লোক দুজনের চোখে মুখে দুর্ভাবনার ছাপ ফুটে উঠেছে। দুখানা চেয়ারের সঙ্গে লোক দুজনাকে বেধে রাখা হয়েছে মজবুত করে।
বনহুর এসে দাঁড়ালো এদের সম্মুখে।
রহমান বললো-সর্দার, এর নাম ডক্টর হংকিং আর ওর নাম মং লও।
বনহুর তীব্র চোখে তাকিয়ে দেখছিলো দুজনাকে। বললো সে-হুঁ।
মহসীন বললো এবার-সর্দার, এরা শুধু ঔষধের কারবারই করেনা, নিজেদের কোম্পানিতে এরা নানা রকম ভেজাল, বিষাক্ত ঔষধ তৈরি করে।
দাঁতে দাঁত পিষে বললো বনহুর অত্যন্ত লাভকর ব্যবসা।
বনহুর আর রহমানকে দেখে ডক্টর হংকিং রাও আর মং লাও খুশি হয়েছিলো, মনে করেছিলো মহব্বৎ আলীর লোক এরা। পর মুহূর্তে ভীত ভাবে তাকাতে লাগলো ওরা, বনহুর আর রহমানের দিকে।
বনহুর বললো-রহমান, এদের আমার গুম্ ঘরে নিয়ে চলো, সেখানে আমি কয়েকটি প্রশ্ন করবো।
বনহুর দাঁড়িয়ে রইলো, রহমান ওদিকের একটা সুইচে চাপ দিলো, সঙ্গে সঙ্গে কক্ষের মেঝেটা দুলে উঠলো। তারপর মেঝেটা সাঁ সাঁ করে নেমে গেলো কয়েক ফিটু নীচে।
বৃন্দীদ্বয় এবং রহমান ও বনহুর যেমন দাঁড়িয়ে ছিলো তেমন রয়েছে। মহসীনও আছে তাদের পিছনে দাঁড়িয়ে।
বনহুরের আদেশে বন্দীদ্বয়কে লৌহ শিক বেষ্টিত স্থান থেকে বের করে আনা হলো।
বনূহুর একটা আসনে উপবেশন করলো।
বন্দীদ্বয় সম্মুখে দন্ডায়মান।
রহমান হাতে তালি দিতেই দুজন বলিষ্ঠ লোক হাজির হলো।
বনহুর ইংগিৎ করতেই বলিষ্ঠ লোক দুজন ডক্টর হংকিং ও মং লাও এর সম্মুখে এসে দাঁড়ালো। লোক দুটির হস্তে দুটি সুতীক্ষ্ণ লৌহদন্ড।
বনহুর বললো–ডক্টরদ্বয়, আমি যা জিজ্ঞাস করছি তার সঠিক জবাব দাও, নচেৎ…ঐ লৌহ শলাকা দিয়ে তোমার জিহ্বা ছেদন করা হবে।
ডক্টর হংকিং এর মুখে কোন ভীত ভাব ফুটে না উঠলেও ডক্টর মং লাও এর মুখমন্ডল বিবর্ণ হয়ে উঠলো।
বনহুর কিছু ভাববার অবসর না দিয়ে গর্জে উঠলো–মহববৎ আলীর সঙ্গে কত দিন হলো তোমাদের যোগাযোগ?
হংকিং কিছু বলবার পূর্বেই বললো মং লাও-সত্য কথা বললে ছেড়ে দেবেন তো?, বনহুর বললো নিশ্চয়ই দেবো। আর মিথ্যা বললে ঐ লৌহ শলাকা দিয়ে তোমাদের জিহ্বা ছেদন করবো।
না না, আমাদের জিহ্বা ছেদন করবেন না, সব সত্য কথা বলবো-যা জিজ্ঞাসা করবেন, সব বলবো।
ডক্টর হংকিং রক্তচক্ষু মেলে তাকাতে লাগলো মং লাও এর দিকে। রহমান এবার বললো–জবাব দাও, যা জানতে চাওয়া হলো?
মংলাও কিছু বলতে যাচ্ছিলো, হংকিং বলল–আমাকে বলতে দাও মংলাও।
মং লাও যে কথা বলতে যাচ্ছিলো তা আর বলা হলো না। বললো হংকিং–মহববং আলীকে আমরা চিনি না–
গর্জে উঠলো বনহু–চেনো না! মহববৎ আলীর সঙ্গে তোমাদের যোগাযোগ নেই বলতে চাও–
হাঁ আমি-মানে আমরা তাকে চিনি না। আমরা অন্য কাৰ্য্য উপলক্ষে তার হোটেলে উঠেছিলাম।
বেশ, সেখানে থেকে ফিরে এসে তোমার সত্যতার পুরস্কার দেবো।
বনহুর উঠে দাঁড়াল।
রহমান ইঙ্গিত করতেই লৌহ শলাকা হস্তে বলিষ্ঠ লোকদ্বয় বনহুরকে কুর্ণিশ জানিয়ে বিদায় গ্রহণ করলো।
সঙ্গে সঙ্গে হংকিং রাও ও মংলা বন্দী হলো লৌহ আবেষ্টনীর মধ্যে।
রহমান একটা মেসিনে চাপ দিলো, সঙ্গে সঙ্গে মেঝেটা সাঁ সাঁ করে উঠে আসতে লাগলো উপরের দিকে।
কয়েক মিনিটের মধ্যে পূর্বের স্থানে মেঝেটা এসে স্থির হলো।
বনহুর আর রহমান বেরিয়ে গেলো কক্ষ থেকে।
মহসীন কৌশলে লৌহ দরজা বন্ধ করে দিলো।
বনহুর আর রহমান গাড়িতে এসে বসলো।
রহমানকে লক্ষ্য করে বললো বনহুর-আমার ব্যাগটা গাড়ির মধ্যে আছে তো?
হাঁ, সর্দার, আছে।
হোটেল কক্ষে প্রবেশ করলো বনহুর আর রহমান।
এখন তাদের শরীরে ভিন্ন ড্রেস। বনহুরকে দেখলে ঠিক ডক্টর হংকিং রাও এবং রহমানকে ঠিক ডক্টর মং লাও বলে মনে হবে।
বনহুর আর রহমান যখন হোটেল গুলবাগে এসে পৌঁছলো তখন হোটেলের দারোয়ান ছালাম জানিয়ে বললো-সাহাব, আপ-লোক কাহা গিয়াথা। হুজুর আপ লোক কা খাতির মে বহুত পেরেশান হওয়া ….
বনহুর আর রহমান কোন কথা না বলে মহববৎ আলীর ক্যাবিনে প্রবেশ করলো।
মহববৎ আলী তার নিজস্ব কামরায় ব্যস্তভাবে পায়চারী করছিলো।
ডক্টর রাও ও মংলাওকে দেখে মহববৎ আলী থমকে দাঁড়িয়ে বলে উঠলো-আপনারা কোথায় ডুব দিয়েছিলেন বলুন তো? এতো রাত হলো, আপনাদের টাকা-পয়সা চুকিয়ে দিয়ে বাসায় যাবো। আমার মেয়ে পারভিনের অসুখ কিনা!
বনহুর ইতিপূর্বে ডক্টর হংকিং রাও এর কণ্ঠস্বর নকল করে নিতে সক্ষম হয়েছিলো, মাথার ক্যাপটা আর একটু সম্মুখে টেনে দিয়ে বললো-একটা বিপদে পড়েছিলাম, বেঁচে গেছি।
আশ্চর্য হলো মহববৎ আলী-বিপদ! কি বিপদে পড়েছিলেন আপনারা?
দস্যু বনহুর আমাদের সন্ধান পেয়েছে–আমরা এ হোটেলে আছি।
দস্যু বনহুর?
হাঁ,দস্যু বনহুর। সে-ই আমাদের আটক করেছিলো, অতি কষ্টে পালিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছি।
বলেন কি, দস্যু বনহুর তাহলে….
হাঁ, আবার তার আবির্ভাব ঘটেছে। মংলাও–বেশি রহমান বনহুরের কথায় খুশি হরত পারলো না, কারণ এ কথাটা বলায় দেশবাসী আবার আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়বে, তাছাড়া পুলিশ মহলেও সাড়া পড়ে যাবে। বনহুর এখন তবু ছদ্মবেশে শহরের নানা স্থানে বিচরণ করে বেড়াচ্ছে তখন রাতের অন্ধকার ছাড়া আর উপায় থাকবেনা।
কিন্তু সর্দার যা ভাল বুঝবে তাই তো করবে। রহমান উসখুস করছিলো। বনহুর তার পায়ে মৃদু আঘাত করলো।
কাজেই আজ রাতের প্লেনেই আমরা কান্দাই ত্যাগ করতে চাই।
