মায়ের কথায় বনহুর যেন হতভম্ব হয়ে পড়লো। দস্যু হলেও মায়ের কাছে সে অবোধ বালকের মত। ম্লান মুখে বললো–মা, জানি তোমরা সবাই আমাকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছো।
আমরা নই–তুই, ওরে তুই সবাইকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছিস। নিষ্ঠুর সন্তান! আজ যে কথাগুলি মনিরাকে বললি, কোনো স্বামী পারবে তার স্ত্রীকে বলতে?
বনহুর এবার বুঝতে পারলো, তার মা পাশের কক্ষ থেকে তার এবং মনিরার সব কথাই শুনেছেন, সেই কারণেই তিনি এতো রাগান্বিত হয়েছেন। বনহুর মায়ের কথায় কোন জবাব না দিয়ে মাথা নত করলো।
মরিয়ম বেগম আরও কয়েক পা এগিয়ে এলেন পুত্রের দিকে–কোন নারী পারে তার স্বামী কিংবা পুত্রকে ত্যাগ করতে? তোর কি হৃদয় বলে কোন জিনিষ নেই?
বনহুর তার মায়ের সম্মুখে অসহায়ের মত দুর্বল হয়ে পড়লো। করুণ কণ্ঠে বললো–মা, আমি অপরাধী…তুমি আমাকে ক্ষমা করো।
বল আর কোনদিন মনিরার সম্মুখে ঐ কথা বলবি না!
কোন্ কথা মা? বনহুর না বুঝার ভান করে।
মরিয়ম বেগম পুনরায় তীব্রকণ্ঠে বলে উঠলেন–যে কথা একটু পূর্বে তুই ওকে বলছিলি।
ও! কিন্তু তুমিই বলো মা, আমি এখানে আসি ক্ষণিকের জন্য আনন্দ উপভোগ করতে। অল্পক্ষণের জন্য ভুলতে চাই আমি আমার জীবনের সমস্ত সত্তাকে। তোমাদের মধ্যে আমি নিজকে ডুবিয়ে রাখতে চাই…কিন্তু আমি যদি এখানে এসেও এতোটুকু স্বস্তি না পাই, তাহলে…কি হবে। বলো এসে?
মনির!
হাঁ, যখনই আমি আসবো, তোমার মনিরা শুধু তার সন্তানের কথা নিয়েই আত্মহারা থাকবে–এ আমি চাইনা।
বনহুরের কথায় মনিরা প্রস্তর মূর্তির মত দাঁড়িয়ে রইলো। মরিয়ম বেগমের মুখ দিয়েও কোন কথা বের হলোনা, তিনিও নিশ্চুপ শুনতে লাগলেন।
বনহুর আবার বলতে শুরু করলো-নূর হারিয়ে গেছে, বিলাপ করে কি হবে বলো? যদি সে বেঁচে থাকে–একদিন ফিরে আসবে।
তাই বলে তার সন্ধান করবোনা আমরা? তুমি পিতা হয়ে এ কথা বলতে পারলে? বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বললো মনিরা।
বেশ, তাহলে তোমরা নূরের সন্ধানেই থাকো, আমি যাই। বনহুর চলে যাবার জন্য পা বাড়ালো।
মরিয়ম বেগম বলে উঠলো–যাবি বলেই যাওয়া হলো, মনিরা তোর কেউ নয়?
থমকে দাঁড়ালো বনহুর, ফিরে তাকিয়ে বললো–আমি তো ওকে অস্বীকার করিনি। ওকে খুশি করবার জন্যই চলে যাচ্ছি।
তুই চলে গেলে ও খুশি হবে?
হাঁ, আমি নূরকে খুঁজতেই যাচ্ছি। যদি ওকে পাই, ফিরে আসবো, নচেৎ নয়।
মনিরার চোখ-মুখ কেমন যেন ভাবাপন্ন হয়ে উঠলো। গভীর একটা চিন্তার ছাপ ফুটে উঠলো তার ললাটে। নূরকে কোন অজ্ঞাত চোর চুরি করে নিয়ে গেছে কে জানে, কোথায় পাবে তার। সন্ধান সে। যদি নূরকে না পায় তাহলে আর কোনদিন ফিরে আসবেনা তার স্বামী। না না, সব সে ত্যাগ করতে পারবে, নূরের স্মৃতিও ভুলতে পারবে–ভুলতে পারবেনা তবু সে স্বামীকে।
মরিয়ম বেগম রাগে ক্ষোভে অধর দংশন করছিলেন। এ কি কথা বলছে তার মনির। নূরকে খুঁজে না পেলে আর সে ফিরে আসবে না। এতো বড় পাষন্ড সে! মরিয়ম বেগম বলে উঠলেন– কি বললি, নূরকে না পেলে আর আসবিনা!
না। এসে শুধু অশ্রু আর কান্না দেখবো?
তুই বাপ না কশাই…
মা…
অবাধ্য সন্তান কোথাকার!
অবাধ্য আমি নই মা। তোমার কথা রাখতে গিয়েই আজ আমি মায়ার জালে জড়িয়ে পড়েছি। বিয়ে করেছি মনিরাকে!
শুধু তাই নয়, তুই আজ সন্তানের পিতা। পিতা হয়ে তোর সন্তানের প্রতি এতটুকু দরদ নেই?
দরদ…হাঃ হাঃ হাঃ…অদ্ভুতভাবে হেসে উঠলো বনহুর, হাঃ হাঃ হাঃ..হাঃ হাঃ হাঃ…
মরিয়ম বেগম আর মনিরা অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলো বনহুরের মুখের দিকে। মরিয়ম বেগম পুত্রকে কোনদিন এভাবে হাসতে দেখেন নাই–তিনি হতভম্ব হয়ে চেয়ে আছেন।
বনহুর হাসি থামিয়ে বললো-বন্ধনহীন উল্কা আমি। আমাকে তোমরা মায়ার বন্ধনে আবদ্ধ করে রাখতে পারবে না। দস্যু বনহুর কোনদিন দরদ বলে কোন জিনিষ জানে না।
মরিয়ম বেগম দু’চোখ ছানাবড়া করে বললেন–মনির, তুই এতো বড় পাষন্ড! নির্দয়…হৃদয়হীন…
তার চেয়েও বেশি।
আমি মা হয়ে তোকে পুলিশে দেবো, তোকে গ্রেফতার করিয়ে দেবো।
তোমার সন্তান হাসিমুখে মায়ের দান গ্রহণ করতে প্রস্তুত আছে।
ওরে আমি তাই পারবো–তোকে পুলিশের হাতে সঁপে দিয়ে আমি নিশ্চিন্ত থাকতে পারবো..বনহুরকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরেন মরিয়ম বেগম–আমাকে ছেড়ে আর তুই যাসনে বাপ…
বনহুরের চোখ দুটো অশ্রু ছল ছল হয়ে উঠলো। সেও মাকে বুকে আঁকড়ে ধরে বললো মা, তোমাকে একদিন বলেছি, তোমার সন্তান যেখানেই থাক তোমার থাকবে। যখন তুমি ডাকবে তখনই তুমি পাবে…
কিন্তু কই তোকে পাই বলতো? কত দিন তোকে না দেখে কেঁদে কেঁদে আমার চোখের দৃষ্টি নষ্ট হয়ে গেছে, তবু তোকে পাইনি।
বনহুর এবার ম্লান হাসি হাসলো, বললো–এই তো এসেছি মা।
আবার চলে যাবি; আসবি তো?
তোমার সন্তান, তোমার পাশে না এসে কি থাকতে পারবে?
দেখা যাবে।
নিশ্চয়ই আসবো মা।
মরিয়ম বেগম বেরিয়ে যান কক্ষ থেকে, যাবার সময় বলেন, কিছু খাবার আনছি, পালানে যেন।
মরিয়ম বেগম বেরিয়ে যেতেই বনহুর ফিরে তাকালো মনিরার মুখে, কয়েক পা এগুতে এগুতে বললো–নূরের কথাই ভাববে, না আমাকে কিছু বলবে?
মনিরা চোখ তুলে তাকালো স্বামীর মুখের দিকে। ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠলো, কিন্তু কিছুই বলতে পারলো না সে।
বনহুর আরও সরে এলো, মনিরার কাঁধে হাত রেখে বললো–আমি বলছি–তোমার নূর যেখানেই থাক, ভাল থাকবে–একদিন সে ফিরে আসবে।
