রহমান সব সন্ধানই নিয়েছে। তাদের যতটুকু সম্ভব সায়েস্তাও করেছে কিন্তু আরও প্রয়োজন। এবং ওদের সায়েস্তা করতে হলে চাই সর্দারের সহায়তা।
রহমান প্রায়ই ছদ্মবেশে শহরে প্রবেশ করতো। গোপনে সন্ধান নিয়ে ফিরতো সে! বনহুরের প্রধান অনুচর রহমান, বনহুরের মতই তার মহৎ উদেশ্য। ধনীর ধন লুটে নিয়ে ধনহীন অনাথাদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়াই তার ব্রত।
আজও রহমান ভাল বাসেননি কোন নারীকে, নূরীই ছিলো তার একমাত্র স্বপ্ন। কিন্তু যখন সে জানতে পেরেছে নূরী ভালবাসে তার মনিব দস্যু বনহুরকে–সে দিন থেকে রহমান নূরীকে এড়িয়ে চলতো। নূরীর স্মৃতির হৃদয় সিংহাসনে সংগোপনে রেখে ভুলে থাকতো মানবদেহী নূরীকে। দূর থেকে নূরীকে রহমান পূজা করতো, কিন্তু কোনদিন বিরক্ত করতে না সে তাকে।
একদিন বনহুর আর রহমান বসেছিলো নির্জন ঝর্ণার ধারে। অদূরে তাজ আপন মনে ঘাস খাচ্ছিলো।
বনহুর একটা ঘাসের খন্ড নিয়ে দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে ফেলছিলো। মুখভাব গম্ভীর ভাবাপন্ন। তাকিয়ে ছিলো সে সম্মুখস্থ বয়ে চলা ঝরণার পানির দিকে।
বনহুরের অদূরে রহমান বসেছিলো, তার মুখমণ্ডলও বেশ চিন্তাযুক্ত। বললো রহমান সর্দার বহুদিন আপনি দেশছাড়া। এতো দিন দেশে আপনি না। থাকায় নানা রকম অনাচার শুরু হয়েছে। পুলিশের চোখে ধূলো দিয়ে কতগুলো চোরাকারবারী যা ইচ্ছে তাই করে যাচ্ছে। কত নিরীহ জনগণের রক্ত যে তারা শোষণ করছে তার ঠিক নেই।
বনহুর সোজা হয়ে বসলো–তুমি এতোদিন কি করেছিলে রহমান?
সর্দার, আমি যতটুকু সম্ভব শয়তানদের সায়েস্তা করতে চেষ্টা নিয়েছি। কিন্তু বেশি কিছু করে উঠা সম্ভব হয়নি। কারণ পুলিশের সহায়তায় তারা বেঁছে গেছে। পুলিশ মনে করেছে, তারা হৃদয়বান লোক, কাজেই……..
বুঝতে পেরেছি। কিন্তু কারা সেই দুষ্ট শয়তানদের দল?
সর্দার, সবচেয়ে দেশের জনগণের বিস্তর ক্ষতি সাধন করছে একটি ধনবান ব্যক্তি, নাম তার মহব্বৎ আলী। সে শুধু জনগণের ক্ষতিই সাধন করছে না, দেশের চরম শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কি করেছে সে?
মহব্বৎ আলী প্রচুর অর্থবান লোক। শহরে এবং বিদেশে তার বহু কারবার আছে, যে সব কারবারে অসৎ উপায়ে অর্থ উপার্জন হয়ে থাকে। একটা হোটেল আছে–যেখানে শহরের সৎ ব্যক্তিদের প্রলোভন দেখিয়ে অসৎ পথে আনা হয়। মদ পান, জুয়া খেলা এবং বাঈজী নাচ সব হয়ে থাকে সে হোটেলে। হোটেলের অভ্যন্তরে আরও অনেক কুৎসিৎ কাজ সমাধা হয়ে থাকে।
হু। বনহুর একটা শব্দ করে উঠলো।
রহমান বুঝতে পারলো, তার মনিবের চিন্তাধারা বিপরীত দিকে প্রবাহিত হয়েছে। সব সময় সর্দারের বিমর্ষতা অন্যান্য অনুচরদের তেমন করে ভাবিয়া
তুললেও, রহমান বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েছিলো। এবার ঔষধ ধরেছে, রহমান মহব্বৎ আলীকে সায়েস্তা করতে না পেরে ভীষণভাবে ক্ষেপেছিলো।
বনহুর কুঞ্চিত করে কিছু ভাবতে লাগলো।
রহমানের অতি পরিচিত সর্দারের এ. মুখভাব, মনে মনে একটা স্বস্তির নিশ্বাস ত্যাগ করলো সে।
বনহুর বললো–রহমান, প্রস্তুত থেকো, আজ রাতেই একবার শহরে যাবো।
আচ্ছা, সর্দার।
বনহুর উঠে দাঁড়ালো—চলো।
রহমানও নীরবে অনুসরণ করলো।
বনহুরের অশ্ব আর রহমানের অশ্ব তখন পাশাপাশি এসে দাঁড়িয়েছে।
উভয়ে উঠে বসলো নিজ নিজ অশ্বে।
১১.
রহমান এক সময় ছদ্মবেশ ধারণ করে নিজ অশ্ব নিয়ে রওয়ানা দিলো। কাউকে সে কোন কথা বললো না–কোথায় যাচ্ছে, কেনো যাচ্ছে। বনবাদাড় আর জঙ্গল ছেড়ে রহমানের অশ্ব শহরের পথ ধরে এগুলো। রহমানের শরীরে আজ পাহারাদারের শুভ্র ড্রেস।
একটা বড় দোকানের সামনে অশ্ব রেখে নেমে পড়লো রহমান। কিছু খাবার আর খেলনা নিয়ে উঠে বসলো আবার অশ্বপৃষ্ঠে।
সোজ গিয়ে পৌঁছলো রহমান চৌধুরী বাড়ির বাগানের পাশে।
আজ কদিন থেকে মনিরার মনের অবস্থা অত্যন্ত অবর্ণনীয়। নাওয়াখাওয়া সব সে ত্যাগ করেছে। এমনকি নূরকে আদর করাও সে ভুলে গেছে যেন।
হঠাৎ মনিরার এ অবস্থা দর্শন করে মরিয়ম বেগম অত্যন্ত চিন্তিত এবং বিচলিত হয়ে পড়লেন। ভেবে পান না কেনো সে এমন হলো।
সেই ছবি দেখার দিন হতে মনিরার মধ্যে এ পরিবর্তন লক্ষ্য করেছেন। মরিয়ম বেগম। বুঝতে পেরেছেন স্বামীর কথাই মনিরাকে এভাবে চিন্তাক্লিষ্ট ও ভাবাপন্ন করে ফেলেছে।
তাই মরিয়ম বেগম তেমন করে কোন কথা না বললেও মাঝে মাঝে বলতেন–মা মনিরা, ভাবিসনে, আমার মন বলছে–সে আসবে। আমি মা, ওর কিছু হলে আমার মন বলতো। কিন্তু আমার মনে সান্ত্বনা আছে সে আসবে…
মরিয়ম বেগমের কথার কোন জবাব দেয় না মনিরা। সে আসবে—মায়ের মনে কত আশা। জানেন না তিনি। যার আসার আশায় তিনি পথ চেয়ে আছেন, সে এসেছিলো। এসে আবার সে চলে গেছে, তাঁকে বিমুখ–করে ফিরিয়ে দিয়েছে মনিরা নিজে।
মরিয়ম বেগম যতই মনিরাকে সান্ত্বনা দিতেন ততই মনিরার হৃদয়ের ব্যথা না কমে আরও বেড়ে যেতো। কোন রকমে মামীমার দৃষ্টির আড়ালে চলে এসে বালিশে মুখ লুকিয়ে কাঁদতো।
হয়তো নূর দেখে ফেলভো, ছুটে এসে মায়ের পাশে বসে কাঁদো কাঁদো মুখে বলতো–আম্মা, তুমি কাঁদতো কেনো? আম্মা, বলো না তুমি কাঁদতে কেনো?
মনিরা শিশু-পুত্রের হাতখানা মুঠায় চেপে ধরে নীরবে অশ্রু বিসর্জন করতো।
নূর কিছু বুঝতে না পেরে ছুটে যেতো মরিয়ম বেগমের কাছে। গলা জড়িয়ে ধরে বলতো নূর–দাদীমা, আমাল আম্মার কি হয়েতে? আমাল আম্মা কাঁদতে কেনো?
