বিশেষ করে অশ্ব তাজকে নিয়ে আস্তানার সকলের মনে একটা দুঃশ্চিন্তার ঝড় বয়ে চলেছিলো।
তাজের শরীর দিনদিন ক্ষীণ হয়ে পড়ছিলো। প্রভুর অন্তর্ধানে পশু হলেও তাজ মানুষের মত ব্যথায় মুষড়ে পড়েছিলো। বনহুর যেবার কারাগারে বন্দী হয়েছিলো সেবারও তাজকে নিয়ে বনহুরের অনুচরগণ বড় দুশ্চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলো।
বনহুরের অনুপস্থিতিতে. তাজ কিছুই খেতোনা, সব সময় এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখতো, কার যেন প্রতীক্ষায় সর্বক্ষণ উন্মুখ থাকতো। রহমান নিজে জোর করে তাজের মুখে তুলে ভোলা আর ধান খাইয়ে দিতো। পিঠে হাত বুলিয়ে আদর করতো। গা ঘেষে দিত।
আজ বনহুরকে পেয়ে তাজ যেন আনন্দে আপ্লুত হলো। মুখ মাথা ঘষতে লাগলো সে বনহুরের শরীরের সঙ্গে। শুকতে লাগলো নাক দিয়ে বনহুরের গোটা শরীর। সম্মুখের পা দিয়ে মাটিতে আঘাত করতে লাগলো তাজ।
বনহুরও তাজের মনোভাব বুঝতে পারলো–পিঠ ঘাড় নেড়ে হাত বুলিয়ে আদর করতে লাগলো।
তাজ যে সম্মুখের পা মাটিতে আঘাত করে প্রভুকে পিঠে উঠার জন্য ইংগিত করছে, বুঝতে পারলো বনহুর।
বনহুর যখন তাজকে আদর করছিলো তখন বনহুর দাঁড়িয়ে ছিলো তার পাশে। অদূরে দাঁড়িয়ে বনহুরের আদেশের প্রতিক্ষা করছিলো আরও কয়েকজন অনুচর। আজ সকলের মুখমণ্ডলই আনন্দোজ্জ্বল।
শুধু আস্তানা আর অনুচরগণের মনেই খুশির জোয়ার বয়ে চলেনি, সমস্ত বনভূমি যেন আনন্দে আপ্লুত হয়ে উঠেছে। বসন্ত ফিরে এলে বসুন্ধরা যেমন নতুন রূপ ধারণ করো তেমনি বনহুরের আগমনে গাছের শাখায় শাখায় দোলা জাগলো, ফুল ফুটলো, বাতাস বইলো, ডালে ডালে পাখি গান গাইলো।
বনহুরের মনেও যে খুশির দোলা লাগেনি তা নয়। বহুদিন তার পর তার মনে এক অফুরন্ত আনন্দ দ্যুতি খেলে যাচ্ছিলো, কিন্তু এতো খুশির মধ্যেও বনহুর সম্পূর্ণ তৃপ্তি অনুভব করছিলো না। মনিরার কঠিন বাক্যগুলো তার হৃদয়ে প্রচণ্ড আঘাত হানছিলো। যতই সে ভুলে যাবার চেষ্টা করছিলো, ততই আরও বেশি করে মনে হচ্ছিলো মনিরার মুখখানা। এদিকে নূরীকে নিয়ে আর একটা বিভ্রাট শুরু হলো। আস্তানায় পৌঁছেই আমার মনি কই, মনি কই বলে সবাইকে ব্যতিব্যস্ত করে তুললো।
বনহুর আস্তানায় পৌঁছেই রহমানকে বলে দিয়েছিলো, তারা যেন নূরীকে বলে–তার মনি আছে, এক ধাত্রীর কাছে তাকে লালন-পালনের জন্যে দেওয়া হয়েছে। এবার ফিরিয়ে আনা হবে।
বনহুর এক সময় রহমানকে নিকটে ডেকে নিয়ে নিভৃতে সব কথাই বললো। চলে যাবার পর থেকে তার জীবনে কি ঘটেছে সমস্তই বললো সে রহমানের কাছে। নূরীর হারিয়ে যাওয়া এবং তাকে উদ্ধার করা কোন কথাই বাদ দিলো না। তারপর নূরী কি ভাবে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় ছিলো, কিভাবে তার জ্ঞান লাভ হলো, বললো বনহুর। অনুচরদের মধ্যে সে রহমানকে সব চেয়ে বিশ্বাস করতো এবং মনের কথা সব বলতো তার কাছে।
রহমানের মুখে বনহুর শুনলো মনিরার সংবাদ।
ছদ্মবেশে রহমান প্রায়ই শহরে গিয়ে মনিরার সন্ধান নিতো, মনিরা সর্দারের জন্য কত চিন্তিত-ব্যথিত, জানতো সে। মনিরার মুখে রহমান কোনদিন হাসি দেখে নি, যেদিনই সে তাকে দেখেছে অশ্রু ছাড়া কিছুই দেখতে পায়নি।
রহমান সব খোলসা করে বললো সর্দারের নিকট।
রহমানের কথা শুনে হেসে বললো বনহুর রহমান, তুমি যা বললে, সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে আমার মনে হচ্ছে।
রহমান মনিবের মুখে এমন উক্তি শুনবে আশা করেনি, বললো সে-সর্দার, আপনার সম্মুখে মিথ্যা বলার দুঃসাহস আমার নেই।
বনহুর ললাট কুঞ্চিত করে বললো–বৌ রাণীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছে রহমান। আমি গত রাতে তার নিকটে গিয়েছিলাম।
রহমানের মুখমণ্ডল উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। উন্মুখ হৃদয় নিয়ে পরবর্তী কথা শুনার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো সে।
বনহুর বসেছিলো, উঠে দাঁড়ালো, নিজের চুলের মধ্যে আংগুল চালাতে চালাতে বললো–তার কাছে যে ব্যবহার আমি কাল পেয়েছি, বলবার নয়।
সর্দার! অস্ফুট কষ্ঠে প্রতিধ্বনি করে উঠলো রহমান।
বনহুর কিছুক্ষণ আপন মনে পায়চারী করতে লাগলো। মুখভাব গম্ভীর।
রহমান নিশ্চুপ তাকিয়ে আছে বনহুরের মুখের দিকে।
হঠাৎ পায়চারী বন্ধ করে থমকে দাঁড়িয়ে বললো বনহুর রহমান!
সর্দার!
রহমান, বিয়ে আমি করিনি, আমার মায়ের আদেশ পালন করেছি মাত্র…
সর্দার!
ওখানে আর কোন দিন তুমি যাবে না রহমান, আমার আদেশ।
সর্দার আপনি ভুল করছেন। বৌ-রাণীর উপর আপনি অযথা রাগ করছেন। সর্দার, বৌ-রাণীই শুধু নেই সেখানে, সেখানে রয়েছে আপনার সন্তান,…
বনহুর রাগত কণ্ঠে গর্জে উঠলো–আমার সন্তান?
হাঁ, বৌ রাণী নূরকে খুজে পেয়েছে।
নূর!
সর্দার, নূর আপনার সন্তানের নাম। ভুলে গিয়েছেন আপনি?
ভ্রূকুঞ্চিত করে তাকালো বনহুর রহমানের মুখের দিকে।
রহমান অন্যদিন হলে ভড়কে যেতো, আজ এতটুকু বিচলিত হলো না, গলায় জোর দিয়ে বললো–সর্দার, নূর–সে যে আপনারই প্রতিচ্ছবি। নূরের মধ্যে আমরা খুঁজে পেয়েছি আপনাকে! সর্দার বৌ-রাণীর প্রতি আপনি বিমুখ হবেন না।
০৯.
রহমান দস্যু হলেও তার মন উন্নত ছিলো এবং জ্ঞান গরিমাতেও সে কম ছিলো না। বনহুরকে নানা ভাবে বুঝাতে লাগলো রহমান।
বনহুর যখনই একা বসে বিশ্রাম করতো তখনই পাশে গিয়ে দাঁড়াতে রহমান-সর্দার!
বনহুর মনের চঞ্চলতাকে গোপন করবার জন্য মুখভাব স্বাভাবিক করে বলতে–কে রহমান?
