‘কুন্তি বাঈ’ ছবির হিরো তুমি?
যদিও মনিরাও নিঃসন্দেহে জানে–কুন্তি বাঈ ছবির হিরো তার স্বামী, তবু আবার স্বামীর মুখে শুনতে চায় সে।
মনিরার কথায় বললো বনহুর–তুমি যা দেখেছো সত্যি। কুন্তি বাঈ’ ছবির হিরো স্বয়ং দস্যু বনহুর।
বললো মনিরা–আর হিরোইন?
মিস্ জ্যোছনা রায়। ওর সঙ্গে আমার সম্বন্ধ শুধু সুটিংকালে, তারপর নয়…কিন্তু মিস্ জ্যোছনা রায় আজ বেঁচে নেই–সে মৃত।
আশ্চর্য দৃষ্টি মেলে তাকালো মনিরা বনহুরের চোখের দিকে। বললো সে–মিস জ্যোছনা রায় বেঁচে নেই?
না। বনহুর ক্ষণিকের জন্য আনমনা হয়ে গেলো। উদাস কণ্ঠে বললো–জ্যোছনা রায়ের মৃত্যুর কারণ আমিই মনিরা।
তুমি? হ্যাঁ আমি। বেচারী সুটিং-এর ফাঁকে কখন যে আমাকে ভালবেসে ফেলেছিলো, সে-ই জানে। তুমিই তাকে হত্যা করেছিলে?
না, আমি নই…আচ্ছা বলবো আর একদিন, সে এক মস্ত কাহিনী। একটা দীর্ঘশ্বাস গোপনে চেপে যায় বনহুর। মিস জ্যোছনা রায়ের স্মৃতি যে আজও বনহুরের মনে এতোটুকু আলোড়ন জাগায় না, তা নয়। বেচারী জ্যোছনা রায়…
মরিয়ম বেগম ইচ্ছা করেই বিলম্ব করছিলেন, ঘরে তার দুধ ছানা-ফিরনী তৈরীই ছিলো তবু তিনি এগুলো আনতে বেশ বিলম্ব করলেন।
মরিয়ম বেগম একটু কেশে কক্ষে প্রবেশ করলেন–মা মনিরা, ওকে একটু খেতে দাও।
বনহুরের পাশ থেকে সরে দাঁড়ালো মনিরা, তারপর মামীমার হাত থেকে খাবারের ট্রে নিয়ে। বনহুরের সম্মুখে টেবিলে রাখলো।
মরিয়ম বেগম বললেন–মিটকেসটা বন্ধ না করেই চলে এসেছি। যা বিড়ালের উপদ্রব…
মরিয়ম বেগম বেরিয়ে গেলেন।
বনহুর বুঝতে না পারলেও, মনিরা বুঝতে পারলো–মিটকেস বন্ধ করা–এটা একটা ছলনা মাত্র; কেমন করে মরিয়ম বেগম পালাবেন, তাই এতো কথা। মনিরা মামীমার অভিনয় দেখে হাসলো।
বনহুর বললো–হঠাৎ অমন করে হাসলে কেননা মনিরা?
মামীমার অভিনয় দেখে।
বিস্ময় ভরা চোখে তাকিয়ে বললো বনহুর–অভিনয়?
হাঁ দেখলে না, মামীমা আমাদের সুযোগ দিয়ে মিছামিছি বললেন–মিটকেস খুলে রেখে এসেছি, বিড়ালের যা উপদ্ৰব…
মনিরা হেসে উঠলো, বনহুরও তার হাসিতে যোগ দিলো।
বললো মনিরা–নাও, এবার খাও দেখি।
এতো রাতে খাবার খাওয়া ঠিক হবে?
মায়ের হাতের তৈরি জিনিসে কোন দোষ নেই।
না, তা বলছি না, বলছি পেট ভর্তি রয়েছে।
তা জানি, তোমার পেট ভর্তি রয়েছে।
তা জানি, তোমার পেট কত যে ভর্তি থাকে সে কথা আমাকে বলতে হবে না। নাও, খাও তো।
তবে দাও, কিন্তু আমাকে উঠিয়ে খাইয়ে দিতে হবে…
হা করে বনহুর।
মনিরা স্বামীর মুখে খাবার তুলে দেয়।
*
দোলনায় নয়–ঝুলনায় বসিয়ে দোল দিচ্ছিলো মনিকে নূরী। আর সুন্দর একটা গান গাইছিলো সে–
আমার মনি দোলে, দোলকুমারীর কোলে…
আমার মনি দোলে…
মনির মুখেও হাসি ফুটে উঠেছে, ছোট্ট কচি শিশু মায়ের জন্য প্রথম প্রথম কাদাকাটা করলেও এখন আর তেমন করে না। মাঝে মাঝে বলে–মাল কাছে দাবো, আমি মাল কাছে দাবো…
কিন্তু নূরীর আদরের বন্যায় ভেসে যায় সব। মনিকে কখনও কোলে, কখনও পিঠে, কখনও কাঁধে নূরী ঘুরে বেড়ায় বন হতে বনান্তরে। পাহাড়িয়া ঝরণার মত চঞ্চল নূরী মনিকে পেয়ে আরও উন্মত্ত হয়ে উঠে। তার বহু দিনের হারানো ধন যেন ফিরে পেয়েছে।
মনির সুন্দর নধর দেহ, মাথায় কোঁকড়ানো চুল। সুন্দর দুটি চোখ, ফুলের হাসি ঠোঁটের কোণে, অপূর্ব সুন্দর চেহারা। ওকে দেখলেই কোলে নিতে ইচ্ছে করে, আদর দেবার জন্য মন লালায়িত হয়। মনি সুন্দর হবে না কেনো, পিতা স্বয়ং দস্যু বনহুর, মা অপূর্ব সুন্দরী মনিরা কাজেই তাদের সন্তান সুন্দর হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।
শুধু নূরীই নয়, বনহুরের আস্তানার সবাই মনিকে ভালবাসে, স্নেহ করে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি আদর করে রহমান, ‘ছোট সর্দার’ বলে ডাকে ওকে।
মাঝে মাঝে মনিকে কোলে করে ঘুরে বেড়ায় রহমান। ঘোড়ার পিঠে তুলে দিয়ে আনন্দ দেয় ওকে।
