হাঁ সর্দার?
কি খবর বলো?
সর্দার, আপনি বৌ-রাণীকে…
বৌ-রাণী–বৌরাণী তোমাকে বলেছি, ও নাম আমার সম্মুখে আর মুখে আনবে না।
সর্দার, আমি জানি বৌ-রাণীকে আপনি ভুল বুঝছেন। বৌ রাণীকে আজও আপনি চিনতে পারেননি।
বনহুর ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বলে উঠে আমার চেয়ে তোমরাই তাকে বেশি চেনেনা বলতে চাও?
সর্দার, কিন্তু বলছিলাম যে বৌ-রাণীর উপর আপনি অযথা রাগ করেছেন। তিনি এমন কোন কারণে আপনার উপর …
রহমানকে কথা শেষ করতে দেয় না বনহুর, হুঙ্কার ছাড়ে সে–বনহুর নারী জাতিকে করুণা করে, সমীহ নয়। আমি মনিরাকে করুণা করেই গ্রহণ করেছিলাম।
সর্দার, আপনি বলতে চান বৌ-রাণীকে আপনি ভাল না বেসেই বিয়ে করেছেন? করুশাই আপনাকে এতদূর অগ্রসর করতে সক্ষম হয়েছে?
রহমান আজ ভুলে গেলো–সে সর্দারের সঙ্গে কথা বলছে। যে সর্দারের মুখের দিকে তাকিয়ে সে কোনদিন কথা বলতে পারেনি–আজ রহমান চোখ-মুখ বন্ধ করে জলস্রোতের মতই বলে চললো। সর্দার, আপনি আজ কদিন এসেছেন, কই একটি দিনও তো আপনাকে প্রাণ খুলে হাসতে দেখলাম না। অহঃরহ অন্তরে আপনার মনে একটা ঝড়ের তাণ্ডব বয়ে চলেছে, এটা আর কেউ না বুঝলেও আমি বুঝতে পেরেছি। সবার চোখে ধুলো দিলেও আমার চোখে ধুলো দিতে পারবেন না। বলুন সর্দার, বৌরাণীকে আপনি ভালবেসে বিয়ে করেছিলেন না করুণা করে? বলুন?
শক্তিতে বনহুর শক্তিমান হলেও রহমানের কথায় সে পরাজিত হলো তার কাছে। সত্যিই তো মনিরাকে সে করুণা করে বিয়ে করেনি। বিয়ে করেছে। মায়ের অনুরোধে আদেশে। মনিরাকে ভালবাসতো বনহুর–সে কথা মিথ্যা নয়। তাই বলে ভালবাসার বিনিময়ে কি বিয়ে,
বনহুরের চিন্তায় বাধা দিয়ে বলে উঠলো রহমান সর্দার।
বনহুর এবার গম্ভীর কণ্ঠে বললো–রহমান, আমি স্বীকার করলাম, মনিরাকে আমি ভালবাসি। তাই বলে কোন নারীর রূঢ় আচরণ দস্যু বনহুর সহ্য করবে না।
এরপর রহমান আর কোন কথা বলতে পারলো না, ধীরে ধীরে কক্ষ ত্যাগ করে চলে গেলো।
ঠিক সেই মুহূর্তে কক্ষে প্রবেশ করলো নূরী।
বনহুরকে লক্ষ্য করে বললো–রহমান ভাইকে অমন করে বকলে কেনো হুর?
বনহুর আর একটা কঠিন উক্তির জন্য অপেক্ষা করছিলো। ভেবেছিলো, নূরী আড়াল থেকে সব শুনেছে কিন্তু এখন বুঝতে পারলো, রহমান আর তার মধ্যে যে আলোচনা হলো,কিছুই শুনতে পায়নি নূরী। শুনতে পেলে একটা ঝড়-ঝাপটা শুরু হতো এতোক্ষণ। কারণ, বৌ-রাণী নামটা নূরী কিছুতেই ভালভাবে গ্রহণ করতে পারবে না।
নূরী বনহুরের পাশে ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে পড়লো–মনিকে কবে আনবে বলো?
বনহুর শান্ত কণ্ঠে বললো–সে জন্যই তো রহমানকে বকলাম।
কেনো?
মনিকে আজও সে আনতে যায়নি বলে?
আচ্ছা, আমিও ওকে দেখাচ্ছি মজাটা। নূরী উঠতে গেলো, বনহুর অমনি হাতখানা চেপে ধরলো নূরীর।
-বসো নূরী।
না, আমার মনির জন্য মন কেমন করছে। হুর, আমার মনিকে কেনো তোমরা এনে দিচ্ছো না?
বলেছি তো সে তার ধাত্রীমাতার নিকটে আছে।
আমি কোন কথা শুনবো না, আমার মনিকে এনে দাও। আমার মনিকে এনে দাও। হু, আমার মনিকে এনে দাও…… মনিকে এনে দাও…..
নূরী বনহুরের জামার আস্তিন চেপে ধরে আমি কোন কথা শুনবো না। আমার মনিকে এনে দাও। প্রবলভাবে ঝাকুনি দিতে লাগলো নূরী।
বনহুরের মনের অবস্থা আজ মোটেই ভাল ছিলো না, নূরীর হাত দুখানা এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ালো–আমি জানিনা কোথায় তোমার মনি।
সঙ্গে সঙ্গে নুরী পাথরের মূর্তির মত বন্ধ হয়ে পড়লো, ঠোঁট দুখানা একটু নড়ে উঠলো মাত্র। স্থির চোখে তাকিয়ে রইলো বনহুরের দিকে।
বনহুর অধর দংশন করতে লাগলো, বিন্দু বিন্দু ঘাম ফুটে উঠলো তার ললাটে।
কিছুক্ষণ দ্রুত পায়চারি করে ফিরে তাকালো বনহুর নুরীর দিকে। নূরী তখনও স্থির ভাবে বসে আছে কেমন যেন চিত্রাপিতের মত।
নূরীকে এভাবে পুতুলের মত নিশ্চুপ বসে থাকতে দেখে চমকে উঠলো বনহুর। দুশ্চিন্তায় মনটা ভরে উঠলো, আবার ওর মাথাটা গুলিয়ে যাবে না তো! ভিতরে ভিতরে আশঙ্কিত হলো সে। এগিয়ে গেলো বনহুর, নূরীর চিবুক ধরে উঁচু করে তুলে বললো–নুরী।
নূরী, তোমার মনিকে আমি এনে দেবো। এনে দেবো নূরী……
নূরীর গণ্ড বেয়ে গড়িয়ে পড়ে ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু।
বনহুর নূরীর পাশে বসে ওকে টেনে নেয় কাছে, চুলে হাত বুলিয়ে দেয়। সান্ত্বনার কণ্ঠে বলে–লক্ষ্মীটি কেঁদোনা, তোমার নূরীকে আমি এনে দেবোকথা শেষ করে বনহুর আনমনা হয়ে যায়। সত্যি কি সে মনিকে এনে দিতে পারবে? কোথায় মনি, সে এমন কত বড় হয়েছে। বেঁছে আছে না মরে গেছে কে জানে। এতো বড় মিথ্যা বলে বনহুর চিন্তিত হয়ে পড়লো।
নূরীর মাথায় হাত বুলিয়ে চললো বনহুর।
নূরী বনহুরের বুকে মাথা গুঁজে উচ্ছ্বসিত ভাবে কেঁদে উঠলো। বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলে উঠলো মনি ছাড়া আমি বাঁচবো না। বাঁচবো না হুর।
নূরী! কেঁদোনা লক্ষ্মীটি …..
১০.
মনিবের মনের অস্থিরতা অন্তরে অন্তরে উপলব্ধি করতে লাগলো রহমান। বহুদিন পর সর্দারকে তারা ফিরে পেয়েছে কত আনন্দ! কিন্তু সর্দার যদি সব সময় চিন্তিত থাকে তবে কিভাবে তাদের কাজ হবে।
শহরের নানা স্থানে আবার দেখা দিয়েছে নানা রকম অরাজকতা। পুলিশের চোখে ধুলি দিয়ে শয়তান লোকগুলো আবার কেঁপে উঠেছে বেলুনের মত। গোপনে তারা অসহায় জনগণের রক্ত শুষে নিচ্ছে নীরবে।
