বনহুর বার বার ভীত ভাবে বাইরের দরজার দিকে তাকাতে লাগলো।
মহববৎ আলী বললো-তাহলে তো ভয়ঙ্কর কথা। দস্যু বনহুর যদি আপনাদের কিছু নিয়ে থাকে তাহলে আমার হোটেল অবধি ধাওয়া করবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।
তাই তো আমার মনে হচ্ছে….
আসুন, আপনাদের টাকা-পয়সা সব গুছিয়ে নিন।
চলুন, আর মোটেই বিলম্ব করতে পারছিনা।
মহববৎ আলী হংকিং বৈশি বনহুর এবং মংলাওবৈশি রহমান সহ পাশের কামরায় গেলো। এ কক্ষেই ঔষধের বাক্সগুলো থরে থরে সাজানো ছিলো।
মহববৎ আলী যখন টাকার ব্যাগটা হংকিং রাও এর হাতে তুলে দিচ্ছিলো তখন হংকিং বেশি বনহুর চারদিকে এক নজর দৃষ্টিটা বুলিয়ে নিলো।
টাকার ব্যাগ হাতে নিয়ে বনহুর দরজার দিকে পা বাড়ালো, মহববৎ আলী বলে উঠলো –আপনাদের স্যুটকেস এবং বেডিং–পত্র রইলো যে…
হংকিং রাও বললো-যেতে দিন ও সব। দস্যু বনহুর যদি এসে পড়ে তাহলে প্রাণ নিয়ে পালানো মুস্কিল হবে…।
হংকিং বেশি দস্যু বনহুর আর মংলাও বেশি রহমান গাড়িতে চেপে বসলো।
হোটেলের দরজায় দাঁড়িয়ে মহববৎ আলী হাত নেড়ে তাকে বিদায় সাষণ জানিয়ে বললো–আবার আসবেন তো?
বনহুর বললো ড্রাই আসন থেকে অচিরেই আবার দেখা হবে বন্ধু…
গাড়ির শব্দে আর কিছু শোনা গেলনা।
পিছন আসনে রহমান আর ড্রাইভার বসে রইলো শুদ্ধ হয়ে।
সর্দারের কান্ডকলাপ দেখতে লাগলো তারা নির্বাক নয়নে।
শহরের পথ ধরে বনহুরের গাড়ি উল্কা বেগে ছুটে চললো।
১৭.
কেঁদে কেঁদে মনিরা নাজেহাল হয়ে পড়েছে। একেবারে পাগলিনীর মত। সেদিনের পর থেকে কেউ তাকে দানা-পানি খাওয়াতে পারেনি। অহঃরহ। চোখের পানি বিসর্জন করে চলেছে মনিরা।
গভীর রাত।
মনিরা ক্লান্ত অবসন্ন দেহটা বিছানায় এলিয়ে দিয়েছে। কদিন অবিরত কাঁদাকাটা করে একেবারে যা তা হয়ে গেছে।
পাশের কক্ষে মরিয়ম বেগম-এখনও তার চোখে ঘুম আসে নি। নানা চিন্তায় মগ্ন হয়ে পড়েছেন তিনি। স্বামীর কাছ থেকে আজ পর্যন্ত যা ঘটেছে বা ঘটছে সব স্মরণ হচ্ছে একটির পর একটি করে। মরিয়ম বেগম কোন দিন কি ভেবেছিলেন-তার অমন মহানুভব স্বামী তোক চক্রান্তে নিহত হবেন। কে তাকে হত্যা করেছিলো, কেনই বা করেছিলো–আজও জানেন না তিনি। তারপর নিজ সন্তান আজ সভ্য সমাজের সৎ ব্যক্তি না হয়ে হয়েছে দস্যু-ডাকু। লোক সমাজে তার স্থান নেই। মনিরাকে নিয়েই বাঁচতে চেয়েছিলেন, ওকে বিয়ে দিয়ে সন্তানকে আবদ্ধ করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সে আশাও তার পুর্ণ হয়নি। দস্যু সন্তানকে মায়ার বন্ধনে বাঁধতে চেয়েও পারেনি। মরিয়ম বেগমের চোখের পানিতে বালিশ সিক্ত হয়ে উঠলো।
এশার আযান থেমে গেছে অনেকক্ষণ। দেয়াল ঘড়িটা টিক্ টিক শব্দে এগিয়ে চলেছে সীমাহীন অজানার পথে।
মরিয়ম বেগমের নিদ্রাহীন আঁখি দুটি অন্ধকারে ছল ছল করে উঠে বুক চীরে বেরিয়ে আসে দীর্ঘশ্বাস। মনে মনে খোদার নাম স্মরণ করেন–হে দয়াময়, তোমার ইচ্ছাই পূর্ণ হোক…
হঠাৎ মরিয়ম বেগম চমকে উঠেন, শুনতে পান মনিরার কক্ষে একটা চাপা অতি পরিচিত কণ্ঠস্বর। মরিয়ম বেগমের চোখ দুটো খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো, তিনি কান পেতে চুপ করে রইলেন।
পাশের কক্ষ থেকে ভেসে এলো আবার–মনিরা, মনিরা আমি এসেছি—মনিরা—
মনিরার কণ্ঠস্বর কে–কে তুমি–ওগো তুমি এসেছো?–সঙ্গে সঙ্গে মনিরার কান্নার শব্দ শোনা গেলো। পর মুহূর্তেই ক্রন্দন রত কণ্ঠ মনিরার আমার নূর নেই, কে তাকে চুরি করে নিয়ে গেছে….
আমার নূর নেই….
নীরব নিস্তব্ধ বনহুর, কোন কথা বললো না সে।
মনিরা স্বামীর বুকে মাথা ঠুকতে লাগলো। আমার নূর নেই। ওকে কারা সুরি করে নিয়ে গেছে—ওগো আমি কি নিয়ে বাঁচবো–আমি কি নিয়ে বাঁচবো–কান্নায় ভেংগে পড়ে মনিরা।
এতোক্ষণে কথা বলে বনহুর–মনিরা, এতো ভেংগে পড়লে চলবে কেনো? নূর তোমার সন্তান, কেউ তাকে চুরি করে নিয়ে গিয়ে ধরে রাখতে পারবেনা। একদিন সে ফিরে আসবে তোমার পাশে…
আমি সে কথা শুনতে চাইনা, বলো আমার নূরকে তুমি খুঁজে এনে দেবে? বললা……ওগো বলো? বনহুরের জামা চেপে ধরে মনির।
বনহুর গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠলো–মনিরা, একটা কথার জবাব দাও আমাকে?
বলল, বলো তুমি? নূরকে চাও না আমাকে?
চিত্রাপিত্যের ন্যায় তাকায় মনিরা স্বামীর মুখে।
২.০১ বন্দী বনহুর
অস্ফুট কণ্ঠে বললো মনিরা–কি বললে?
বনহুর পূর্বের ন্যায় গম্ভীর গলায় বলে উঠলো–আমাকে চাও, না নূরকে?
স্বামীর কথায় মনিরার মুখমন্ডল বিবর্ণ হয়ে উঠলো, ঢোক গিলে বললো মনিরা–এ তুমি কি বলছো! ওগো, এ তুমি কি বলছো?
দৃঢ় কণ্ঠে বললো বনহুর–যদি নূরকে চাও তবে আমাকে পাবেনা, আর যদি আমাকে চাও তবে’নূরকে…
মনিরা দ্রুত বনহুরের মুখে হাত চাপা দিয়ে অশ্রুভরা কণ্ঠে বললো–না না, ওকথা আর বলোনা। আমার বুক ফেটে চৌচির হয়ে যাবে। আমি সহ্য করতে পারবো না।
পাশের কক্ষ থেকে এতোক্ষণ মরিয়ম বেগম সব শুনছিলেন। তিনি আচমকা প্রবেশ করলেন কক্ষমধ্যে।
সঙ্গে সঙ্গে বনহুর ফিরে তাকালো, একটু হচকিয়ে গেলো সে। পরক্ষণেই নিজকে সামলে নিয়ে বললো বনহুর–মা!
স্থির গম্ভীর হয়ে দাঁড়ালেন মরিয়ম বেগম। পাশের কক্ষ থেকে পুত্রের এবং মনিরার কথাগুলো কান পেতে তিনি শুনেছিলেন, বনহুরের কথায় রাগে শরীর তার কাঁপছিলো, এত বড় কথা সে বলতে পারলো মনিরার মুখের উপর–আমাকে চাও না নূরকে? কথাটা তার হৃদয়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। রাগ-ক্ষোভ-ব্যথা গুমড়ে ফিরছিলো মরিয়ম বেগমের মনের মধ্যে। মুখোভাব কঠিন করে বললেন তিনি–কে তোর মা! আমি তোর মা নই…না না, আমি তোর মা নই-ওরে পাষন্ড সন্তান! তুই মা বলে আমাকে আর কোন দিন ডাকিসনে।
