বনহুর আনন্দে আপ্লুত হলো, নূরীর মুখে হাসি ফুটেছে।
নূরী মনিকে নিয়ে দোলনায় দোল দিতে লাগলো, গান গাইতে লাগলো। ফুলের মালার মুকুট তৈরি করে মাথায়-গলায় পরিয়ে দিতে লাগলো। নূরী মনিকে পেয়ে খুশিতে ডগমগ।
মনি কিছুক্ষণের মধ্যেই কাঁদা ভুলে অবাক হয়ে নূরীর কাণ্ড কলাপ দেখতে লাগলো।
সেই ফাঁকে সরে পড়লো বনহুর। মনিরার হৃদয়ে ব্যথা দিয়ে বনহুর নূরকে চুরি করে এনেছে। বাপ হয়ে পুত্রকে হরণ করে এনেছে সে মায়ের বুক থেকে। শুধু নূরীকে খুশি করবার জন্যই একাজ করেনি বনহুর, নূরীর কাছ থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখার এটা একটা উপায়।
নুরী ভুলে থাকবে তার মনিকে নিয়ে, বনহুরের চলার পথে সে আর বাধার সৃষ্টি করবেনা।
নুরী যখন মনিকে নিয়ে মেতে আছে তখন বনহুর রহমানকে সঙ্গে করে দরবার কক্ষে প্রবেশ করলো।
সেখানে রহমান ও তার অন্যান্য অনুচরদের সঙ্গে কিছু আলাপ আলোচনা হলো।
রহমানকে আরও কিছু বললো বনহুর। রহমান মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানালো।
বনহুর একবার নিজের কক্ষে প্রবেশ করে স্বাভাবিক ড্রেসে সজ্জিত হয়ে নিলো। স্যুট প্যান্ট-টাই, মাথায় ক্যাপ পরে নিলো সে।
রহমান দরজার বাইরে এসে দাঁড়ালো, তার শরীরে সাধারণ ভদ্র ড্রেস। অদূরে অপেক্ষা করছিলো তাজ আর দুলকি।
বনহুর আর রহমান অশ্বদ্বয়ের পাশে এসে দাঁড়ালো। বনহুর চেপে বসলো তাজের পিঠে, আর দুলকির পিঠে রহমান।
বনবাদর, জঙ্গল-মাঠ অতিক্রম করে এগিয়ে চলেছে বনহুর আর রহমান। বনপথ শেষ হতেই পথের বাঁকে দাঁড়িয়ে আছে তাদের মোটরকার।
বনহুর আর রহমান নিকটে পৌঁছতেই ড্রাইভার আসন ত্যাগ করে নেমে দাঁড়ালো।
বনহুর তাকে জিজ্ঞাসা করলো—যে ভদ্রলোকদ্বয় হোটেল গুল বাগে ছিলো, তাদের সরানো হয়েছে?
হাঁ, সরানো হয়েছে।
কিভাবে এ কাজ তোমরা করলে মহসীন?
সর্দার। অনেক কৌশলে তাদের সরিয়েছি, তাদের ড্রাইভারকে সরিয়ে আমি ড্রাইভার সেজে গাড়িতে বসেছিলালাম।
তারপর?
লোক দুজন বাইরের কোন কাজে বেরুবে বলে তখনকার মত গাড়িতে এসে বসলো। আমি জানতাম তারা এ শহরে নতুন-কাজেই পথঘাট তাদের তেমন চেনা নাই। সেই সুযোগ নিয়ে আমি তাদের আমাদের শহরের আস্তানায় নিয়ে গিয়ে বন্দী করে রেখেছি।
সাবাস! বললো রহমান।
বনহুর বললো–ওদের কোন কষ্ট দাওনি তো?
না সর্দার।
এবার বনহুর আর রহমান গাড়িতে চেপে বসলো।
ড্রাইভ আসনে উঠে বসলো মহসীন।
বনহুরের শহরেও একটা গোপন বাড়ি ছিলো। এ বাড়িখানা পূর্বের সেই বাড়িখানার চেয়ে অন্য ধরনের। শহরের প্রায় মাঝামাঝি কতগুলো দোকানপাট আছে, তারই পিছনে বাড়িটা।
বাড়িখানার আশে-পাশে আরও কতগুলো বাড়ি আছে। সেগুলোতে লোক বসবাস করে। কাজেই এ বাড়িখানা যে দস্যু বনহুরের একটা গোপন আস্তানায়, এটা কেউ সন্দেহ করতে পারে না।
এখানেও বনহুরের কিছু সংখ্যক অনুচর গুপ্তভাবে লুকিয়ে থাকে। অবশ্য একেবারে গোপনভাবে থাকে না, ছদ্মবেশে শহরে তারা ছড়িয়ে থাকে এখানে সেখানে। নানা ভাবে এরা নানা ধরনের সংবাদ সংগ্রহ করে এবং সেভাবে কাজ করে তারা।
রহমান এদের দ্বারাই সংবাদ সংগ্রহ করতে পেরেছে হোটেল গুলবাগে নানা রকম অনাচার ও দুষ্কর্ম সংঘটিত হয়ে থাকে। শুধু তাই নয়, বিদেশি লোকরা এখানে গোপনে নানা রকম ভেজাল ঔষধ পত্র পরিবেশন করে থাকে।
চোরের সঙ্গেই চোরের বন্ধুত্ব, কাজেই যত শয়তান আর দুষ্কর্মকারীর দল এখানে আনাগোনা করে থাকে।
মহসীন ও আর কয়েকজন অনুচর আজ যে লোক দুটিকে তাদের আস্তানায় আটক করেছে তারা মারাত্মক ঔষধ ব্যবসায়ী। বাইরের দেশ থেকে নানা ধরনের বিষাক্ত ঔষধ এনে এদের হাতে তুলে দেয় এবং প্রচুর অর্থ নিয়ে যায় এরা এসব দেশ থেকে।
কান্দাই শহরে এ ধরনের নানা ব্যবসায়ীর আমদানী হয়ে থাকে গুলবাগ হোটেলে।
আজ দুজনাকে আটক করতে সমর্থ হয়েছে বনহুরের দল। লোক দুটির একজনের নাম ডক্টর হংকিং রাও, দ্বিতীয় জন ডক্টর মং লাও। এবার এরা প্রচুর বিষাক্ত এবং ভেজাল ঔষধ এনেছিলো, মহব্বৎ খ এসব ঔষধ রেখেছে। পরে শহরের বিভিন্ন কেন্দ্রে পাঠানো হবে। ইতিমধ্যে হসপিটাল ও অনেক চিকিৎসা কেন্দ্রে বহু রোগি এ সব ধরনের ঔষধ সেবনে এবং ইনজেকশানে মৃত্যু বরণ করেছে।
সব সংবাদই বনহুরের কানে এসে পৌঁছেছে।
তাই বন আজ স্বয়ং বের হয়েছে এসব সন্ধানে।
বনহুর আর রহমানের গাড়ি এসে পৌঁছলো তার শহরের গোপন আস্তানায় সম্মুখে।
বনহুর আর রহমান নেমে পড়লো।
অন্তপুরে প্রবেশ করতেই দুজন রাইফেলধারী অনুচর বনহুরকে অভিবাদন জানালো।
বাড়িটা বাইরে থেকে স্বাভাবিক মনে হলেও ভিতরে স্বাভাবিক ছিলোনা। পর পর কয়েকখানা ঘর পেরিয়ে একটা ভোলা ছোট্ট উঠান–তার পরই আর একটা বড় ঘর। ঘরটা সুন্দর করে সাজানো। কিছু সংখ্যক বই পুস্তক থরে থরে সাজানো আলমারীতে। এরই একটা আলমারীর পিছনে রয়েছে। গুপ্ত সিঁড়ি।
বনহুর আর রহমান সহ মহসীন এই আলমারীটার পাশে এসে একটা স্থানে পা দিয়ে চাপ দিলো, সঙ্গে সঙ্গে আলমারীটা একদিকে সরে গেলো। ধীরে ধীরে।
বেরিয়ে এলো সুন্দর একটা সিঁড়ি পথ।
বনহুর আর রহমান এ পথে অগ্রসর হলো। মহসীন পিছনে চললো। সিঁড়িটা বৈদ্যুতিক আলোতে আলোকিত রয়েছে, কোন অসুবিধা হলোনা, বনহুর আর রহমানের।
সিঁড়ি বেয়ে নীচে একটা কক্ষে এসে উপস্থিত হলো তারা। কক্ষটা বেশ বড়, কক্ষ মধ্যে বৈদ্যুতিক আলো জ্বলছে। এক পাশে লৌহ শিক পরিবেষ্টিত খানিকটা জায়গা। সে জায়গায় বন্দী রয়েছে দুজন ভদ্রলোক।
