অনাথার বন্ধু–তাকে আপনি অমানুষ বলেছেন বৌ-রাণী?
এর পর থেকে আর কোনদিন মনিরা রহমানকে ছোট সর্দার বলে ডাকতে আপত্তি করতে পারেনি।
নূর রহমানের হাত থেকে খাবার আর খেলনা হাতে নিলো। মনিরা বললো–যাও বাবা, দাদীমার কাছে যাও।
নূর খুসী হয়ে চলে গেলো উপরে।
মনিরা স্থির হয়ে দাঁড়ালো, দৃষ্টি রইলো রহমানের মুখে।
বললো রহমান–বৌ রাণী, কি হয়েছে আপনাদের? আমাদের?
হাঁ সর্দারকে আমরা ফিরে পেয়েছি বটে, কিন্তু তার আসল রূপ কোথায় অন্তর্ধান হয়েছে। সব সময় গম্ভীর ভাবাপন্ন। কি হয়েছে বৌ-রাণী?
মনিরা কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে বললো–জানিনা।
না, আপনাকে বলতেই হবে?
আমি বললাম জানিনা।
বৌ-রাণী, আমার কাছে আপনি কোন কথা গোপন করবেন না। জানেন তো, সর্দার আমাদের সর্বস্ব। তার বিষণ্ণ মলিন ভাব আমাদের মনে অহঃরহ যন্ত্রণা দিচ্ছে। বলুন বৌ-রাণী, কি হয়েছে?
তোমরাই কি শুধু তাকে ভালবাসো, আমি কি তাকে একটুও ভালবাসি না? সিপাহী, আমি-আমিও কম মনঃকষ্ট ভোগ করছিনা। আমার হৃদয়েও দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে,–আজ কদিন আমি এতটুকু শান্তি পাইনি। এতটুকু না। সিপাহী, আমি তাকে বিমুখ করে ফিরিয়ে দিয়েছি, আমি তাকে বিমুখ করে ফিরিয়ে দিয়েছি–গলা ধরে আসে মনিরার।
রহমান নতমুখে দাঁড়িয়ে ছিলো, এবার চোখ তুলে তাকালো সে মনিরার মুখের দিকে।
মনিরা বলে চললো–আমিই অপরাধী। আমিই অপরাধী সিপাহী। আমি তাকে ভুল বুঝে বিমুখ করে ফিরিয়ে দিয়েছি….
এবার বললো রহমান–বৌ-রাণী, সর্দার বড় জেদী মানুষ। এক বার অভিমান হলে সহজে তাকে খুশি করা মুসকিল। আমি তাকে অনেক করে বলেছি, আপনার এখানে আসার জন্য অনেক অনুরোধ করেছি।
কিছুক্ষণ চিন্তা করলো মনিরা, তারপর বললো–আমাকে একবার তার কাছে নিয়ে যেতে পারো?
সর্দারের কাছে!
হাঁ সিপাহী, তার কাছে একবার আমি যেতে চাই।
কিন্তু •••
না না, কিন্তু নয়, তুমি আমাকে তার কাছে যাবার ব্যবস্থা করে দাও সিপাহী! নইলে আমি আত্মহত্যা করবো।
বৌ-রাণী–
জানো–নারীর স্বামী না হলে সে জীবনের কোন দাম নেই। স্বামীই যে সব। আমি ভুল করেছি রহমান, আমি ভুল করেছি।
তাহলে আপনি…
হাঁ, আমাকে যেমন করে পারো একবার তার কাছে নিয়ে চলো।
আস্তানায় যাওয়া আপনার পক্ষে সম্ভব নয় বৌ-রাণী। একটু চিন্তা করে বসলো রহমান–আজ সর্দার ব্যস্ত থাকবেন। এর পর যেদিন সুযোগ আসবে আপনাকে আমি সর্দারের সঙ্গে দেখা করার ব্যবস্থা করে দেবো।
সিপাহী।
বৌ-রাণী, আপনি আমার উপর ভরসা রাখবেন, সর্দারের সঙ্গে আপনার সাক্ষাৎ হবেই।
সিপাহী।
চলি বৌ-রাণী।
এসো সিপাহী!
রহমান পুনরায় মনিরাকে কুর্নিশ জানিয়ে বলে–খোদা হাফেজ।
মনিরা অস্ফুট কণ্ঠে উচ্চারণ করে–খোদা হাফেজ।
বেরিয়ে যায় রহমান।
মনিরা তাকিয়ে থাকে রহমানের চলে যাওয়া পথের দিকে।
ছাদের উপরে তখন মরিয়ম বেগম আর নূরের আনন্দ ভরা কণ্ঠস্বর শোনা যায়।
১১.
হোটেল গুল বাগের সম্মুখে এসে একটা গাড়ি থামলো। গাড়ি থেমে নেমে এলো দুটি যুবক। শরীরে তাদের মূল্যবান কোট প্যান্ট-টাই। প্রথম যুবকের চোখে কালো চশমা।
যুবকদ্বয় হোটেলের মধ্যে প্রবেশ করতেই একজন বয় এগিয়ে এলো।
প্রথম যুবক একটা কার্ড হাতে দিয়ে বললো–মিস পারভিনকে দাও।
কার্ড হাতে বয় চলে গেলো।
যুবকদ্বয় নিম্ন স্বরে কিছু আলাপ করতে লাগলো।
বয়ের বিলম্ব দেখে প্রথম যুবক একটা সিগারেটে অগ্নি সংযোগ করলো। সিগারেট থেকে ধূম নির্গত করতে করতে হোটেল-কক্ষের চারদিকে সূতীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দেখতে লাগলো সে।
এমন সময় পারভিন এসে দাঁড়ালো তাদের সম্মুখে।
প্রথম যুবককে দেখতে পেয়ে আনন্দে দীপ্ত হয়ে উঠলো তার চোখ দুটো, উচ্ছাসিত কণ্ঠে বললো–হ্যালো, আপনি! আসুন আমার সঙ্গে।
যুবকদ্বয় অন্য কেহ নয়, প্রথম জন দস্যু বনহুর দ্বিতীয় জন তার প্রধান অনুর রহমান।
বনহুর আর রহমান অনুসরণ করলো পারভিনকে।
হোটেল কক্ষ হলেও এটা পারভিনের নিজস্ব কক্ষ।
সুন্দরভাবে সজ্জিত এ কক্ষে প্রবেশ করে বনহুর বললো–মিস পারভিন, অসময়ে আপনাকে বিরক্ত করলাম।
মোটেই আমি বিরক্ত হইনি, আপনারা বসুন।
বনহুর চোখের চমশাটা খুলে টেবিলে রাখলো, তারপর আসন গ্রহণ করলো।
রহমান যদিও কোনদিন প্রভুর সম্মুখে আসন গ্রহণ করে নাই, আজ তার ইংগিতে আসন গ্রহণ করলো।
পারভিনের চোখে মুখে আনন্দের উচ্ছ্বাস। সেদিনের পর পারভিন মুহূর্তের জন্য ভুলতে পারেনি প্লেনের সেই যুবকটিকে। তার পর ছবিতে যখন তাকেই সে দেখলো তখন আরও মুগ্ধ হলো। শয়নে-স্বপনে জাগরণে-সব সময় ঐ মুখানা ভাসছিলো তার মানস পটে। এই ক্ষণে তার কামনার জনকে পেয়ে কি যে আনন্দ হলো!–পারভিন যেন আত্মহারা হয়ে পড়লো।
পারভিন আসন গ্রহণ করতেই বললো বনহুর রহমানকে লক্ষ্য করে বন্ধু, তোমার সঙ্গে এর পরিচয় নেই। ইনি গুলবাগ হোটেলের মালিক মহব্বৎ আলীর কন্যা মিস পারভিন আর এ আমার বন্ধু রহমান।
পারভিন হেসে বললো–আপনার পরিচয় আজও কিন্তু আপনি বলেননি। আপনি কি কুন্তি বাঈ ছবির নায়ক চরিত্রে অভিনয় করেছেন?
হাঁ, আপনার অনুমান সত্যি। আমিই মুকছুদ চৌধুরী।
আপনাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। সত্যি, আপনার অভিনয় আমাকে মুগ্ধ করেছে।
খুশি হলাম শুনে।
আপনি নিশ্চয়ই ছবিটা দেখেছেন মিঃ চৌধুরী।
না, সে সুযোগ এখনও আমার হয়নি।
