জেগে উঠলো নুরী, চোখ মেলে তাকিয়ে বিস্মিত হলো–তুমি! সঙ্গে সঙ্গে পাশে নজর পড়তেই আশ্চর্য কণ্ঠে বললো–এটা কে?
বনহুর হেসে বললো–তোমার মনি।
মনি।
হাঁ।
নূরী উঠে বসে ভাল করে লক্ষ্য করলো–তার মনি যখন হারিয়ে গিয়েছিলো, তখন ছিলো সে ছোট্ট এক রত্তি। এক পা দুপা করে কেবল হাটতো। আর আজ বেশ বড়সড় হয়ে গেছে। নূরী তাড়াতাড়ি এদিক ওদিক করে দেখতে লাগলো–দক্ষিণ হাতের বাজুতে নজর পড়তেই নিসন্দেহ হলো সে। ঘুমন্ত নূরকে তুলে নিয়ে বুকে চেপে ধরলো, আদর করে চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে দিলো ওকে।
বনহুর মৃদু মৃদু হাসতে লাগলো।
নুরী যখন নূরের ঘুম ভাঙ্গনোর জন্য ভীষণ ভাবে চেষ্টা করছে তখন বললো বনহুর সময় হলে নিজেই জাগবে। এখন ওকে ঘুমোতে দাও।
নূরী আলগোছে বালিশে শুইয়ে দিয়ে নিষ্পলক নয়নে তাকিয়ে রইলো নূরের মুখের দিকে।
১৬.
মনিরার যখন জ্ঞান ফিরে এলো, দেখলো তার শয্যার পাশে মরিয়ম বেগম, সরকার সাহেব, নকীব আরও বাড়ির চাকর-বাকর সবাই অশ্রুভারাক্রান্ত নয়নে দাঁড়িয়ে আছে। মরিয়ম বেগম বসে আছেন তার শিয়রে, বার বার তিনি আচলে, চোখ মুছছেন।
মনিরা চোখ মেলে তাকিয়ে বিস্মিত হলো। মামীমা, সরকার সাহেবএরা সব এখানে কেনো! সবাই কাঁদছে–ব্যাপার কি? তবে কি তার কোন অসুখ হয়েছিল? তাই হয়তো হবে, মাথাটা কেমন ঝিম ঝিম করছে। কেমন যেন এলোমেলো লাগছে সব।
বললো মনিরা–কি হয়েছে আমার?
ডাক্তার একটু পূর্বে বারণ করে গেছেন–যতক্ষণ রোগি সম্পূর্ণ সুস্থ না হয় ততক্ষণ ওর কাছে কোন রকম কথা বলবেন না। নূরকে কে বা কারা চুরি করে নিয়ে গেছে–একথা একেবারে চেপে যাবেন।
ডাক্তারের কথাগুলো স্মরণ করে কোন কথাই বললেন না মরিয়ম বেগম।
সরকার সাহেব শুধু বললো–কিছুই হয়নি, তুমি ঘুমোও মা।
মনিরা চোখ বন্ধ করলো বটে কিন্তু ঘুম আর এলো না।
মনিরা সম্পূর্ণ সুস্থ হলো এক সময়।
উঠে বসলো শয্যায়, মামীমাকে ডেকে বললো আমার কি হয়েছিলো মামীমা?
কিছু হয়নি।
আমার নূরকে দেখছিনা কেনো?
মরিয়ম বেগমের দুচোখ ছাপিয়ে পানি আসছিলো, অতিকষ্টে নিজেকে সংযত রেখে বললেন–সরকার সাহেব ওকে বাইরে নিয়ে গেছেন।
এ অসময়ে নূরকে পাঠালে কেনো মামীমা?
তুই সুস্থ নস, তাই ও বিরক্ত করবে বলে……মিথ্যা বলতে বড় কষ্ট হচ্ছিলো মরিয়ম বেগমের–তবু বললেন, না বলে যে কোন উপায় ছিলোনা।
কিন্তু কতক্ষণ ব্যাপারটা লুকিয়ে রাখবে বা রাখতে পারবে। এদিকে মনিরা পুত্র নূরের জন্য অস্থির হয়ে পড়লো।
মরিয়ম বেগম কি করে বলবেন, রাতে নরকে কে বা কারা চুরি করে নিয়ে গেছে। সরকার সাহেবের সঙ্গে পরামর্শ করলেন, এবং তাকেই বললেন। কথাটা বলতে।
মনিরা নকীবকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলো–হারে নকীব, আমার নূর কোথায়? ওকে দেখছিনা কেনো?
নকীব কাঁধের গামছাটায় চোখ মুছে নিয়ে তাকালো এদিক ওদিক, তারপর ফিস ফিস করে বললো নকীব–বলতে মানা করে দিয়েছেন ডাক্তার সাহেব….
নকীবের কথায় মনিরা ভীত হয়ে পড়লো–ওর বলার ভঙ্গী দেখে বুঝতে পারলো, নিশ্চয়ই তার নূরের কোন অমঙ্গল ঘটেছে। আর্তকণ্ঠে বললো মনিরা আমার কাছে লুকোচ্ছিস কেনো, বল্ বল্ নকীব, আমার নূর কোথায়? কি হয়েছে তার? বল্ বল্…..
নকীবের জামার খানিকটা অংশ চেপে ধরলো মনিরা।
নকীব না বলে আর পারলো না–আপামনি, নুরকে কাল রাত কে যেন চুরি করে নিয়ে গেছে।
চীৎকার করে উঠলো মনিরা–আমার নূরকে চুরি করে নিয়ে গেছে ….. পাশের কক্ষ থেকে ছুটে এলেন মরিয়ম বেগম এবং সরকার সাহেব। মনিরা তখন মাথা ঠুকছে খাটের সঙ্গে, নূর–নূর–নূর….আমার নূর–
মরিয়ম বেগম দ্রুত এসে মনিরাকে ধরে ফেললেন, বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বললেন–একি করছিস মা? শোন, শোন–
না না, বলল আমার নূর কোথায়, আমার নূর কোথায়। বলো মামীমা, আমার নূর …..
জানিনা মা–কিছুই জানিনা।
বলো মামীমা, আমার নূর কই?
মরিয়ম বেগম বললেন–ভোরে অনেক বেলা হয়ে গেলো তবু তুই দরজা খুলছি না। আমি মনে করলাম, ঘুমোচ্ছিস বুঝি–তাই নকীবকে বললাম তোকে জাগাতে। নকীব তো দরজায় অনেক ডাকাডাকি করেও তোকে জাগাতে পারলোনা। শেষ পর্যন্ত আমিও অনেক করে তোকে ডাকলাম, তখনই মনে আমার ভয় আর দুর্ভাবনা উঁকি দিয়ে গেলো। সেকি, আজ নরও তো জাগছেনা, ব্যাপার কি হলো! তারপর সরকার সাহেব এলেন, সবাই এলো। দরজা ভেংগে ভিতরে প্রবেশ করে বিস্ময়ে হতবাক হলাম, তুই একা বিছানায় অজ্ঞান হয়ে শুয়ে আছিস্–পাশে নূর নেই। ওদিকে নজর পড়তেই আঁতকে উঠলাম–পিছন শাসী খোলা।
মনিরা চীৎকার করে কেঁদে উঠলো–মামীমা, মামীমা আমার নূর তাহলে চুরি হয়ে গেছে! আমার নুরকে কে নিয়ে গেছে, কে নিয়ে গেছে—
গোটাদিন কাঁদা-কাটা করে কাটলো মনিরার। এ বাড়ির সবাই শোকে মূহ্যমান হয়ে পড়লো।
সবাই অনেক করেও মনিরাকে কিছু খাওয়াতে পারলোনা।
সরকার সাহেব থানায় ডায়রী করে দিয়ে এলেন।
থানা অফিসার নতুন লোক, তিনি আশ্বাস দিলেন, নূরকে খুঁজে বের করবার যথাসাধ্য চেষ্টা করবেন।
এদিকে মনিরা যখন নূরের জন্য উন্মাদিনী প্রায় হয়ে পড়েছে, বনহুরের আস্তানায় তখন নূরী মনিকে নিয়ে মেতে উঠেছে–আনন্দে আজ সে আত্মহারা।
মনি যতই কাঁদছে, আমাল মাল কাছে দাবো–আমার মাল কাছে দাবো–নূরী ততই এটা-ওটা খেলনা–খাবার দিয়ে তাকে ভোলাতে চেষ্টা করতে লাগলো।
