তুম্! আংগুল দিয়ে বনহুরকে দেখায় বৃদ্ধ।
বনহুর গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠে–হাঁ, বাবা। মুঝে তুম্ মাফ করদো। লকেট তুমহে মায় দিয়া থা।
তুম্ মুঝে লকেট দিয়াথা?
হাঁ, হাম্ ভুল কিয়া। তুম মুঝে মাফ করদো বাবা?
খোদা তুঝে মাফ কিয়া বেটে।
সেদিনের পর থেকে বৃদ্ধ ভিখারী বনহুরের আস্তানায় স্থান লাভ করলো।
বনহুর জানে, এর পর বৃদ্ধকে শহরের পথে দেখলে কোন পুলিশ তাকে ক্ষমা করবেনা। নিরপরাধ ভিখারী কেনো কষ্ট পাবে। তার চেয়ে তার আস্তানায় থাকাই শ্রেয়।
বৃদ্ধ ভিখারী হলেও দরবেশ ধরণের লোক ছিলো। বনহুরের দয়ায় আর তাকে ভিক্ষার জন্য চিন্তা করতে হয় না, এখানে খায়-দায়, গজল গান গায়, আর খোদার এবাদত করে।
বৃদ্ধকে ভালই লাগে বনহুরের, মাঝে মাঝে বৃদ্ধের পাশে গিয়ে বসে বনহুর–নানা রকম ধর্ম আলোচনা করে সে।
বৃদ্ধ যখন গজল গায় তখন বনহুর তস্ময় হয়ে শোনে, মন প্রাণ ভরে উঠে অনাবিল এক আনন্দে।
একদিন বৃদ্ধ নির্জন স্থানে বসে গজল গাইছিলো। জ্যোছনা রাত, অদুরে নিঝরিনী ঝর্ণাধারা ছল ছল শব্দ করে বয়ে চলেছে। আপন মনে গজল গাইছিলো বৃদ্ধ দুচোখ তার মুদিত।
অদূরে একটা পাথরাসনে বসে দস্যু বনহুর।
অন্য একটা পাথরে ঠেস দিয়ে সেও দুচোখ বন্ধ করে ছিলো। জ্যোছনার আলোতে বনহুরকে দেব কুমারের মত সুন্দর লাগছিলো। শরীরে তার শুভ্র পোশাক।
বনানী ঢাকা পাথরাসনে পাতার ফাঁকে ফাঁকে জ্যোছনার আলো খেলা করছিলো; খানিকটা জ্যোছনার আলো এসে পড়ছিলো বনহুরের চোখেমুখে। তন্ময় হয়েছিলো বনহুর বৃদ্ধের গজল গান।
এমন সময় অদূরে একটি নারীমূর্তি এগিয়ে আসে, পাশে একটি লোক। গাছের ছায়ায় আধো অন্ধকারে অতি লঘু পদক্ষেপে এগুচ্ছিলো তারা।
পুরুষ লোকটি এবার বললো–বৌ-রাণী, আপনি অপেক্ষা করুন। আমি বাবাজীকে আস্তানায় নিয়ে যাই। তারপর আপনি ……….
নারীমূর্তি অন্য কেহ নয়, দস্যু বনহুরের পত্মী মনিরা।
পুরুষ ব্যক্তিটি রহমান।
রহমানের কথা বললো মনিরা–যাও সিপাহী, আমি এখানে অপেক্ষা করছি।
এখানে আপনি একা থাকবেন বৌ-রাণী? কোন জীব……
ভয় নেই সিপাহী, হতভাগিকে কেউ খাবেনা। তুমি যাও।
মনিরা দাঁড়িয়ে পড়লো।
রহমান চলে গেলো সম্মুখের দিকে।
বৃদ্ধের গজল প্রায় শেষ হয়ে এসেছিলো।
রহমান বনহুরের পাশে এসে দাঁড়ালো।
বৃদ্ধের গজল শেষ হলে বললো–সর্দার!
বনহুর যেমন বসেছিলো তেমনি বসে রইলো, বললো–বসসা রহমান।
আজকাল মাঝে মাঝে বনহুর রহমানকে নিয়ে এই নির্জন ঝর্ণার ধারে এসে বসতো, কাজেই আজও বললো তাকে বসতে।
রহমান অন্যদিন হলে বসে পড়তো নীচের কোন পাথরখণ্ডে। আজ বসলোনা, বললো রহমান বাবাজীর শরীর আজ ভাল নয়, ওকে আস্তানায় পৌঁছে দিয়ে আসি।
আচ্ছা যাও।
রহমান একবার বৃদ্ধের পাশে এসে বললো–বাবাজী, আভি তুম চলল। রাত বহুং হুয়ে……।
আচ্ছ, চলো বাপু।
বৃদ্ধ উঠে দাঁড়ালো।
রহমান বৃদ্ধের হাত ধরে নিয়ে চললো বনপথ ধরে।
বনহুর আবার পাথরখণ্ডে ঠেস দিয়ে ভাল হয়ে বসলো। বনানী ঢাকা ঝর্ণার ধারে ফুরফুরে মিষ্টি হাওয়ায় আজ তার বড় ভাল লাগছে। আজ সে কোথাও যায়নি, অবশ্য রহমানের বিশেষ অনুরোধেই সে রয়ে গেছে। আগামীকাল মহব্বৎ আলীর হোটলে আবার সে পদার্পণ করবে। কাল কি করতে হবে–রহমানের সঙ্গে এ নিয়েই আলোচনা হবে এখানে। রহমান বৃদ্ধকে আস্তানায় পৌঁছে দিয়ে ফিরে আসবে, সেজন্য বনহুর অপেক্ষা করছে এখানে।
কোমল একটা হাতের স্পর্শ অনুভব করলো বনহুর নিজের মাথার চুলে।
বনহুর চোখ মেলে তাকিয়ে চমকে উঠলো–কে তুমি?
ঘোমটায় মনিরা মুখটা অর্ধেক ঢেকে রেখেছিলো, বনহুরের কণ্ঠস্বরে বুকটা ধক ধক করে উঠলো। একটু সরে দাঁড়িয়ে রইলো, কোন কথা বললোনা।
বনহুর উঠে দাঁড়ালো বিদ্যুৎ গতিতে; গম্ভীর কঠিন কণ্ঠে বললো কে? এক ঝটকায় মনিরার মাথার ঘোমটা সরিয়ে দিলো বনহুর। সঙ্গে সঙ্গে জ্যোছনার এক খণ্ড আলো এসে পড়লো মনিরার মুখে। বনহুর বিস্ময় ভরা কণ্ঠে বলে উঠলো–তুমি!
মনিরা দুহাতে জড়িয়ে ধরলো বনহুরের পা দুখানা–ওগো, আমায় তুমি মাফ করে দাও। মাফ করে দাও ……
পাথরের মূর্তির মত নিশূপ দাঁড়িয়ে রইলো বনহুর, কোন কথা বললোনা। মুখমণ্ডল কঠিন, দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরানো।
মনিরার অশ্রুতে সিক্ত হয়ে উঠলো বনহুরের পা দুখানা।
তবু নীরব বনহুর।
সেদিন মনিরার উপেক্ষা বনহুরের হৃদয়ে শেল বিদ্ধ করেছিলো। জীবনে সে বুঝি এতোবড় আঘাত আর কোনদিন পায়নি।
মনিরার হাতের মধ্য হতে পা দুখানা সরিয়ে নিয়ে সরে দাঁড়ালো বনহুর, কঠিন কণ্ঠে বললো–রহমান তোমাকে পথ দেখিয়ে এনেছে বুঝি? এর জন্য ওকে শাস্তি পেতে হবে।
না না, ওর কোন দোষ নেই, আমি–আমিই এসেছি। আমাকে তুমি মাফ করো। যে ভুল আমি করেছি সেদিন, তার জন্য অহঃরহ আমি জ্বলে মরছি। আমাকে তুমি মাফ করো ……..
আর কোনদিন বিরক্ত করবোনা তোমাকে মনিরা।
এ তুমি কি বলছো? মনিরা অশ্রুসিক্ত নয়নে উঠে দাঁড়ালো।
হাতের মধ্যে হাত রগড়ে আবার বললো–তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচতে পারিনা। আমাকে তুমি হত্যা করো …….
বনহুর রাগত কণ্ঠে বললো—তুমি তো বেশ ছিলে, বরং আমার উপস্থিতি তোমাকে বিরক্ত করে তুলেছিলো …।
উঃ আজও তুমি মনে রেখেছো সব কথা? তুমি বিশ্বাস করো, ওগুলো আমার মনের কথা নয়…….. তুমি বিশ্বাস করো….
মনিরা বনহুরের হাত দুখানা মুঠায় চেপে ধরলো।
