মরিয়ম বেগম অবাক হয়ে বলতেন–সেকি! আম্মা কাঁদছে? চলো তো দেখি।
ছোট্ট নাতীর হাত ধরে মরিয়ম বেগম আসেন মনিরার কক্ষে।
মনিরা তখন বালিশে মুখ গুঁজে ফুলে ফুলে কাঁদছে।
মরিয়ম বেগম মনিরার পিঠে হাত রেখে বললেন–ছি ও মা, অমন করে কাঁদতে নেই! আমি মা হয়ে দেখতে, বুকে কেমন পাষাণ চাপা দিয়ে আছি। কণ্ঠ বাষ্পরুদ্ধ হয়ে আসে তার, গলাটা পরিষ্কার করে নিয়ে বললেন আবার তিনি–ওর সঙ্গে তোকে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ করে আমি ভুল করেছি মনিরা। ভেবেছিলাম তোকে দিয়ে ওকে আমি আটকে রাখবো, কিন্তু সে আশা আমার বিফল হয়েছে। বনের পাখিকে কেউ কোনদিন খাচায় আবদ্ধ রাখতে পারেনা, তাকে যতই দুধ কলা খাওয়ানো যায়…..
মামীমা! মামীমা……. মনিরা মরিয়ম বেগমের কোলের মধ্যে মুখ লুকিয়ে উচ্ছ্বসিত ভাবে কেঁদে উঠে।
মনিরা, যে ভুল আমি করেছি তার প্রতিকার নেই। একটা জীবন এমনি করে আমার চোখের সম্মুখে বিনষ্ট হয়ে যাবে, আর আমি তাই সহ্য করবে। মা, আমাকে তুই তিরস্কার কর, তিরস্কার কর মা।
মনিরা সোজা হয়ে বসলো, আঁচলে চোখের পানি মুছে বললো মামীমা, তুমি আমাকে ভুল বুঝো না। কে বললো, তোমাকে, আমার জীবন বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে?
আমি কি কিছুই বুঝিনা মনিরা? তোর অন্তরের ব্যথা আমি কি কিছুই। উপলব্ধি করতে পারিনা? মা হলেও আমি নারী। নারীর সর্ব যে তার স্বামী……….
মামীমা!
মনিরা, কি করবো বল, আমি তোকে মিথ্যা সান্ত্বনা দিচ্ছি। এ বয়সে কে তার স্বামীকে পাশে পাবার জন্য ব্যাকুল হয়। কাঁদ, আরও কাঁদ, কেঁদে কেঁদে তবু যদি বুকটা তোর হালকা হয়।
একটু থেমে কঠিন কণ্ঠে বললেন মরিয়ম বেগম–আমি মা হয়ে ওকে অভিসম্পাত করছি, ওর যেন…….
মনিরা দক্ষিণ হস্তে মরিয়ম বেগমের মুখ চাপা দিয়ে বলে উঠলো– না না, তাকে তুমি অভিসম্পাত করোনা। অভিসম্পাত করোনা মামীমা। মায়ের অভিশাপ সবচেয়ে মন্দ। ওর কোন অমঙ্গল হবে এ আমি সইতে পারবো না। তিলে তিলে আমি মরণ বরণ করবো, কিন্তু ওকে আমি অভিশাপ দিতে দেবব না–মামীমা–মামীমা–
মরিয়ম বেগমের গণ্ড বেয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগলো অশ্রুধারা। নীরবে তিনি মনিরার পিঠে মাথায় হাত বুলিয়ে চললেন।
নূর তখন স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মা-ই বা কাঁদছে কেনো, আর দাদীমা-ই বা কাঁদছে কোননা, কিছুই বুঝতে পারে না অবুঝ শিশু নূর।
এমন সময় নকীব এলো; যদিও সে মরিয়ম বেগম ও মনিরাকে অশ্রুরা নয়নে দেখতে পেলো তবু না বলে পারলো না, বললো সে আপামনি সেই লোকটা এসেছে, ঐ যে নূরকে যে ভালবাসে, খেলনা দেয়:…
মনিরা জানে রহমান আসে–সে-ই নূরের জন্য খেলনা আর খাবার নিয়ে। আসে। অনেক করে বারণ করা সত্বেও সে এ কাজ করে। অনেক দিন মনিরাকে বলেছে রহমান-বৌ-রাণী, আমি তো নিজের টাকায় এ সব করছিনা, ওর বাপের টাকার জিনিস। কেনো আপনি রাগ করেন বৌ-রাণী?–নকীবের কথায় রহমানের কথাগুলো মনের পর্দায় ভেসে উঠে মনিরার।
আঁচলে চোখের পানি মুছে উঠে দাঁড়ায় মনিরা, হঠাৎ যেন তার মুখের ভাব বদলে যায়। মরিয়ম বেগমকে লক্ষ্য করে বলে সে মামীমা, রহমান : এসেছে। আয় নূর-নূরকে কোলে করে সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে যায় মনির।
মরিয়ম বেগম আশ্বস্ত হন। রহমানের পরিচয় তিনি জানেন। মনিরা মামীমাকে সব খুলে বলেছেন–রহমান তার স্বামীর প্রধান অনুচর। এ বাড়ির আর একজন জানেন রহমানের আসল পরিচয়–তিনি হলেন বৃদ্ধ সরকার সাহেব। মনিরা মরিয়ম বেগম ও সরকার সাহেব ছাড়া কার কেউ জানেনা–রহমান কে। এমন কি বিশ্বাসী চাকর নকীবও না।
পুত্রের প্রধান অনুচর এবং বিশ্বাসী জন বলেই মরিয়ম বেগম মনিরাকে কোনদিন রহমানের সম্মুখে যেতে বারণ করেননি। মনিরা প্রায়ই রহমানের মুখে তার স্বামীর আস্তানার সংবাদ শুনতো। আরও কত কথা বলতো রহমান, সর্দারের গুণগানে মুখর হয়ে উঠতো সে।
মনিরার শুষ্ক প্রাণে স্বামীর কাহিনী কিছুটা শান্তি দান করতো। আজ কতদিন রহমান বনহুরের পাশে রয়েছে, বনহুরকে সে যেমন করে জানতো আর কেউ তেমন করে জানতো না। তাই রহমানের কাছে মনিরা সন্ধান পেতো তার স্বামীর।
নূরকে কোলে করে মনিরা এসে দাঁড়ালো হল ঘরে।
রহমান যেমন করে কুর্ণিশ জানায় তার সর্দারকে, তেমনি করে কুর্ণিশ জানাতো বৌ-রাণীকে।
কুর্ণিশ জানিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো রহমান।
নূর মায়ের কোল থেকে ছুটে গিয়ে জাপটে ধরলো রহমানকে–আমার জন্যে কি এনেতো সিপাহী?
মনিয়া রহমানকে সিপাহী বলে সম্বোধন করতো। নূরও মায়ের কাছে এ উক্তিটাই শিখে নিয়েছিলো।
নূরকে রহমান তুলে নিলো কোলো, হেসে বললো–ছোট সর্দার, তোমার জন্য অনেক জিনিস এনেছি।
কই, দাও?
রহমান পাশের টেবিলে রাখা প্যাকেটগুলো তুলে দিলো নূরের হাতেএই নাও ছোট সর্দার।
রহমান নূরকে ছোট সর্দার বলতো।
মনিরা অবশ্য প্রথম প্রথম রাগ করত। বলতো–ও নাম ধরে ডেকোনা সিপাহী।
রহমান হেসে বলতো–কেন বৌ-রাণী?
না, ও নাম আমার সহ্যের বাইরে। তোমাদের সর্দার অমানুষ বলে, আমার নূর অমানুষ হবে?
হাঃ হাঃ করে হেসে উঠছিলো রহমান, বলেছিলো–আমাদের সর্দার অমানুষ কে বললো এ কথা আপনাকে? মানুষ যদি থাকে তবে মানুষ আমার সর্দার। ভয় কাকে বলে জানে না সে। শয়তান জানোয়ার যারা নিরীহ মানুষের বুকে বসে রক্ত শুষে খায়, তাদের টুটি ছিঁড়ে ফেলতে কসুর করেনা। দুষ্ট লোকদের বুকে গুলী করতে এতটুকু হাত কাঁপেনা। শয়তানের শত্রু,
