এসো নূরকে দেখো। মনিরা বনহুরের দক্ষিণ হাত ধরে নিয়ে আসে খাটের পাশে। মশারী উচু করে বলে মনিরা চিনতে পারছো?
নূর পাশ ফিরে এদিকে মুখ করে শুয়ে ছিলো। হাত-ছোট গেঞ্জি গায়েদক্ষিণ হাতখানা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। হাতের বাজুতে সেই চিহ্ন।
বৈদ্যুতিক আলোতে স্পষ্ট দেখলো বনহুর নূরকে, সঙ্গে সঙ্গে চমকে উঠলো। এ শিশুকেই একদিন সে কাপালিক সন্ন্যাসীর কবল থেকে রক্ষা করে নূরীর কোলে অর্পণ করেছিলো। যদিও কয়েক বছরের ব্যবধান ঘটেছে, তবু বনহুর চিনতে পারে নূরকে। বনহুরের চোখের সম্মুখে ভেসে উঠে অতীতের কয়েকটা ছবি। নূরী শিশুকে কোলে করে খুসীতে আত্মহারা, বলে–হুর, জানো এর নাম রেখেছি মনি! চমকে উঠেছিলো বনহুর, কারণ, তার মা তাকে ঐ নাম ধরে ডাকতো। বড্ড অপেয়া নাম ওটা–বলেছিলো বনহুর। নূরী খোকনের গালে-মুখে চুমো দিয়ে ভরে দিয়েছিলো। তারপর আর একদিন নূরী খোকনটিকে কোলে করে প্রবেশ করেছিলো তার কক্ষে। বনহুরকে লক্ষ্য করে বলেছিল–দেখো দেখো হুর, তোমার দক্ষিণ বাহুর মত আমার মনির হাতেও একটা চিহ্ন।–আজ বনহুরের চোখের সম্মুখে সবগুলো দৃশ্য একের পর এক ফুটে উঠতে লাগলো। নূরীর মনিই মনিরার নূর! আশ্চর্য!
বললো মনিরা–কি ভাবছো?
উঁ।
কি ভাবছো?
নূরকে তুমি কোথায় পেলে মনিরা?
শুনবে, শুনবে তুমি সে কাহিনী?
হাঁ বলো, শুনবো।
বসো।
পাশাপাশি বসলো মনিরা আর বনহুর। মনিরা কিভাবে নূরকে পেয়েছে, সব কথা খুলে বললো বনহুরের কাছে।
অবাক হয়ে সব শুনলো বনহুর, এবার স্পষ্ট বুঝতে পারলো–এ শিশুই সেই মনি, যার জন্য নূরী দিন রাত অশ্রু বিসর্জন করেছে।
মনিরা যখন সব বলছিলো, তখন বনহুর চিন্তা করেছিলো, কথা দিয়েছে সে তার মনিকে এনে দেবে।
বনহুরের মনে নতুন এক অভিসন্ধি উঁকি দিয়ে যায়।
মনিরা বনহুরের জামার বোতাম লাগিয়ে দিতে দিতে বলে–নূরকে আদর করলেনা তো?
আনমনা হয়ে পড়েছিলো বনহুর, বললো–ঘুমুচ্ছে–ঘুমুতে দাও।
বললো মনিরা–সত্যি আমার নুর তোমারই প্রতিচ্ছবি। ওকে নিয়েই আমি বেঁচে আছি।
বনহুরের কানের কাছে ভেসে উঠে নুরীর করুণ কণ্ঠস্বর–মনি যে আমার জীবন। ওকে ছাড়া আমি বাঁচবোনা।
বনহুর যখন চিন্তা করছিলো নূরীর কথা তখন মনিরা হেসে বললোএকটা কথা বলবো তোমাকে রাখবে?
রাখবো, বলো?
সত্যি?
হুঁ।
মতি মহল হলে ভাল একটা ছবি হচ্ছে, আমাকে নিয়ে যাবে সঙ্গে?
চমকে উঠলো বনহুর, জানে সে মতি মহল হলে এখন কুন্তি বাঈ ছবি চলছে। যদিও সে ছবিটা এখনও দেখেনি কিন্তু শুনেছে এবং পথে স্থানে স্থানে পোষ্টার নজরে পড়েছে। আরও শুনেছে বনহুর-পুলিশ মহলে ভীষণ ভাবে আলোড়ন শুরু হয়েছে। কুন্তিবাঈ ছবির হিরোকে তারা চিনতে পেরেছে এবং এ নিয়ে পুলিশ মহল বেশ উদ্বিগ্ন রয়েছে।
কথাটা জনগণের কানে এখনও পৌঁছেনি, দস্যু বনহুরকে তারা কোনদিন চোখেও দেখেনি, কাজেই তারা কোন রকম দ্বিধা না করে ছবির হিরোর প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠেছে।
মনিরার কথায় বনহুর গম্ভীর হয়ে পড়লো, বললো–সে–মনিরা, এ ছবি নাই বা দেখলে।
অভিমান ভরা কণ্ঠে বলে মনিরা। কেনো, এ ছবি দেখতে তোমার আপত্তি কিসে?
না, আপত্তি ঠিক নয়। তবে শুনেছি, এ ছবি নেহাত মন্দ।
মানে আমার দেখার অনুপযোগি, এইতো? কিন্তু তুমি যতই বলল। ছবিটা আমি দেখবো-তুমি নিয়ে যাবেনা আমাকে?
এতোই যদি সখ তাহলে আমার সঙ্গে না গিয়ে আর কারো সঙ্গে যাও।
উঁ হুঁ, তোমার সঙ্গে কোনদিন ছবি দেখিনি।
আমাকে তুমি বিপদে ফেলতে চাও?
তোমার বিপদ সে তো আমার মাথায় বজ্রাঘাত—
তবে কেনো জেদ করছো মনিরা?
বড় সখ এ ছবি তোমাকে সঙ্গে করে দেখবো।
বেশ। গম্ভীর কণ্ঠে বললো বনহুর।
মনিরা খুশি হলো-সত্যি তো? কথা দিলে?
দিলাম।
এর পর বিদায় চাইলো বনহুর মনিরার কাছে।
আজ মনিরা খুশি মনে বিদায় দিলো বনহুরকে।
১৫.
নূরের গায়ের উপর হাত রেখে ঘুমিয়ে আছে মনিরা।
আজ মনিরার মুখে নেই কোন বিষাদের কালো ছায়া। উজ্জ্বল দীপ্ত মুখে ঘুমিয়ে আছে সে। স্বামীর চিন্তা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছে হয়তো মনিরা।
এমন সময় পিছনের জানালা দিয়ে কক্ষে প্রবেশ করলো বনহুর। অতি সন্তর্পণে এগিয়ে গেলো সে মনিরা আর নূরের বিছানার পাশে।
আজ শরীরে বনহুরের দস্যু ড্রেস।
জমকালো পোশাকে দেহ আচ্ছাদিত। মাথায় কালো পাগড়ি মুখে গালপট্টি বাধা। পায়ের জুতোও জমকালো পালিশ করা।
বনহুর মনিরার শিয়রে এসে দাঁড়ালো।
প্যান্টের পকেট থেকে বের করলো একটা রুমাল.। রুমালখানা ধীরে ধীরে মনিরার নাকের কাছে ধরলো, তারপর নূরের নাকে।
এবার রুমালখানা পকেটে রেখে নূরের দেহের উপর থেকে মনিরার হাতখানা আলগোছে সরিয়ে ফেললো বনহুর। তারপর দ্রুত নূরকে তুলে নিলো কোলে।
মনিরার দেহের চাদরখানা সরে গিয়েছিলো ফেললো এক পাশে।
বনহুর বাম বাহুতে নূরকে বুকের সঙ্গে এটে ধরে, দক্ষিণ হস্তে মনিরার গায়ে চাদরখানা টেনে দিলো। তারপর নিঃশব্দে বেরিয়ে গেলো কক্ষ থেকে।
চৌধুরী বাড়ির অদূরে অন্ধকারে অপেক্ষা করছিলো তাজ।
বনহুর নূরকে নিয়ে তাজের পাশে এসে দাঁড়ালো, কৌশলে উঠে বসলো : তাজের পিঠে।
সঙ্গে সঙ্গে তাজ ছুটতে শুরু করলো।
সূচিভেদ্য অন্ধকার ভেদ করে বনহুর নূরকে নিয়ে এগিয়ে চলেছে। শহর ছেড়ে গ্রামের পথ ধরে এগুচ্ছে বনহুর–তারপর বনাঞ্চল।
আস্তানায় পৌঁছতে প্রায় ভোব হয়ে এলো বনহুরের। নূরী তখনও ঘুম থেকে উঠেনি। বনহুর প্রবেশ করলো নূরীর কক্ষে, ধরে ধীরে নূরকে শুইয়ে দিলো নূরীর পাশে।
