বনহুর তখনও নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মুখমণ্ডল গম্ভীর কঠিন। মনিরার অশ্রু যে তাকে বিচলিত করেনি তা নয়, এর চেয়ে আরও কত কঠিন কথা মনিরা বনহুরকে বলেছে কতদিন, কিন্তু সেদিনের কথাগুলো বনহুরের মনে তীরফলকের মতই বিদ্ধ হয়ে আছে যেন।
মনিরা স্বামীর বুকে মাথা ঠুকতে লাগলো–তুমি বিশ্বাস করো, ও আমার মনের কথা নয় ……. ও আমার মনের কথা নয় …
বনহুর তখনও স্থির দাঁড়িয়ে আছে।
মনিরার বিলাপধ্বনি ওর কানে পৌছোচ্ছে কিনা কে জানে।
হঠাৎ মনিরা ছুটে চললো ঝর্ণার দিকে, যাবার সময় বললো মনিরা বেশ, ক্ষমা না করতে পারো, এ জীবন আমি বিসর্জন দেবো, তবু ফিরে যাবো না।
মনিরা ছুটে গিয়ে ঝর্ণার পাশে দাঁড়ালো।
বনহুর আর নিজকে সংযত রাখতে পারলো না, উচ্চ কণ্ঠে বললো–মনিরা শোন।
অভিমানে মনিরার বুক ভরে উঠেছে, এ মুহূর্তে সে নিজ জীবন বিসর্জন করতে কিছুমাত্র কুষ্ঠিত হবে না। ঝাপিয়ে পড়বে মনিরা কিন্তু আর পারলো না, বনহুরের কণ্ঠস্বর তার কানে যেন মধু বর্ষণ করলো। থমকে দাঁড়িয়ে ফিরে তাকালো।
বনহুর ততক্ষণে মনিরার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।
মনিরা, এবার লুটিয়ে পড়ে স্বামীর বুকে।
বনহুর ভুলে যায় যত অভিমান।
১৪.
রাত যত বেড়ে আসে নূরী ততই বনহুরের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বনহুর আজ বাইরে কোথাও যায়নি জানে সে। আস্তানার আশেপাশে কোথাও আছে কিংবা বৃদ্ধের গজল শুনছে সে ঝর্ণার পাশে বসে। কিন্তু এতোক্ষণে ও ফিরে আসছেনা কেনো। নূরী আস্তানার বাইরে যাবার জন্য পা বাড়াতেই রহমান পথ রোধ করে দাঁড়ালো–কোথায় যাচ্ছো?
নূরী গম্ভীর কণ্ঠে বললো–বনহুরের সন্ধানে। পথ ছেড়ে দাও।
না, পথ ছাড়বোনা।
কেনো?
সর্দার ওদিকে নেই।
হাঁ, আমি শুনলাম, সে ঝর্ণার পাশে বসে বাবাজীর গজল শুনছিলো।
কে বললো তোমাকে?
কায়েস।
ও জানেনা।
আমি বাবাজীর কাছে শুনে আসছি, দাঁড়াও।
নূরী চলে গেলো বাবাজীর কক্ষের দিকে।
বৃদ্ধ তখন শোবার আয়োজন করছিলো।
নূরী প্রবেশ করলো সেখানে।
রহমান চিন্তিত হলো এবার। সর্দার ঝর্ণার ধারেই আছে, এবং সে একা নেই-তার পাশে আছে বৌ-রাণী।
নূরী কক্ষে প্রবেশ করতেই বললো বৃদ্ধ—কাওন্?
নূরী।
তুম্ এনা রাত পর এঁহা?
এক বাত কইয়ে বাবাজী?
বোলো?
সর্দার কাহা তুম্ জানতে হো বাবাজী?
হাঁ মায় জানতা হু, সর্দার বেটা ওহি ঝর্ণাকে কিনারে।
রহমান যেন হাবা বনে গেলো।
নূরী রহমানের মুখে তীব্র দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললো–এতো মিথ্যা বলতে পারো তুমি রহমান।
নূরী যেওনা। আমিই সর্দারকে ডেকে আনছি।
না, আমিই যাবো।
এতো রাতে সর্দার তোমাকে ওখানে দেখলে খুশি হবে না।
কিসে সে খুশি হবে না হবে শুনতে চাইনা রহমান।
একাই যাবে?
যদি মনে করো এসো আমার সঙ্গে। নূরী কথা শেষ করে এগিয়ে চললো।
এদিকে নূরী আর রহমান যখন বনপথ ধরে এগিয়ে আসছে, তখন বনহুর আর মনিরা উঠে দাঁড়িয়েছে। বললো বনহুর–চলো মনিরা, তোমাকে পৌঁছে দিয়ে আসি।
মনিরা আর বনহুর এগুলো, অদূরে একটা গাছের সঙ্গে বাধা ছিলো তাজ।
বনহুর মনিরাকে তাজের পিঠে উঠিয়ে দিয়ে নিজেও বসলো। মনিরা স্বামীর বুকে নিবিড় ভাবে ঠেস দিয়ে বললো–আমার যেতে ইচ্ছে করছে না। এই তো আমার বেহেস্ত।
বনহুর মনিরার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসলো। তারপর তাজের লাগাম টেনে ধরলো।
ধমকে দাঁড়ালো নূরী, তাজের খুঁড়ের শব্দ তার অতি পরিচিত। বললো নূরী–রহমান, তাজের পদশব্দ না?
রহমান মনে মনে হাজার শুকরিয়া করে বললো–সর্দার বুঝি শহরে গেলো।
শহরে?
হাঁ, কাজ আছে সেখানে।
কই, তুমি তো গেলেনা?
সর্দারের গোপন কাজ কিনা।
তুমি জানো রহমান, কোথায় গেলো সে?
না নূরী, আমি জানিনা।
ঐ চৌধুরী বাড়ি গেলো না তো?
রহমান সে কথার কোন জবাব না দিয়ে বললো–নূরী, অনেক দিন বলেছি, আজও বলছি–মিছামিছি সর্দারের পথ চেয়ে কোন ফল হবে না।
নূরী মুখ গম্ভীর করে ফেললো, বললো–রহমান, আমি যে তারই কাঙ্গাল।
কিন্তু সে যদি তোমাকে কোনদিন …….
চিরদিন আমি তার পথ চেয়ে থাকবো।
জীবনটা নষ্ট করে দিবে নূরী?
না না, আমার জীবন নষ্ট হবার নয়, আমার হুর–সেই তো আমার সব।
কিন্তু …
না, কিন্তু নয় রহমান। হুর আমার, আমি তার–আমি তার–আনমনা হয়ে যায় নূরী!
রহমান অলক্ষ্যে রুমাল দিয়ে নিজের চোখ মুছে নেয়।
বলে রহমান–চলো নূরী।
চলো–
নূরী নিজের কক্ষে প্রবেশ করে শয্যা গ্রহণ করে, কিন্তু মন তার চলে গেছে দূরে বহু দূরে সুদূর অতীতে–বনহুরের সঙ্গে ছোট বেলার স্মৃতিগুলো হাতড়ে চলে একটির পর একটি করে। ছোট বেলায় দুজনে বনে বনে লুকোচুরি খেলা। তীর ধুন নিয়ে শিকার করা। নদীতে দুজনে মিলে সাঁতার কাটা। নূরী পাথরখণ্ডে বসে বাঁশি বাজাতো, বনহুর চুপি চুপি পিছন থেকে এসে চোখ দুটো টিপে ধরতো ওর। দুজনে হাসতো খিল খিল করে। কত দিন বন থেকে ফুল তুলে নিয়ে গুঁজে দিয়েছে বনহুর নূরীর খোপায়–এসব কি ভুলবার। শুধু আজ নয়, যেদিন নূরীর চোখে ঘুম আসতো না বা কোন চিন্তার বেড়াজাল তাকে জড়িয়ে ধরতো সে দিন নূরীর মনের পর্দায় ভেসে উঠতো ছোট বেলায় তার আর বনহুরের স্মৃতিগুলো।
১৪.
জানো আর একজন আছে এ কক্ষে? বললো মনিরা।
বনহুর তাকালো কক্ষের চারদিকে, কোথাও কাউকে না দেখে বললো–মশারীর নীচে তো?
হাঁ। বলতো কে?
তোমার নূর।
কি করে জানলে তুমি?
রহমান সব বলেছে।
